নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: কথা বলতে গেলে পিন্টুর মুখ থেকে গোঁ গোঁ ধরনের শব্দ বেরয় শুধু। প্রতিবন্ধী স্কুলে চতুর্থ শ্রেণি অবধি গিয়েছিল ছেলেটি। তারপর শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে আর যায়নি। ফলে পড়াশোনাটা বিশেষ শেখা হয়নি। পিন্টু হতে পারে প্রতিবন্ধী, হতে পারে শারীরিকভাবে সেভাবে সক্ষম নয়, কিন্তু আত্মসম্মানজ্ঞান কারও থেকে কম নয়। বাবা ওকে একটি ওজন মাপার মেশিন কিনে দিয়েছেন। ১১ বছর আগে সেটি নিয়ে সল্টলেকে বৈশাখী ফুটওভার ব্রিজের উপরে বসে পড়েছিল ছেলেটি। তারপর রোজ সকাল থেকে রাত অবধি ঠায় বসে থাকে। পথচারীদের ওজন মাপে। বিনিময়ে ৫ টাকা করে নেয়। এভাবে মেরেকেটে শ’খানেক রোজগার হয়। টাকাটা মায়ের হাতে তুলে দেয় পিন্টু।
পিন্টু পাঁজা কেষ্টপুরের কাছে জগৎপুরে থাকে। বাবা নারায়ণ পাঁজা রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। আয় খুব একটা বেশি নয়। ফলে সংসার চালাতে পিন্টুর ওই ১০০ টাকাটা সংসারের খুব কাজে আসে। যতই গরম পড়ুক দুপুরে ওকে ব্রিজের মাথায় পাওয়া যাবেই যাবে। যতই ঘাম ঝড়ুক রাত ১০ টা অবধি বসে থাকে খোলা আকাশের নীচে। এই ব্রিজ দিয়ে বহু মানুষ কেষ্টপুর খাল পারাপার করেন। পিন্টুকে দেখে স্নেহবশত দাঁড়ান। ওজন মাপেন। এভাবে টুকটাক খদ্দের জুটে যায়। শ’খানেক টাকা চলেও আসে। পিন্টু তাতেই খুশি।
পিন্টু পাঁজা জন্ম থেকেই মূক ও বধির। কানের পর্দা নেই। ফলে কথা শেখা হয়নি। কোনোদিন কথা বলা হয়নি ওর। রাজাবাজারে প্রতিবন্ধী স্কুলে পড়াশোনা করত। কিন্তু চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনায় ইতি টানে দু’টি কারণে। একটা কারণ হল, সংসারে অভাব। ওর দিদি আছে। দিদি পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। এমএ অবধি পড়েছেন। দিদির আর ওর পড়ার খরচ রাজমিস্ত্রি বাবার পক্ষে টানা সম্ভব ছিল না। তাই পিন্টুর পড়া এগয়নি। দ্বিতীয় কারণটি হল, পিন্টু নিজেও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে পড়াশোনাটা ঠিক কবজা করতে পারছিল না। ফলে ইতি।
ছেলেটি অত্যন্ত সহজ সরল। মুখে সর্বদা বোবা হাসি। বৈশাখী ব্রিজে রেলিংয়ের ধারে ছোটো একটু জায়গা নিয়ে বসে। ওজন মাপার মেশিনটি থাকে সামনে। একটি কাগজে লেখা, ‘আপনার ওজন যাচাই করুন মাত্র পাঁচটি (৫) টাকার বিনিময়ে এবং একজন প্রতিবন্ধী ভাইকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন।’ একই বয়ান হিন্দি ও ইংরেজিতেও লেখা আছে আলাদা কাগজে। মাদুর পেতে তার উপরে কাগজ পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় বসে থাকে পিন্টু। ক্লান্তি ওকে কাবু করতে পারে না। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার অভিশাপ অটল জীবনশক্তি দিয়ে ঢেকে রেখে দিয়েছে ছেলেটি। পিন্টুর বয়স এখন ৩১। ওর মা বললেন, ‘আমরা মেয়ে খুঁজছি। পেলে ছেলের বিয়ে দেব।’ নিজস্ব চিত্র