Bartaman Logo
২১ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

উপনিষদ

স্বামী তুরীয়ানন্দ বলিয়াছিলেন, উপনিষদের মন্ত্রধ্যানকালে তাঁহার মন্ত্রদর্শন হইত এবং মন্ত্রের প্রতিপাদ্য তত্ত্বও প্রত্যক্ষ করিতেন।

উপনিষদ
  • ২১ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্বামী তুরীয়ানন্দ বলিয়াছিলেন, উপনিষদের মন্ত্রধ্যানকালে তাঁহার মন্ত্রদর্শন হইত এবং মন্ত্রের প্রতিপাদ্য তত্ত্বও প্রত্যক্ষ করিতেন। তিনি অনুভব করিয়াছিলেন, উপনিষদের মন্ত্রাবলী জীবন্ত এবং গভীরতত্ত্বপূর্ণ। শ্রীমদ্‌ভাগবতের প্রতিও তাঁহার গভীর শ্রদ্ধা ছিল। যেরূপে তিনি উপনিষদ পাঠ করিয়াছিলেন, সেইরূপে ভাগবতও পাঠ এবং ধ্যান করিয়াছিলেন। তখন তাঁহার ভাগবতোক্ত তত্ত্বও উপলব্ধ হইয়াছিল। শাস্ত্রাদি পড়িলেও শাস্ত্রজ্ঞান তাঁহার লক্ষ্য ছিল না, তত্ত্বোপলব্ধিই ছিল তাঁহার চরম উদ্দেশ্য। সেইজন্য তিনি জগন্মাতার নিকট সজলনয়নে প্রার্থনা করিতেন যেন সকল শাস্ত্রজ্ঞান মন হইতে মুছিয়া যায় এবং তত্ত্বজ্ঞান উদিত হয়। 

Advertisement

রামকৃষ্ণ সংঘের কোন প্রাচীন সাধুকে তিনি একবার বলিয়াছিলেন, “যখন ধ্যানে বসি, তখন সকল ইন্দ্রিয়দ্বার বন্ধ করি। তাহার পরে বহির্জগতের সহিত মনের সম্বন্ধ সংছিন্ন হয়। যখন ইন্দিদ্বারসমূহ মুক্ত করি, তখনই বহির্জগতের জ্ঞান আসে।” অন্য সময় বেলুড় মঠের এক তরুণ সন্ন্যাসীকে তিনি উপদেশ দিয়াছিলেন, “মনের দ্বারে বড় বড় অক্ষরে লিখিয়া রাখ, ‘প্রবেশ নিষেধ।’ তাহা হইলে ধ্যানকালে বহির্জগৎ মনে ঢুকিয়া আর বিঘ্ন সৃষ্টি করিতে পারিবে না। তুমি বাহিরের বস্তুকে আসিতে দাও বলিয়াই তাহারা মনে ঢুকিয়া ধ্যানের বিঘ্ন সৃষ্টি করে।” হরি মহারাজ স্বামী শান্তানন্দকে বলিয়াছিলেন, “তপস্যাকালে আমি এক একটা ভাব নিয়ে পড়ে থাকতাম। ‘আমি যন্ত্র, তুমি যন্ত্রী’—এই ভাবটি কিছুদিন খুব সাধন করেছিলাম। প্রত্যেক কার্য, প্রত্যেক চিন্তায় জাগ্রত থাকতাম, আর লক্ষ্য রাখতাম ঠিক ঠিক উক্ত ভাবটি মনে আরূঢ় আছে কি না। এইরূপে কিছুদিন গেল। আবার হয়তো ‘আমিই ব্রহ্ম’—এই ভাবটি কিছুকাল অভ্যাস করলাম।”
স্বামী তুরীয়ানন্দ দুই-তিন বার উত্তরকাশীতে তপস্যা করিয়াছিলেন—প্রথমবার আমেরিকা যাইবার পূর্বে। তখন স্বামী সচ্চিদানন্দও (বুড়ো বাবা) তথায় তপস্যারত ছিলেন। বুড়ো বাবা বলিতেন, “ভোরে গান বা দুপুরে ভিক্ষার সময় প্রায়ই তাঁহাকে দেখিতে পাইতাম। একবার দেখি, তিনি তিন-চার দিন ও রাত্রি একাসনে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন, স্নানেও যান না, ভিক্ষাতেও বাহির হন না! সমাধিবান যোগী পুরুষ ব্যতীত কেহ একাসনে অনাহারে অনিদ্রায় তিন-চার দিন ও রাত্রি ধ্যানমগ্ন থাকিতে পারে না।” উত্তরকাশীতে স্বামী তুরীয়ানন্দ যে কুঠিয়াতে ছিলেন উহার পাশেই একটি শ্মশান ও জঙ্গল ছিল। ভোর রাত্রে গঙ্গাস্নান করিতে যাইয়া একদিন তিনি দেখিলেন, শ্মশানে এক অর্ধদগ্ধ শবদেহকে একটি ব্যাঘ্র খাইতেছে। ক্ষণকালের জন্য তাঁহার মনে একটু চমক বা ভীতি আসিল। পরে ভাবিলেন, ‘বাঘ মৃতদেহ খাচ্ছে তো খাক। এতে আমি বৃথা ভীত হই কেন?” এই ভাবিয়া তিনি নিঃশঙ্কচিত্তে গঙ্গার দিকে চলিয়া গেলেন। ভারতের নানা প্রদেশে ভ্রমণকালে স্বামী তুরীয়ানন্দ কতকগুলি প্রাদেশিক ভাষা আয়ত্ত করিয়াছিলেন এবং ঐ ঐ ভাষার ধর্মগ্রদগুলিও পড়িতেন। পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে তিনি গুরুমুখী ভাষা আয়ত্ত করিয়াছিলেন। গুরুমুখী শিখিয়া শিখ ধর্মশাস্ত্র ‘আদিগ্রন্থ-সাহেব’ তিনি উত্তমরূপে পড়িয়াছিলেন। তাঁহার উদার ও বিশাল মস্তিষ্ক সকল ধর্মের সারতত্ত্বসমূহে পরিপূর্ণ ছিল। তাঁহার সৎপ্রসঙ্গ নানা ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতিতে সমৃদ্ধ ও সারগর্ত হইত। গভীর অন্তর্দৃষ্টির সহায়ে প্রষ্টার মনোগত ভাব ও সন্দেহ বুঝিয়া তিনি যে উত্তর দিতেন তাহাতে শ্রোতার সংশয় অপগত হইত। জীবকোটীর মন নির্বিকল্প সমাধিলাভের পর কিরূপে মায়ারাজ্যে ফিরিয়া আসে—এই বিষয়ে শ্রীমহেন্দ্রনাথ গুপ্ত প্রভৃতি ভক্তবৃন্দ একবার ঘণ্টাধিক কাল মাথা ঘামাইতেছিলেন।
স্বামী জগদীশ্বরানন্দের ‘স্বামী তুরীয়ানন্দ’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ