Bartaman Logo
৬ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সরকার ভেঙে ভোট? উঁহু, বলুন বিশ্বগুরু জিন্দাবাদ

অন্তর্বর্তী ভোট? মানে, ২০২৯ সালের আগে দেশে ভোট হবে? করতে বাধ্য হবে বিজেপি সরকার? কংগ্রেস আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখছে বটে! প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচন ‘বেআইনি’ (ইললিগাল), তাই ভোট বাতিল করতে হবে।

সরকার ভেঙে ভোট? উঁহু, বলুন বিশ্বগুরু জিন্দাবাদ
  • ৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: অন্তর্বর্তী ভোট? মানে, ২০২৯ সালের আগে দেশে ভোট হবে? করতে বাধ্য হবে বিজেপি সরকার? কংগ্রেস আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখছে বটে! প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচন ‘বেআইনি’ (ইললিগাল), তাই ভোট বাতিল করতে হবে। সরকার ভেঙে দিতে হবে। আর নতুন করে ভোট করাতে হবে। তাও ব্যালটে। দাবির তো একটা লিমিট থাকবে নাকি! কে করবে? জ্ঞানেশ কুমার? ও হো, না না... জ্ঞানেশ কুমার তো পদত্যাগ করবেন। তাঁর জায়গায় নতুন কেউ আসবেন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন প্যানেল সেই নিয়োগ করবে। তাতে হ্যাঁ হুজুর বলে সায় দেবেন তাঁরই কোনো এক মন্ত্রী। আর সেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এসেই নিরপেক্ষ ভোট করিয়ে দেবেন! তার আগে অবশ্য রাষ্ট্রপতি এই সরকার ভেঙে দেবেন। লোকসভা ও রাজ্যসভায় আস্থাভোটে বিজেপি পরাজিত হবে। এবং মানুষ ড্যাং ড্যাং করে ভোট দিতে যাবে। এও কি হতে পারে? আর এই আম জনতা ভোট দেবে কাকে? কোনো বিরোধী দলকে? হেঃ... মাথার উপর বিশ্বগুরু স্বয়ং বসে আছেন। তাঁকে টপকে অন্য কোনো দলকে খামোকা তারা ভোট দিতে যাবেই বা কেন! উন্নতির শিখরের দিকে এগিয়ে চলেছে আমাদের ভারত। খাদ্য সংকট, তেল সংকট, সার সংকট... এসব একটু তো থাকবেই। থাকতেই পারে। ১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশ। সবাইকে খেতে পেতেই হবে? এমন মাথার দিব্যি কে দিয়েছে? সংকট থাকবে। মানিয়েও নিতে হবে। বিশ্বগুরু মন্দির বানাচ্ছেন, রাষ্ট্রবাদের কথা বলছেন... এটাই তো ভোটের জন্য যথেষ্ট! রাষ্ট্রবাদ মানে কী? সোজা কথায়, পাকিস্তান বিরোধিতা। জেহাদের বিরোধিতা। আপনি যদি দেশদ্রোহী হন তাহলে বলবেন, স্বাধীনতার আগে তো পাকিস্তান ছিল না! তাহলে তখন জন্মালে কীভাবে পাকিস্তান বিরোধিতা করতাম? আপনি এসব প্রশ্ন নিয়েই থাকুন। তাই তো আপনার কিছু হল না। বারবার বলবেন, আমি দেশপ্রেমী। আমি সরকার প্রেমী। আমি বিজেপি প্রেমী। তাহলে না আপনার গুরুত্ব! 

Advertisement

এই যে ছেলেমেয়েগুলো চাকরির দাবিতে, শিক্ষার অধিকার চেয়ে পথে নামছে। রাস্তা অবরুদ্ধ করছে। জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবি তুলছে। বিশ্বগুরুকে এই ‘অ-গণতান্ত্রিক’ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছে... এদের নিয়ে কথা বলতেই হবে? এদের হয়ে স্লোগান দিতেই হবে ‘ওয়ান, টু, থ্রি ফোর...’! কী সাহস এদের? বিশ্বগুরুকে নিয়ে স্লোগান বাঁধছে? সরাসরি ভোট চোর বলছে? পথে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলছে, উমর বা শারজিলের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে না কেন? শাসক যাদের দেশদ্রোহী বলে দিয়েছে, তাদের আবার ট্রায়াল কী? অথচ, এই যে নেহা বোরা মেয়েটা বারবার প্রশ্ন তুলছে। রাস্তায় নামছে। অবরোধ করছে। মার খাচ্ছে। সারা গায়ে ক্ষত নিয়ে ফিরছে। আবার নামছে পরদিন। হুংকার দিচ্ছে, ‘যন্তর মন্তর ২.০, পতন শুরু হয়ে গিয়েছে।’ একেই তো গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যাওয়া উচিত। ঠিক কাজ করেছিল দিল্লি পুলিশ। নিয়ে গিয়েছিল অজ্ঞাত কোনো এক জায়গায়। তারপর ছেড়েছে। ফোন ফেরত দেয়নি। কেন দেবে? দিলেই ফোন করবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করবে। জনমত গড়বে। আবার স্লোগান দেবে। আবার প্রশ্ন তুলবে। যাদবপুরে আসবে। বিজেপি বিরোধী হুংকার ছুড়বে। পিলপিল করে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা জড়ো হয়ে যাবে তার আশপাশে। একে প্রকাশ্যে রাখলেই মুশকিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ভিডিয়ো প্রকাশ পেলে কমেন্ট সেকশনে সাধারণ মানুষ আবার লিখবে, ‘তু শেরনি হ্যায়।’ কারা এই সাধারণ মানুষ? নিশ্চয়ই প্রকৃত দেশপ্রেমী নয়। অন্ধভক্ত নয়। এরা নিশ্চয়ই দেশদ্রোহী। উৎসাহ দিচ্ছে নেহা বোরাকে? সাহস তো এদেরও কম নয়? কে এই নেহা মেয়েটি? কয়েকদিন আগে ক’জন চিনত তাকে? কোন দলের সমর্থক, বা আইসার পুরো নাম জিজ্ঞেস করলে ১০ জনের মধ্যে ন’জনই বলতে পারবে না। কিন্তু তারা নেহা বোরাকে চিনে গিয়েছে। কোনো দলের জন্য নয়, রাজনীতির জন্য নয়... স্রেফ অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের জন্য। মানুষের মনে হয়েছে, এই মেয়েটা আমাদের জন্য রাস্তায় নামছে। আমার ছেলেমেয়ের শিক্ষার অধিকার মসৃণ করার জন্য, বেকারত্বের বিরুদ্ধে, ভোটাধিকারের লক্ষ্যে, গণতন্ত্রের জন্য। এদের রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর বলব না? বলতেই হবে। এরা বিষফোড়া। এমন যন্ত্রণা দেবে, কার একটা নাম যেন খগেন বলে মনে হবে। অথচ, এর তো রাজনীতিতে সবে হাতেখড়ি হয়েছে বললেও ভুল হবে না। আর তার ডাকে যে ছেলেমেয়েগুলো ব্যাগ কাঁধে কাতারে কাতারে এসে জড়ো হচ্ছে, তাদের সঙ্গে রাজনীতির দূর দূরান্ত পর্যন্ত সম্পর্ক নেই। এদের কাছে জমায়েতের অর্থ, প্রশ্ন তোলা। অধিকার বুঝে নেওয়া। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সবটাই ধান্দা হয়ে গিয়েছে। এদের কাছে হয়নি। বিরোধী দলগুলো নিজেদের পিঠ বাঁচাতে এখনও সমঝোতা করে। এটা-ওটা বলে ভেসে থাকতে চায়। কিন্তু এরা ভাসতে চায় না, ভাসিয়ে দিতে চায়... গণতন্ত্র বিরোধী যাবতীয় শক্তিকে। এরা বুদ্ধিদীপ্ত। শার্প। টু দ্য পয়েন্ট কথা বলে। ইংরেজি-হিন্দি সবেতেই সাবলীল। আক্রমণ ধেয়ে এলে যুক্তি এবং পড়াশোনার রেফারেন্স টেনে জবাব দিতে জানে। গোটা বিরোধী কুলে একমাত্র রাহুল গান্ধী ছাড়া এই উদ্যোগ কোনো বিরোধী নেতানেত্রীর মধ্যে দেখা যায় না। একমাত্র তিনিই ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে ইন্টার‌্যাকশন করার চেষ্টা করছেন। কথা বলছেন। নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে দিচ্ছেন। ‘ছাত্রো কি গুঞ্জ’ আয়োজনের মাধ্যমে একটা জেনারেশনের কাছে পৌঁছাতে চাইছেন। বোঝা যায়, এর নেপথ্যে একটা লক্ষ্য আছে। মানুষের কাছে পৌঁছানোর। কিন্তু বাকিরা? নতুন কিছু আদৌ কি দিতে পারছে? তৃণমূল না হয় অবক্ষয়ের শেষ স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ডিএমকে, এডিএমকে, সমাজবাদী পার্টি... নতুন কী বার্তা দিচ্ছে তারা? মানুষ এখন দু’ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। এক পক্ষ বিবেচনা করতে সক্ষম। আর এক পক্ষ বিবেচনার ধার ধারে না। প্রথম পক্ষ পছন্দ করে সরাসরি বার্তা। তাদের কাছে ছন্দ মেলানো ভ্যানিশ-ফিনিশের কোনো মানে নেই। এরকম বিরোধী চাই না। চাই দ্বিতীয় পক্ষ। তবেই না বিশ্বগুরুর আসন আরও মজবুত হবে। তাঁর প্রতি তাই আকুল অনুরোধ, এটাই চালিয়ে যান। বিরোধী বলে কিছু রাখবেন না। সবার পিছনে গন্ধ খুঁজে বের করুন। তারপর চেপে ধরুন। রফা করুন, প্রস্তাব দিন, ভয় দেখান। এরা সবাই রাজনৈতিকভাবে বেঁচে থাকতে, টিকে থাকতে মরিয়া। কাজ দেবেই। আর বিজেপিকে এসব শেখানো মানে সূর্যকে টর্চ দেখানোর শামিল। রাজ্যে রাজ্যে রীতিমতো ব্যুৎপত্তি অর্জন করে ফেলেছে বিশ্বগুরুর দল। মুশকিলে ফেলেছে এইসব কচিকাঁচারা। এদের আবার কিছুতেই ভয় নেই। মারের ভয়, কেরিয়ার নষ্ট হওয়ার ভয়, বা জেলের ভয়। তাই কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না। নেমে পড়ছে রাস্তায়। বিরোধী বলে যারা পরিচিত, তাদের কাছে দাবি করছে। আঙুল তুলছে। বলছে, সরাসরি জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা চাও। রাস্তায় নামো। দেখাও তোমাদের শক্তি। এই শক্তি স্রেফ মেশিনারি বা প্রতিষ্ঠানের জোরে আসে না। সেটা শাসকের জন্য তোলা রয়েছে। তারা সেই নয়ছয় করবেই। এটা জেনে এবং পাঁচ গোল খেয়েই তোমাকে মাঠে নামতে হবে। তারপরও শক্তি দেখাতে হবে। বিশ্বগুরু কেন এখনও বুঝছেন না, ককরোচ জনতা পার্টি বা নেহা বোরার মতো তরুণ প্রজন্ম সেটাই করে দেখাচ্ছে। সোজা কথা সোজা ভাষায় বলছে। এটাই ঠেকানোর রাস্তা খুঁজতে হবে যে! আস্তিন থেকে নতুন কোনো তাস বের করতে হবে। তবে একটা সুবিধা আছে... জমি হারানোর ভয়ে দেশের প্রধান বিরোধী দল বলে পরিচিতরা চেষ্টা চালাচ্ছে দিপকে-নেহাদের মধ্যে ফাটল ধরানোর। এটা যত বাড়ে, ততই মঙ্গল। কিন্তু প্রশ্ন হল, বাড়বে কী? এই প্রজন্ম কিন্তু যথেষ্ট বুদ্ধি রাখে। ইডি-সিবিআইয়ের ভয় দেখিয়ে, ডিম ছুড়ে বিরোধী রাজনীতিটাকে কফিনবন্দি করে দেওয়া যায়। এদের যাচ্ছে না। পুরো ব্যাপারটাই প্রশাসনিক দিক থেকে ম্যানেজ করতে হবে। সেটা অবশ্য আগেও করেছে গেরুয়া সরকার। এসআইআরের মতো একটা কিছু আমদানি করবে। প্রযুক্তি এবং হাতেগোনা কয়েকজন সরকারি তাঁবেদারকে কাজে লাগাবে। তাতেই কেল্লাফতে। এমনিতেই তো এ দেশের মানুষ মূল্যবৃদ্ধির জ্বালা উপভোগ করে, চাকরি না পেলে ভক্ত হয়ে যায়, ইতিহাস ভেঙেচুরে নিজেদের মতো উপস্থাপন করতে চায়। সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক কলকাঠিগুলো থাকলেই হবে। অন্তর্বর্তী ভোট হোক বা আড়াই বছর পর নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচন... বিজেপি এবং বিশ্বগুরু, দুই পক্ষই নিশ্চিন্ত। তারপরও যদি পাঁকে পা আটকে যায়? বিরোধীকে ভোট দিলেও সেই প্রার্থী তো নির্বাচনের পর শাসকের দলে ভিড়ে যায়... এতই বিচিত্র এই দেশ। তাই ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ ভুলে যাও। পুলিশের একচোখামি, শাসকের দাদাগিরির সামনে মাথা নীচু করো। আর চিৎকার করে বলো, বিশ্বগুরু জিন্দাবাদ।  
নেহার মতো মেয়েরা শুধু লড়ে যাক। একদিন... দু’দিন... প্রতিদিন... যতদিন না বদল হয় সিস্টেমে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ