বিয়ের শাড়ি মানেই টুকটুকে লাল বেনারসি তার কোনও মানে নেই। বিভিন্ন ফ্যাব্রিক, ডিজাইন ও রং এখন কনেদের কাছে জনপ্রিয়।
বিয়ের শাড়ি মানেই টুকটুকে লাল বেনারসি তার কোনও মানে নেই। বিভিন্ন ফ্যাব্রিক, ডিজাইন ও রং এখন কনেদের কাছে জনপ্রিয়।
ঘটনা ১: ভরা বৈশাখে ঠিক হয়েছে অন্তরার বিয়ে। ‘গরমকালে ভারী বেনারসি পরলে মেয়ের কষ্ট হবে’, রব তুললেন ঠাকুমা। বাড়ির অন্যরাও চিন্তিত, এমন সময় উপায় ভেবে বের করলেন মেয়ের মা। বললেন, ‘জমকালো ঢাকাই শাড়ি পরালে কেমন হয়?’ পুরুষমহল এই ভাবনার সঙ্গে একেবারেই অপরিচিত। তাই খানিক দোলাচলে পড়লেন বাবা, কাকা, দাদারা। কিন্তু কাকিমা, বউদিদের সমর্থনে ব্যাপারটা ধোপে টিকে গেল।
ঘটনা ২: বিয়ে মানেই বেনারসি, এই ধারণাটা মেনে নিতে পারে না মৌলি। সারাক্ষণ এত ঐতিহ্য ধরে রাখার চিন্তায় মনেপ্রাণে আধুনিকার ভীষণ আপত্তি। সে চায় নিয়ম ভাঙতে। অতএব সুতোর কাজ করা একটা ওয়ালকালাম শাড়ি কিনে ফেলেছে নিজেই পছন্দ করে। শাড়ির জমি সাধারণ, পাড় আর আঁচলে মাল্টিকালার সুতো দিয়ে ভরাট কাজ। আর ব্লাউজ ডিজাইনার। সারা ব্লাউজে জমকালো বুটির কাজ। তাতেই শাড়িটা আরও খুলে যাবে। এখন বাড়ির বড়দের এই বিষয়টা বোঝাতে পারলেই কেল্লা ফতে।
বিয়ের শাড়ি বললে আজও প্রথমেই সোনালি জরির ভরাট কাজ করা ভারী বেনারসির কথাই মনে পড়ে। কিন্তু পরিবর্তন আসছে আধুনিকাদের ভাবনায়। এখনও সিংহভাগের প্রথম পছন্দ বেনারসি হলেও ব্যতিক্রমী পথেও হাঁটছেন বিবাহযোগ্য কন্যেরা। তাই বিয়ের শাড়ি হিসেবে বেনারসির পাশাপাশি উঠে আসছে কাঞ্জিভরম, ওয়ালকালাম, ইক্কত, রঙিন ডাই করা তসর বা ঢাকাইয়ের মতো শাড়িও। এছাড়া বেনারসির ক্ষেত্রেও টিস্যু, ক্রেপ ইত্যাদির চাহিদা বাড়ছে।
শাড়িতে বদল
বিয়ের শাড়িতে এখনও বেনারসিই এক নম্বর। তবু কিছু বিকল্প উঠে আসছে। তার মধ্যে প্রথম সারিতেই রয়েছে দক্ষিণ ভারতীয় সিল্ক। কাঞ্জিভরম ও পৈঠানির কদর সবচেয়ে বেশি। এছাড়াও আছে ওয়ালকালাম, বালুচরি ও জামেওয়ার। আর বেনারসিই যাঁরা কিনতে চান বিয়ের জন্য তাঁরাও একটু হালকা ওজনের শাড়ি বাছেন। সেক্ষেত্রে মাশরু কাতান ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আরও আছে টিস্যু কাঞ্জিভরম, টিস্যু বেনারসি। এগুলোতে কাজের বাহুল্য প্রচুর, কিন্তু শাড়িটা ভারী নয়। ফলে বিয়ের দিন পরতে বা বিয়ের পরেও অন্য কোনও অনুষ্ঠান বাড়িতে পরতে কষ্ট হয় না।
ঋতু অনুযায়ী শাড়ি
বিয়েতে অনেক মেয়েই ইদানীং বেনারসি পরতে চায় না। বরং তারা ঋতু অনুযায়ী বেছে নিচ্ছে বিয়ের শাড়ি। ফলে গ্রীষ্মে বিয়ে হলে অনায়াসেই কনের পরনে উঠছে লাল ঢাকাই শাড়ি। সঙ্গে থাকছে জমকালো সোনালি জরির কাজ। সেই কাজে শুধুই বুটির বাহুল্য আর একচেটিয়া নয়, তারই সঙ্গে রয়েছে সোনালি জালের কাজ, অ্যানিমাল মোটিফ ইত্যাদি। লাল ঢাকাইয়ে ফুল পাতার কাজও খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বিয়ের শাড়ি হিসেবে। এর সঙ্গে অনেকেই কম্বিনেশন ব্লাউজ বানাচ্ছেন।
শীতের বিয়ের ক্ষেত্রে আবার ভারী সিল্ক পছন্দ করছে আধুনিকার দল। ভরাট জরির কাজ করা কাঞ্জিভরম খুবই ভালো চলছে। পাশাপাশি অনেকেই তসরে ঢাকাই বুনন বেছে নিচ্ছে। শাড়িটা হালকাও হল আবার জমকালোও। বিয়ের সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত প্রচুর গয়না ও সাজগোজের ভারে চাপা পড়ে থাকতে হয় কনেকে। সেক্ষেত্রে যদি শাড়িটা অন্তত একটু হালকা গোছের হয় তাহলে সামান্য হলেও স্বস্তি পাওয়া যায়, জানালেন সদ্যবিবাহিত আনন্দী রায়। আনন্দী বিয়ের দিন সুতির শাড়ি পড়তে নারাজ ছিলেন। আবার বেনারসিও পরতে চাইছিলেন না, তখনই তাঁর চোখে পড়ে তসরে জামদানি কাজের গাঢ় মেরুন শাড়িটি। হলুদ আর সাদা সুতোয় সারা গায়ে, পাড়ে ও আঁচলে ভারী জামদানি কাজ। প্রথম দেখাতেই শাড়ির প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন আনন্দী।
নকশার নানারকম
আগে যেমন বিয়ের শাড়ি মানেই ছিল ভরাট জরির কাজ, এখন আর তেমনটা নেই। বরং রেশম সুতো, মুক্তো, স্টোনওয়ার্ক ইত্যাদির কদর বেড়েছে বিয়ের শাড়িতে। জরির ক্ষেত্রেও মিনেকারি কাজের কদর করছে এযুগের মেয়েরা। একটা সময় ছিল যখন বিয়ের শাড়িতে ফুলেল নকশা বেশি জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু এখন নানারকম নকশা এসেছে বিয়ের শাড়িতে। তার মধ্যে রানকাট কাজ খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, জানালেন শাড়িবিপণি প্রিয়গোপাল বিষয়ীর তরফে সৌমিত্র দাস। রানকাট কাজটি মাল্টিকালার জরি দিয়ে করা হয়। এক্ষেত্রে কম্বিনেশনটা মাথায় রাখতে হয়। কোন রং কী কম্বিনেশনে খুলবে সেটাও মনে রাখা দরকার। এছাড়াও শিকারগা কাজটাও খুবই জনপ্রিয় হয় উঠছে। এই ধরনের কাজে অ্যানিমাল ফিগার বোনা হয়। হাতি, ময়ূর, হরিণ ইত্যাদি শিকারগা কাজে খুবই জনপ্রিয়। আর আছে হিউম্যান ফিগার। ক্রমশ বালুচরি ছাড়িয়ে বেনারসি, কাঞ্জিভরম শাড়িতেও এই হিউম্যান ফিগার বোনা হচ্ছে। তার মধ্যে রাজপুত ঘরানার পেইন্টিংয়ের আদলে ফিগার বেশি জনপ্রিয়।
ঘন কাজ করা বর্ডার
শাড়ির পাড়ে ঘন কাজ চাইছেন আধুনিক বিয়ের কনেরা। এই চাহিদা অবশ্য বিয়ের চেয়ে রিসেপশনের শাড়ির ক্ষেত্রেই বেশি। তখন একরঙা পৈঠানি বা কাঞ্জিভরমের সঙ্গে তাঁরা বেছে নিচ্ছেন কনট্রাস্ট বর্ডারে ঘন কাজ। আড়ি কাজ, গুজরাতি স্টিচ, কাঁথাকাজ ইত্যাদি খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আড়ি কাজের সঙ্গে মুক্তো গাঁথা থাকছে। অনেকে আবার কনট্রাস্ট রঙের স্টোনও চাইছেন শাড়ির পাড় ও আঁচলে। সব মিলিয়ে লুকটা একই সঙ্গে অভিনব এবং জমকালো।
ব্লাউজে নতুনত্ব
এখন কনট্রাস্ট ও কম্বিনেশনের যুগ। সেক্ষেত্রে শাড়ির সঙ্গে মানানসই ব্লাউজের দিকেও বিশেষ নজর দিচ্ছেন কনেরা। যেমন গোলাপি শাড়ির সঙ্গে বেগুনি ব্লাউজ টিমআপ করা হচ্ছে। অথবা রিসেপশনে ঘন নীল কাঞ্জিভরমের সঙ্গে বেছে নেওয়া হচ্ছে উজ্জ্বল সবুজ বা গোলাপি ব্লাউজ। অনেকেই শাড়িটা ট্র্যাডিশনাল পরছেন, কিন্তু ব্লাউজে একটু ভিন্ন ধারার কাজ চাইছেন। যেমন মুক্তো, স্টোন সেটিং ইত্যাদি।
কমলিনী চক্রবর্তী