শান্তনু দত্তগুপ্ত: উপরতলায় কথা বলেছিলাম। বলল, ওই ৩৫টা ফর্ম আলাদা করে রেখে দিতে। সব আপলোড হয়ে গেলে ইআরওর কাছে জমা দিয়ে দিতে হবে। সে না হয় দিয়ে দেব। কিন্তু চিন্তার বিষয় কী জানেন? এই সবক’টা যে বিলি হয়েছে, সেটা আমাকে দেখাতে হয়েছে। আমি কিন্তু বলেছি... এগুলো যে জমা দিচ্ছি, সেটা আপনাদের সই করে দিতে হবে। এরপর কিছু গণ্ডগোল হলে তো আমিই ফাঁসব, তাই না! শাস্তি তো আর উপরতলা পাবে না! এছাড়াও ১২টা ফর্ম ফিরে আসেনি। মানে, ওই ফর্মগুলোও ডিজিটাইজ হয়নি! সব মিলিয়ে ৪৭টা ফাঁক রয়ে গিয়েছে আমার পার্টে। ভাববেন না, এখানেই আমার হ্যাপা শেষ! সব আপলোড করার পরও লোকজন ফোন করে বলছে, আমার ফর্ম সাবমিট হয়নি। ওয়েবসাইটে দেখাচ্ছে না। অথচ আমি সব অ্যাপে তুলে দিয়েছি! উপরে কথা বললাম। ওরা বলল, আবার সব সাবমিট করুন। ৮৫৬টা ফর্ম আবার অ্যাপে তুললাম। তখন দেখলাম, খান দশেক সাবমিট হয়নি। এরা যে সার্ভারে কী করে রেখেছে! কিছুই বুঝতে পারছি না।
—দক্ষিণের এক বিএলও
একের পর এক মানুষ মারা যাচ্ছে। বিএলওরা কাজের চাপ সামলাতে না পেরে আত্মহত্যা করছে। মৃত্যুমিছিল বেড়ে চলেছে... আর আপনি হাসছেন? এই প্রতিক্রিয়া কি কমিশনের থেকে সাধারণ মানুষ আশা করে? আপনার হাতে তো রক্ত লেগে রয়েছে!
—জ্ঞানেশ কুমারকে তৃণমূল
কংগ্রেসের প্রতিনিধিদল
বিএলওরা যে পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন, তার দায়িত্ব কিন্তু নির্বাচন কমিশনের। জ্ঞানেশ কুমার দিল্লিতে বসে থাকবেন, উনি জ্ঞানগর্ভ দুটো-তিনটে স্টেটমেন্ট দেবেন, আর পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি অন্যরকম হবে... এটা চলতে পারে না। নির্বাচন কমিশনকে আসতে হবে এখানে। জ্ঞানেশ কুমারকে আসতে হবে। বিএলওরা কী অবস্থায় আছে, সেটা দেখতে হবে। প্রক্রিয়া কীভাবে চলছে, বুঝতে হবে। শুধু প্রতিনিধি পাঠালে হবে না। তাঁর প্রতিনিধি এখানকার অফিসে কী অবস্থায় আছেন, সেটা বুঝতে হবে। দুটো অফিসার পাঠিয়ে দিলাম, আর উপর থেকে বসে মনিটরিং করলাম... চলবে না। পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি অন্য রাজ্যের থেকে আলাদা। একুশ সালে আমাদের ৫৬ জন কর্মী খুন হয়েছে। তারপরও আমাদের কর্মীরা খুন হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ইলেকশন কমিশনার যদি মনে করেন, দিল্লিতে বসে থেকে, আর দু’-একটা ডেপুটেশন নিয়েই ওখান থেকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে গোটা প্রক্রিয়া কন্ট্রোল করবেন, সেটা হতে পারে না।
—শমীক ভট্টাচার্য, বিজেপির রাজ্য সভাপতি
তিনটি বক্তব্য। প্রথমজন মাঠেঘাটে ঘুরছেন, শাস্তির খাঁড়া মাথায় ঝুলিয়ে ভোটারদের ভাগ্য গণনার জন্য তথ্য লিখছেন, আর গালিও খাচ্ছেন। তাঁর কাছে ভিলেন কে? নির্বাচন কমিশন।
দ্বিতীয়টি বাংলার শাসক দলের। বিএলও এবং সাধারণ মানুষের মৃত্যুর জন্য তারা সরাসরি দায়ী করছে কমিশনকে। তাদের অপরিণামদর্শিতাকে। সাফ বলছে, তিন বছরের কাজ তিন মাসে হয় না। তারা প্রশ্ন তুলছে নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্য নিয়েই। অর্থাৎ, তাদের কাছেও ভিলেন কমিশনই।
তৃতীয় বক্তব্য বঙ্গ বিজেপির। তারা কেন্দ্রে শাসক। বাংলায় বিরোধী। তা সত্ত্বেও তারা তোপ দাগছে কমিশনের বিরুদ্ধে। কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে স্বয়ং জ্ঞানেশ কুমারকে। এসআইআর যখন পুরোদমে বাংলার ঘরে ঘরে হানা দিয়েছে, ঠিক এমন একটা সময়ে বিজেপির খলনায়ক তাহলে কে? সেই নির্বাচন কমিশন।
প্যাটার্নটা আশ্চর্যজনকভাবে এক। কিন্তু কেন? তৃণমূল কংগ্রেস যে কমিশনের সমালোচনায় সরব হবে... তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। বিরোধিতা ছেড়ে দিলে বিরোধী রাজনৈতিক দল ধর্মচ্যুত হয়। আর এক্ষেত্রে তাদের ঝুলিতে যুক্তি তো আছেই—অত্যন্ত কম সময়ে এতবড় কর্মযজ্ঞ, ভোট কারচুপির চেষ্টা, কেন্দ্রের কথায় কলকাঠি নাড়া এবং আতঙ্ক ছড়ানো। এই সবই তর্কসাপেক্ষ। তবে সময়সীমা এবং আতঙ্ক ছড়ানোর বিষয়টা হয়তো ততটা নয়। সেটা আম আদমিও হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। তাই তারা কমিশনের উপর খেপে যেতেই পারে। ২৫’এর গণ্ডি পেরোনো ভোটার মাত্রই জানেন, এই কাজ আগেও হয়েছে। কিন্তু এভাবে নাগরিকত্ব যাচাই হয়নি। কাজকর্ম ফেলে বাড়ি ছুটে আসতে হয়নি। আতঙ্কও গ্রাস করেনি। তাহলে এবার কেন? বাংলাদেশি কি তখন ছিল না? সেই সময় কি ২৯ লক্ষ নাম বাদ যায়নি? তাহলে এবার এত ধানাইপানাই কেন? শুধু ক্ষোভ নয়, তিতিবিরক্ত হয়ে উঠেছে মধ্য থেকে নিম্নবিত্ত।
প্রশ্ন হল, হঠাৎ বিজেপি কেন কমিশনকে ভিলেন বানিয়ে প্রচার শুরু করল? এর উত্তর দু’টি। প্রথমত, কমিশন যে স্বাধীনভাবে কাজ করে, তাদের উপর কারও কোনও প্রভাব নেই, সেটা প্রমাণ করা। আর দ্বিতীয়ত, নিজেদের পিঠ বাঁচানো। শমীক ভট্টাচার্য ঠিক যেদিন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে কাঠগড়ায় তুলে বোমা ফাটিয়েছেন, সেদিনই কিন্তু কমিশন বাংলায় ১২ জন বিশেষ পর্যবেক্ষক নিয়োগের ঘোষণা করেছে। মাথায় বসিয়েছে বাংলারই প্রাক্তন আমলা সুব্রত গুপ্তকে। বাকি রাজ্যে এই ‘কঠোর মনোভাব’ তারা দেখায়নি। অর্থাৎ এটা অস্বীকার করার জায়গা নেই যে, বিজেপির বঙ্গ ব্রিগেডের অভিযোগকে মান্যতা দিয়েই পর্যবেক্ষক নিয়োগ! সেই সুর কিন্তু শমীকবাবুর কণ্ঠে শোনাও গিয়েছে—‘পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি অন্য রাজ্যের মতো নয়।’ আর হ্যাঁ, বঙ্গ বিজেপি ভালোই বুঝতে পারছে, কমিশনের তৈরি করা এই ‘দমবন্ধ’ পরিস্থিতিতে বাংলার মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে বিজেপির উপরও। কারণ, সাধারণ খেটে খাওয়া নাগরিক রাজনীতি বোঝে না। তারা বোঝে সুবিধা। অসুবিধাও। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তারা বিস্ফোরণ ঘটাতে পারবে না। তাহলে বহিঃপ্রকাশের জন্য হাতের কাছে কাকে পাওয়া যাবে? রাজনৈতিক দলকে। বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আছে। আর এসআইআরে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, এনআরসি আতঙ্ক, ভোট চুরি... এসবের দাগ তাদের গায়ে লেগেই গিয়েছে। কয়েক মাস বাদেই বাংলায় ভোট। এই উত্তাপ যদি ইভিএমে গিয়ে পড়ে, ফল ঘোষণার দিনটা তাদের জন্য খুব একটা সুখকর হবে না। তাই একটা দেওয়াল দরকার, যা কমিশনের থেকে বিজেপিকে আলাদা করবে। শমীকবাবু তারই ইট পেতেছেন। তিনি তো বটেই, বিজেপির সামান্য কর্মী-কার্যকর্তারাও জানেন, কমিশন তাঁদের দলকে ‘ডোবাবে’ না। নিন্দুকদের ভাষায়, গেরুয়া শিবিরের সুবিধা মতোই ঘুঁটি সাজাবে। কারণ জ্ঞানেশ কুমার কোনও টি এন শেষন নন। তিনিও স্রেফ চাকরি করেন। রবিবার হঠাৎ এসআইআরের সম্পূর্ণ নির্ঘণ্ট বদলে ফেলাও তেমন কিছুর ইঙ্গিত বহন করে। ওইদিন পর্যন্ত ১২টি রাজ্যের মধ্যে কোনওটিতেই ডিজিটাইজেশন ৮১ শতাংশের নীচে ছিল না। বাংলায় তো পরিসংখ্যানটা ৯৫ শতাংশের উপর। ব্যতিক্রম শুধু একটি—উত্তরপ্রদেশ। রবিবার পর্যন্ত যোগীরাজ্যে ডিজিটাইজেশন হয়েছে মাত্র ৬৯ শতাংশ। চারদিনের মধ্যে এতবড় ফাঁক ভরাট তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সময়সীমা সাতদিন করে পিছিয়ে দেওয়ায় শাসক হিসেবে যোগীরাজ্যে বিজেপি বাড়তি অক্সিজেন পেয়ে যাবে এসআইআরের কাজ শেষ করার। আর বিরোধী হিসেবে বাংলায় পাবে আরও বেশি করে ভোটারদের ‘তথ্য মিলিয়ে দেখার’ সময়। কারণ কমিশন জানিয়েই দিয়েছে, বিএলওদের সঙ্গে নাগরিকদের দেওয়া তথ্য যাতে বিএলএ’রা মিলিয়ে নিতে পারেন, সেটাও সময়সীমা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নজরে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, এসআইআরে নাম ঠিকমতো ‘বাদ গেল’ কি না, সেটা বুঝে নিতে পারবে বিজেপি। আর তৃণমূল দেখবে, সঠিক ভোটার বাদ গেল কি না। কারা সফল হবে, সেটা বলবে সময়। কমিশন কিন্তু দিনের শেষে দেখিয়ে দেবে—আমরা নিরপেক্ষ। সত্যিই কি তাই? তেমনটা হলে তৃণমূল অপ্রয়োজনে ভয় পাচ্ছে। এসআইআরে যত নামই বাদ যাক না কেন, তাতে সব দলই ভোটার হারাবে। শুধু তৃণমূল ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এমনটা নয়। কিন্তু জ্ঞানেশ মহাশয়রা যদি নিরপেক্ষ না হন, তাহলে কোনও না কোনওভাবে সুবিধা পাবে বিজেপি। কীভাবে? বিরোধীরা বলছে, এটাই সায়েন্টিফিক রিগিং। যা হবে, সবটাই মেশিনে। বুথে নয়। বিজেপির হয়ে তো কমিশন কাজ করেই দেবে। জনসমক্ষে তাদের বলির পাঁঠা বানিয়ে নিজেদের আখের বা ভোটব্যাংক গুছিয়ে নিতে আপত্তি কোথায়?
বিষয়টা রাজনীতি। তাই সম্ভাবনা সবেরই আছে। তবে একটা বিষয় ঠিক, ১৪ ফেব্রুয়ারি এসআইআরের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হওয়ার অর্থ, ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলায় ভোট ঘোষণা হচ্ছে না। তার মানে কি নির্বাচনও পিছিয়ে যাবে? সম্ভবত নয়। কেন্দ্র তথা কমিশন চাইবে, মে মাসের প্রথম সপ্তাহেই ভোটের গোটা প্রক্রিয়া শেষ করে ফেলতে। তাই যত দেরিতে নির্ঘণ্ট ঘোষণা হবে, প্রচারের জন্য সময়টাও তত কমে আসবে। তৃণমূলের উদ্বেগ একটাই—বিজেপির হারানোর কিছু নেই। তাই যেনতেন মরিয়া চেষ্টা তারা করবেই।
কিংবা করছে। সাধারণ মানুষই জানতি পারছে না।