শান্তনু দত্ত
শান্তনু দত্ত
উচ্ছে বেগুন পটল মুলো
বেতের বোনা ধামা কুলো,
সর্ষে ছোলা ময়দা আটা,
শীতের র্যাপার নক্সাকাটা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হাট’ কবিতাটির সঙ্গে আমাদের কার না পরিচয় নেই। এমনিতেই শীত পড়তে বাজারজুড়ে হরেক সব্জি আর ফলের দেখা মিলতে শুরু করেছে। উচ্ছে, বেগুন, পটল, মুলো, কপি, গাজর, বিট থেকে শুরু করে আপেল, কমলালেবু, আমলকী... আরও কত কী! শীতকালীন এই ফল, সব্জিগুলির মধ্যে কোনও কোনওটি তোমাদের ভীষণ পছন্দের। আবার কোনওটি দেখলেই তোমরা নাক সিঁটকোও। তবে জানো কি, এই ফল-সব্জিগুলি খাওয়ার পাশাপাশি ব্যবহার হয় নানান উৎসবেও। এগুলিকে নিয়ে উৎসবে মেতে ওঠেন সাধারণ মানুষ। চল, বিশ্বের এমনই চারটি জনপ্রিয় উৎসবের কথা জেনে নিই।
স্পেনের টম্যাটো উৎসব
দোলযাত্রায় বন্ধুদের দিকে রং ভর্তি বেলুন ছোড়া হয়। তোমরাও নিশ্চয়ই সেটা কর। তেমনই স্পেনের এক উৎসবে বন্ধুদের দিকে ছুড়ে দেওয়া হয় টম্যাটো। প্রতি বছর স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ার ছোট শহর বুনিওলে আয়োজিত হয় ‘লা টোমাটিনা’। এটিই সেই জগদ্বিখ্যাত অনুষ্ঠান। আগস্ট মাসের শেষ বুধবার আয়োজিত এই ফেস্টিভ্যালে গোটা শহরজুড়ে হয় টম্যাটো বৃষ্টি। হাজার হাজার মানুষ হাতে টম্যাটো নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন। একে অপরের দিকে টম্যাটো ছুড়ে আনন্দ করেন। শোনা যায়, ১৯৪৫ সালে কয়েকজন তরুণের মধ্যে ঝগড়া হচ্ছিল। রাগের বশে একে অপরের দিকে টম্যাটো ছুড়ে দেন তাঁরা। সেই ঝগড়াই বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানের এক উৎসবের রূপ নিয়েছে। স্পেন সরকার নিয়ম করে টম্যাটো সংগ্রহ করে এই বিশেষ দিনের জন্য। দেশ-বিদেশের বহু মানুষ আগস্ট মাসে ভিড় করেন স্পেনে। এতে স্থানীয় পর্যটনের উন্নতি হয়। তবে এই উৎসবে কিন্তু কোনও টম্যাটো নষ্ট বা অপচয় হয় না। বরং যে টম্যাটোগুলি খাওয়ার উপযোগী নয়, সেগুলিই ব্যবহৃত হয় এই উৎসবে।
মেক্সিকোর মুলো উৎসব
স্কুলে নিশ্চয়ই তোমরা হাতের কাজ বা ক্রাফ্টস কর। বিভিন্ন পুরনো বা অপ্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে নতুন কিছু তৈরি করা হয়। মেক্সিকোর মুলো উৎসবও ঠিক সেভাবেই পালন করা হয়। ওয়াকহা শহরে প্রতি বছর ২৩ ডিসেম্বর পালিত হয় ‘নোচে দে রাবানোস’। এর অর্থ ‘মুলোর রাত’। কী হয় এই উৎসবে? মুলো দিয়ে বানানো হয় ছোট-বড় মূর্তি। তৈরি হয় নানা নকশা, দৃশ্য আর শিল্পকর্ম। স্থানীয় কৃষকরা বড় আকারের বিশেষ ধরনের মুলো ফলান এই দিনের জন্য। যাতে শিল্পীরা সহজেই সেগুলি কেটে বিভিন্ন আকার-আকৃতি তৈরি করতে পারেন। কেউ তৈরি করেন প্রিয় মানুষের মুখ, কেউ প্রাণী বা ফুলের ছবি আঁকেন মুলোর উপরেই। আবার কেউ ঐতিহ্যবাহী কাহিনির দৃশ্য ফুটিয়ে তোলেন মুলোর উপর। রাতে এই শিল্পকর্মগুলি প্রদর্শিত হয় শহরজুড়ে। তৈরি হয় এক মনোরম পরিবেশ। সাধারণ মানুষের সৃজনশীলতার প্রতি সম্মান জানাতেই এই উৎসব পালিত হয়।
আরকানসাসের তরমুজ উৎসব
আমেরিকার আরকানসাস অঙ্গরাজ্যে হোপ নামে একটি শহর রয়েছে। এই শহর বিখ্যাত তরমুজ উৎসবের জন্য। প্রতি বছর আগস্ট মাসে এখানে উদযাপিত হয় ‘হোপ ওয়াটারমেলন ফেস্টিভ্যাল’। এই উৎসব মূলত প্রতিযোগিতাকেন্দ্রিক। তরমুজ খাওয়ার প্রতিযোগিতা, তরমুজ নিয়ে দৌড়, তরমুজ নিয়ে প্যারেড সহ নানা মজার প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয়। তবে সবচেয়ে মজার ‘বৃহত্তম তরমুজ’ প্রতিযোগিতাটি। কৃষকরা কয়েক কেজি ওজনের বিশাল তরমুজ নিয়ে আসেন। মজা হল, কোনও যন্ত্র ছাড়া, কেবল অনুমানের ভিত্তিতে বলতে হয় তরমুজটির ওজন কত! সঠিক জবাব দিলেই মেলে পুরস্কার। সত্যিই এক মজার অভিজ্ঞতা হয়। এই উৎসবের মাধ্যমে সম্মান জানানো হয় কৃষকের পরিশ্রমকে।
হ্যালোইনে কুমড়োর ব্যবহার
কার্টুন বা কমিক্সে তোমরা নিশ্চয়ই হ্যালোইনের কথা শুনেছ। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় উৎসব পালিত হয় প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর। এই ফেস্টিভ্যালে অপরিহার্য কুমড়ো। বড় কুমড়ো কেটে তাতে চোখ-নাক-মুখের নকশা বানানো হয়, আর ভিতরে মোমবাতি জ্বালিয়ে তৈরি হয় ‘জ্যাক ও ল্যান্টার্ন’। রাতে এগুলি বাড়ির সামনে সাজিয়ে রাখা হয়। কালীপুজোর আগে ভূতচতুর্দশী পালন করা হয়। সেটা তো নিশ্চয়ই সবাই দেখেছ? সেখানে ১৪ প্রদীপ জ্বালা হয় বাড়ির বাইরে। হ্যালোইনের ধারণাও কিছুটা সেরকমই। প্রাচীন কেল্টিক ঐতিহ্য (প্রাচীন ইউরোপীয় উপজাতিদের সংস্কৃতি) থেকে কুমড়োর ব্যবহার এসেছে। আগে মানুষ বিশ্বাস করতেন, আত্মা দূরে রাখতে কুমড়োর মধ্যে আলো জ্বালানো দরকার। পরে আমেরিকায় কুমড়ো সহজলভ্য হওয়ায় হ্যালোইনের মূল প্রতীক হয়ে ওঠে কুমড়ো।