নিজস্ব প্রতিনিধি, বোলপুর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে মুক্তচিন্তার প্রসারের জন্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেখানেই বাসা বাধছে সাম্প্রদায়িক শক্তি। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস পরিচালিত স্কুল নেটওয়ার্ক ‘বিদ্যাভারতী’-র একটি পরীক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সেমিস্টার পরীক্ষার সূচি পরিবর্তন করার অভিযোগ উঠেছে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম অসন্তোষ দানা বেঁধেছে শিক্ষা মহলে। এই ঘটনাকে শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের নির্লজ্জ দৃষ্টান্ত বলে অভিহিত করেছেন শিক্ষাবিদদের একাংশ।
ঠিক কী ঘটেছে? বিশ্বভারতী সূত্রের খবর, আগামী ৭ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বভারতীর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের সমস্ত বিভাগের সেমিস্টারের পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত ১১ ডিসেম্বর কর্তৃপক্ষ একটি নতুন নির্দেশিকা জারি করে। সেই নির্দেশিকায় বলা হয়, আগামী ২৯ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও পরীক্ষা নেওয়া যাবে না। যদি কোনও বিভাগ, সেন্টার কিংবা ভবন ইতিমধ্যেই ওই সময়ের মধ্যে পরীক্ষার সূচি প্রকাশ করে থাকে, তা যেন বদলানো হয়। এর কারণও উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে ওই নির্দেশিকায়। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, আগামী ৩১ জানুয়ারি বিশ্বভারতীতে ‘ভারত বোধ আইকেএস’ নামক একটি পরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে। এই পরীক্ষাটি যাতে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়, তার জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরীক্ষার সূচিতে এই রদবদল।
যদিও বিশ্বভারতীর জনসংযোগ আধিকারিক অতিগ ঘোষের সাফাই, পরীক্ষার সময়সূচিতে তো কোনও বদল আনা হচ্ছে না। যে সময়ের মধ্যে পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেই সময়ের মধ্যেই শেষ হবে। শুধু মাঝের কয়েকটা দিন পরীক্ষা হবে না। সেই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, কেন্দ্রের নির্দেশ অনুযায়ী সমস্ত কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়েই ‘ভারত বোধ আইকেএস’ পরীক্ষা হচ্ছে। আমাদের রাজ্যে বিশ্বভারতী এবং খড়গপুর আইআইটিতে এই পরীক্ষা হবে। যদিও বিশ্বভারতী সূত্রের খবর, বেশ কিছু বিভাগ ইতিমধ্যেই ওই সময়ের মধ্যে পরীক্ষার দিনক্ষণ চূড়ান্ত করে ফেলেছিল। তাদের পুনরায় পরীক্ষার নতুন রুটিন তৈরি করতে হচ্ছে, যা নিয়ে ক্ষুব্ধ অধ্যাপকরা।
জানা গিয়েছে, ‘ভারত বোধ’ নামক এই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য, যুবসমাজকে ভারতীয় ঐতিহ্য, দর্শন, বিজ্ঞান (যেমন আয়ুর্বেদ, জ্যোতির্বিদ্যা, যোগ), সাহিত্য এবং শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করা। জাতীয় শিক্ষানীতির অন্যতম অঙ্গ হিসেবে ‘ভারত বোধ’-কে এ রাজ্যের পাঠক্রমেও অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে কেন্দ্রের। যদিও বিশ্বভারতীর অধ্যাপকদের একাংশের প্রশ্ন, একটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আদর্শপুষ্ট সংগঠনের বেসরকারি কর্মসূচির জন্য কেন বিশ্বভারতীর পরীক্ষার সূচি বিঘ্নিত করা হবে? শুধুমাত্র পরীক্ষার সূচি বদলই নয়, ৩১ তারিখ ওই পরীক্ষা যাতে ঠিকমতো হয়, সে ব্যাপারেও অধ্যাপকদের কাছে সহযোগিতা করার ফরমান এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অধ্যাপকের মতে, কেন্দ্রের অঙ্গুলি হেলনে এবং সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে আরএসএস তাদের ভাবাদর্শ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রচার করতে চাইছে। বিশ্বভারতীর আশ্রমিক সুপ্রিয় ঠাকুর বলেন, অত্যন্ত নিন্দাজনক ঘটনা। বিশ্বভারতী ক্রমশই গেরুয়া রাজনীতির আখড়া হয়ে উঠছে।