মৃণালকান্তি দাস : তাঁকে হত্যার ছক কষছে ইরান! ‘ন্যাটো’র সম্মেলনে যোগ দিয়ে তুরস্ক থেকে ফেরার পথে জানিয়েছিলেন খোদ ট্রাম্প। তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা থেকে আমেরিকায় ফেরার পথে সাংবাদিকদের উদ্দেশে এই আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। মাঝ-আকাশে বিমান হামলাও ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্প। এই আশঙ্কা অমূলক ছিল না!
মার্কিন সংবাদসংস্থা ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর একটি প্রতিবেদন অনুসারে, গত মাসে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনের সময় ইরানি এজেন্টদের হাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান সম্পর্কে অত্যন্ত নির্দিষ্ট তথ্য পৌঁছে গিয়েছিল। তিনি কোন হোটেলে ছিলেন, কোন তলায়, ফাঁস হয়ে যায় যাবতীয় বিবরণ। একই সময়ে ট্রাম্পের বিমান লক্ষ্য করে হামলার সম্ভাব্য হুমকির তথ্যও পেয়েছিলেন মার্কিন গোয়েন্দারা। ইজরায়েলের দেওয়া সেই তথ্যের ভিত্তিতেই ৯ জুলাই আঙ্কারা থেকে ফেরত আসার পথে একটি বিশেষ অভিযান চালায় ইউনাইটেড স্টেটস সিক্রেট সার্ভিসের গোয়েন্দারা। ইরানিদের চোখে ধুলো দিতে বিশেষ অপারেশন চালিয়ে প্রেসিডেন্টকে উড়িয়ে আনা হয় ওয়াশিংটন ডিসিতে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবটাই ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইজরায়েলের ভয় দেখানো খেলা!
এক নিরাপত্তা অফিসার মার্কিন সংবাদসংস্থা ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-কে জানিয়েছেন, তথ্যটি ইজরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে সিআইএর বিশ্লেষকরা এই গোয়েন্দা তথ্যকে খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেননি। তাঁরা ট্রাম্প প্রশাসনের অফিসারদের কাছেও নিজেদের এই সন্দেহের কথা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছিলেন। ইরানের হামলার বিষয়ে জোরালো কোনো প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও কেন সিক্রেট সার্ভিস এভাবে ট্রাম্পকে লুকিয়ে সরাতে গেল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।
কী হয়েছিল সেদিন? ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতার থেকে উপহার হিসাবে পাওয়া নতুন ‘৭৪৭-৮’ বিমানে প্রেসিডেন্টকে নিরাপদে বের করে আনার মতো পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা আছে কি না— তা নিয়ে ব্যাপক সংশয় তৈরি হয়েছিল। তাই ট্রাম্পকে প্রথমে প্রকাশ্যে তাঁর পুরানো এয়ারফোর্স ওয়ানে ওঠানো হয়। ন্যাটো সম্মেলন থেকে বিদায় নেওয়ার আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘পুরানো দিনের স্মৃতি মনে করে’ তিনি কাতার থেকে উপহার হিসাবে পাওয়া বিলাসবহুল ৭৪৭-৮ বিমানে না চড়ে পুরানো এয়ারফোর্স ওয়ানেই ভ্রমণ করবেন। এর পরে আঙ্কারার বিমানবন্দরে ক্যামেরার সামনে তাঁকে সেই পুরানো বিমানটিতে উঠতে দেখা যায়। বিমানের দরজায় দাঁড়িয়ে ক্যামরার দিকে তাকিয়ে সংক্ষেপে হাতও নাড়েন। সেই ছবি দেখে সকলেই নিশ্চিত ছিলেন, পুরানো অভ্যাস ঝালিয়ে নিতে ট্রাম্প হয়তো পুরানো বিমানটিকে বেছে নিয়েছেন।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তিনি গোপনে সেটি থেকে নেমে যান। বিমানবন্দরের খাবার সরবরাহকারী একটি ট্রাকের (ক্যাটারিং ট্রাক) ভিতরে লুকিয়ে ভিন্ন একটি বিমানে গিয়ে ওঠেন। ‘এয়ারফোর্স সি-৩২এ’ নামে সেই বিশেষ বিমানে ট্রাম্প এবং তাঁর কয়েকজন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে নিয়ে গোপনে ব্রিটেনের উদ্দেশে উড়ে যায়। এই তৃতীয় বিমানটি ছিল বোয়িং ৭৫৭-এর একটি সামরিক সংস্করণ। তুরস্কে এই বিমানটি রানওয়েতে ৭৪৭ এয়ারফোর্স ওয়ানের ঠিক পাশেই পার্ক করা ছিল। আঙ্কারা থেকে ট্রাম্পকে ব্রিটেনের মিলডেনহল বিমানঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়ার সময় সেই বিশেষ বিমানটিকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছিল। একইসঙ্গে এয়ারফোর্স ওয়ানকে ডিকয় বা টোপ হিসাবে ব্যবহার করে তুরস্ক থেকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। গোপন অভিযানটি এমন নিখুঁত ভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের কাছে ট্রাম্প কোন বিমানে রয়েছেন, তা বোঝা দায় হয়ে পড়ে। মিলডেনহলে পৌঁছানোর পর ট্রাম্পকে গোপনে আবার কাতারের দেওয়া উপহার হিসেবে পাওয়া এয়ারফোর্স ওয়ানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে সোজা ওয়াশিংটন। গোটা অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন।
আসলে ২০২০ সালে মার্কিন হামলায় ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প এবং মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ অফিসারদের হত্যা করার ইরানি হুমকি ওয়াশিংটনের জন্য এক বড়ো উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরুর পরই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং আরও অনেক শীর্ষস্থানীয় কর্তা নিহত হওয়ার পর এই উদ্বেগ বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের সময় থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত ট্রাম্প অন্তত তিনবার মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরেছেন। তবে সেসব ঘটনার সন্দেহভাজনদের সঙ্গে ইরানের সরাসরি কোনো সংযোগের কথা এখনও পর্যন্ত জানা যায়নি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ জানিয়েছে, ইরান যে ট্রাম্পকে হত্যার জন্য টার্গেট করেছে, এই তথ্য ইজরায়েলের দেওয়া। এক বছর ধরে তারা বারবার এমনই তথ্য দিয়ে চলেছে। ২০২৫ সালের জুনে ইরানে শুরু হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধের আগে থেকেই এসব গোয়েন্দা তথ্য আসতে শুরু করে। প্রশ্ন উঠেছে, ইজরায়েলের এই গোয়েন্দা তথ্যের পিছনে কোনো ‘ভিন্ন উদ্দেশ্য’ আছে কি না! মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিওকেও ইজরায়েলের দেওয়া তথ্য এবং সিক্রেট সার্ভিসের সেই গোপন কৌশলের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়েছিল। তবে এত সব সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও তিনি পুরানো ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ বিমানেই চড়ার সিদ্ধান্ত নেন। অথচ ইরানি হামলার আশঙ্কা সত্যি হলে সেটিই হতে পারত তাদের প্রধান টার্গেট। এক মার্কিন অফিসার বলেছেন, ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনকে ঘিরে আঙ্কারায় তুরস্কের হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী নিয়োজিত ছিলেন। ফলে এমন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে ইরানের এই ধরনের হামলার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।
মার্কিন গোয়েন্দা অফিসারদের একাংশের মতে, এই তথ্য দেওয়ার মূল লক্ষ্য প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করা নয়, বরং পশ্চিম এশিয়া নিয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত এবং ওই অঞ্চলে আমেরিকার সামগ্রিক নীতিকে নিজেদের অনুকূলে প্রভাবিত করা। ‘ইরানের ট্রাম্প-হত্যার ছক’ আসলে ইজরায়েলি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের একটি চিরচেনা কৌশলের অংশ। ইজরায়েলের এই ধরনের তথ্য দেওয়ার উদ্দেশ্য, বিপদ সম্পর্কে আমেরিকাকে শুধু অবহিত করা নয়, বরং মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে নিজেদের মতো করে গড়ে তোলা। ইজরায়েল এখন ইরানকে সবচেয়ে বড়ো হুমকি মনে করলেও, তাদের মূল টার্গেট আসলে তুরস্ক।
এমন পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আঙ্কারার বাড়তে থাকা সুসম্পর্ক নিয়ে বেশ উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে ইজরায়েল। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের মধ্যে ব্যক্তিগত বোঝাপড়া এই সম্পর্ককে আরও জোরদার করেছে।
এই ঘটনাই প্রমাণ করে, ইরানের হুমকি নিয়ে গোয়েন্দা মূল্যায়নের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ইজরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে কীভাবে প্রভাব ফেলছে। সংবাদসংস্থা রয়টার্স বলছে, চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলির পর্যালোচনায় বলা হয়েছিল, ইরান সক্রিয়ভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাজ করছে না। অথচ, ইজরায়েল দাবি করছে, তেহরান ক্রমশ বিপদ হয়ে উঠেছে। মার্কিন গোয়েন্দা মহলের ওই পর্যালোচনা সত্ত্বেও ফেব্রুয়ারিতে ইরানের উপর হামলা চালানোর সিদ্ধান্তে এগিয়ে যান ট্রাম্প। এমনকি ইজরায়েলের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইদানীং ট্রাম্প বলা শুরু করেছেন, তেহরান তাঁকে হত্যার চেষ্টা করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমেরিকার কোনো সিদ্ধান্ত যখন ইজরায়েলি নীতির বিপরীতে যায়, তখনই নানা রকম আতঙ্কের তথ্য আসতে শুরু করে ওয়াশিংটনের হাতে। সম্প্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইজরায়েলকে যে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইজরায়েলের অবস্থান দুর্বল হয়েছে, তার কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বেড়েছে এবং আমেরিকার উপর তার নির্ভরতা আগের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে উঠেছে। ভ্যান্স প্রকাশ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, ইজরায়েলকে ঘিরে অন্ধ সমর্থনের যুগ শেষের পথে এবং নতুন এক বাস্তবতার দিকে এগচ্ছে দুই
দেশের সম্পর্ক, যেখানে প্রাধান্য পাবে মার্কিন স্বার্থ, আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং বদলে যাওয়া রাজনৈতিক হিসাব। বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ট্রাম্পের ইরান–চুক্তি।
কিন্তু ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বিপরীত। বহু বছর ধরে তিনি ওয়াশিংটনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, ইরানকে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল রাখতে হলে কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বজায় রাখা জরুরি। নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন, চাপ, প্রতিরোধ এবং মুখোমুখি অবস্থানই এই অঞ্চলে ভারসাম্য রক্ষার উপায়। ফলে আগামী দিনে ইজরায়েলের তরফে আমেরিকায় আতঙ্ক ছড়ানোর প্রবণতা আরও বাড়বে!
আরও নাটক দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকবে
গোটা দুনিয়া!