নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: দম থাকলে কালই নির্বাচন করুন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উপলক্ষ ছিল ‘অপারেশন সিন্দুরে’র জন্য সেনার প্রশংসাসূচক কর্মসূচি। কিন্তু বৃহস্পতিবার আলিপুরদুয়ারে প্রধানমন্ত্রী যে স্রেফ ভোটের দামামা বাজাতেই এসেছিলেন, তার প্রমাণ, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে লাগাতার আক্রমণ। সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দেশের লড়াইয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। দেশে দেশে ঘুরে অপারেশন সিন্দুরের প্রচারে চালাচ্ছেন সর্বদলীয় প্রতিনিধি দলে থাকা প্রতিনিধিরা। দেশের হয়ে গলা ফাটাচ্ছেন এই দলে থাকা তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অথচ, এমন সময় মোদির এভাবে বাংলার কুৎসায় নেমে আসায় অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠেন মমতা। গর্জে ওঠেন তিনি বাংলার বিরুদ্ধে মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে। প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই ‘অপারেশন সিন্দুরের’ পর ‘অপারেশন বেঙ্গল’ চালিয়ে তৃণমূল সরকারকে উৎখাতের কথা বলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা রাজ্য বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদার? এর প্রতিবাদ তো দূরঅস্ত, উল্টে রাজ্যের সমালোচনাতেই সরব হয়েছেন মোদি। দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও তিনি আদপে বিজেপি সভাপতির মতো আচরণ করছেন বলে মোদির বিরুদ্ধে বিস্ফোরণ ঘটান মুখ্যমন্ত্রী। সেই সঙ্গে তাঁর হুঙ্কার, ‘আমি চ্যালেঞ্জ করছি, দম থাকলে বলুন, কালকেই ভোট হোক। আমরা তৈরি। বাংলা তৈরি... কিন্তু মনে রাখবেন বাংলা কোনওদিন বিজেপির হাতে যাবে না।’
আলিপুরদুয়ারের সভামঞ্চ থেকে রাজ্য সরকার তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ‘অসহযোগিতা’র অভিযোগও করেছেন মোদি। তাঁর অভিযোগ, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি দিচ্ছে না রাজ্য। নীতি আয়োগের বৈঠকেও আসেন না বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। এর জবাবও কড়ায় গণ্ডায় দিয়েছেন মমতা। বলেছেন, ‘বিএসএফ সহ কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি যে পরিমাণ জমি চেয়েছে, দেওয়া হয়েছে। ফ্রেট করিডর আমার অনুমোদিত প্রকল্প। যত জমির প্রয়োজন ছিল, সব দেওয়া হয়েছে। এসব সত্ত্বেও রাজনৈতিক স্বার্থে অভিযোগ করা হচ্ছে।’ নীতি আয়োগের বৈঠক প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘গিয়ে কী হবে! বলতে দেয় না। আবার কখনও বলতে দিলেও মাইক বন্ধ করে দেয়।’ প্রধানমন্ত্রীকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর চ্যালেঞ্জ—‘টেলিভিশন চ্যানেলে মুখোমুখি বসুন। বোঝা যাবে, কে কত কাজ করেছে।’
২৬’এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি’র সঙ্গে নতুন করে শুরু হওয়া রাজনৈতিক সংঘাতের এই পর্বে কি তাহলে সর্বদলীয় প্রতিনিধি দল ছেড়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় চলে আসবেন? এই প্রশ্নের উত্তরে মমতার সাফ কথা, যতদিন আমাদের দল থাকবে, ততদিন আমরা দেশের জন্য কাজ করে যাব। দেশ কারও একার নয়। আমাদের সবার। অভিষেক দেশের কাজ করতে গিয়েছে, সেটা করবে। কেন ফেরত আসবে? বরং মোদির যাওয়া উচিত। মমতার অভিযোগ, ‘অপারেশন সিন্দুর’ সেনার কৃতিত্ব। সেটাকে নিজের কীর্তি বলে প্রচার করছেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিন রাজ্যের দুর্নীতি ইস্যুকে হাতিয়ার করেও মমতার সরকারকে আক্রমণ করেন মোদি। তবে প্রধানমন্ত্রীর মুখে দুর্নীতির কথা মানায় না বলে সাফ জানিয়ে দেন মমতা। কারণ, মোদির গুজরাতেই সব থেকে বেশি দুর্নীতি হয় বলেই দাবি তাঁর। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যদি কোথাও কোন দুর্নীতি হয়, সরকার তো তার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিচ্ছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যে তো দুর্নীতির ভূরি ভূরি অভিযোগ, কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? বাংলায় এসে বড় বড় কথা বললেও, আমেরিকার সামনে এক মিনিটে চুপ করে যান মোদিজি!
দেশ এবং সেনাবাহিনীকে শিখণ্ডী বানিয়ে ভোটের রাজনীতি মমতা চান না। বরং বারবার জানিয়েছেন, দেশের নিরাপত্তার প্রসঙ্গে সবসময় তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের পাশে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এদিনের সভা পরিষ্কার করে দিয়েছে, আগামী বছর বাংলার ভোট ছাড়া কিছুই ভাবছে না বিজেপি। সেই মতোই রণকৌশল স্থির করে দিচ্ছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। মমতার তোপ, ‘শুধু বাংলা নয়, সব রাজ্যেই অপারেশন সিন্দুর নিয়ে, দেশকে নিয়ে রাজনীতি করছেন মোদি। এটা ওঁকে শোভা পায় না।’ ১ লক্ষ ৭৫ হাজার কোটি টাকার প্রাপ্য এখনও পায়নি বাংলা। সেই প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রীর তোপ, এরপরও মিথ্যাচার করতে লজ্জা হয় না?
একদিকে মমতা বিজেপি শাসিত অসমে ‘লাইসেন্সড বন্দুকে’র ঢালাও ছাড়পত্রের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন, তেমনই উত্তরপ্রদেশের রাস্তায় তাঁরই দলের ন্যক্কারজনক ও অশালীন আচরণকে কেন্দ্র করে নিন্দার ঝড় তুলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে মমতার শানিত আক্রমণ, ‘আমাদের এখানে নারীরা সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত। আপনি কী করেছেন? যারা মহিলাদের সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ করেছে, আপনি তাদেরই বিজয়ীর মতো ঘুরিয়েছেন!’ মমতার প্রশ্ন, ‘ভোট এলেই বাংলার কথা মনে পড়ে? অন্য সময় কোথায় থাকেন? কেন একবারও মণিপুরে যাওয়ার কথা মনে হয় না? কেন এই হিন্দু-মুসলিম বিভাজন?’ মমতা কিন্তু এদিন বুঝিয়ে দিয়েছেন, দেশের অসম্মান তিনি মেনে নেবেন না। বাংলার তো নয়ই।