উদ্ভিদ জগতের কতকগুলো মৌল ধর্ম আছে যার দ্বারা সকল উদ্ভিদ পরিচালিত হচ্ছে, যার ওপর ভিত্তি করে কতকগুলো গৌণ ধর্ম আছে। জীবজগতের কতকগুলো মৌল ধর্ম আছে। কতকগুলো কেন—কয়েকটাই আছে। সেগুলোকে ভিত্তি করে গৌণ ধর্মগুলো দাঁড়িয়ে আছে। মানুষেরও এরকম মৌল ধর্ম আছে, তদাশ্রয়ী গৌণ ধর্মগুলোও আছে। কাব্য-কবিতা লেখা, সাহিত্য রচনা, ভাষণ, নাচ ইত্যাদি কত কী আছে! চাষ করা, ব্যবসা করা—সবই গৌণ ধর্ম।
মৌল ধর্ম হল মানব ধর্ম, ভাগবত ধর্ম। মৌল ধর্ম মানুষের পরিচিতি বহন করে চলেছে। মৌল ধর্ম নেই, গৌণ ধর্মের অনুশীলন চলছে। কবিতা লিখছে, ব্যবসা করছে, রাজনীতি করছে, ভাষণ দিচ্ছে, কিন্তু মৌল মানব ধর্মবর্জিত হয়ে রয়েছে সে। অর্থাৎ যেখানে ভাগবত ধর্ম নেই সেখানে হচ্ছেটা কী? না, গোড়াটাকে কেটে আগায় জল দেওয়া হচ্ছে। সে মানবের পরিচিতি বহন করছে না। সে গৌণ ধর্মগুলোকে নিয়ে কী করবে? গাছের গোড়া কেটে তাদের কাছ থেকে ফল আশা করা মুঢ়তার নামান্তর। তেমনি মানুষ যদি মৌল মানব ধর্ম বাদ দিয়ে দেয় তাহলে সে আর মানুষ নয়, তার কাছ থেকে কোন কিছুই আশা করতে পারি না। সে বাজে হয়ে গেছে।
“কৃষ্ণ ভজিবার তরে সংসারে আইনু,
মিছে মায়ায় ৰন্ধ হয়ে বৃক্ষ সম হইনু।”
তখন সে আর মানুষ নয়। মানুষের মৌল ধর্মটা ভাগবত ধর্ম যা চতুষ্পাদ। বিস্তার, রস, সেবা ও তদ্স্থিতি—এই চারটের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই শাস্ত্রে বলা হয়ে থাকে, ‘সঃ ধর্ম চতুষ্পাদঃ’। তাই ধর্ম হল চার পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা জিনিস। তাই একটা পা কমে গেলে ধর্ম খোঁড়া হয়ে যাবে, আর তাকে ধর্ম বলা চলবে না; সে খঞ্জ, সে পঙ্গু। তার আশ্রয়ে অন্যান্য মানবিক ধর্মগুলো দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। এই যে চতুষ্পাদ ধর্ম—এই ধর্মের এষণা মানুষের মধ্যে এসেছিল সুখ পাবার এষণার বিনিময়ে। মানুষ সুখ চায়, স্বস্তি চায় আর চায় শান্তি। সেই সুখ পাবার চেষ্টায় মানুষ স্থূল জাগতিক ও মানসিক দিক দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে অনুভব করল—সীমিত সুখে শান্তি নেই, “নাল্পে সুখমস্তি, ভূমৈব সুখম্”। অল্প সুখ পেলে কিছুই পায় না, অঙ্গ জিনিস পেতে পেতে ফুরিয়ে যায়। একটা ছোট সুস্বাদু জিনিস জিবে আসতে না আসতে জিবের নীচে চলে যায়। সুতরাং আর একটু থাকলে ভাল হ’ত এই ভাবনাটুকু তাকে পীড়ন করতে থাকে। আর যদি সত্যি আনন্দ পেতে হয় তাহলে এমন জিনিস পেতে হবে যার আগাগোড়া নেই, যার থেকে সুখ পেয়েই চলেছি পেয়েই চলেছি...শেষ আর হচ্ছে না। এই যে অনন্ত সুখের আধার—ইনিই হলেন পরমপুরুষ, পুরুষোত্তম, আর এঁকে পাবার জন্যে যে মানসিক সংস্থিতি, যে আনন্দের অনুভূতি সেটাই ধর্ম’।
“সুখং বাঞ্ছতি সর্বো হি তচ্চ ধর্মসমুভূতঃ।
তস্মাদ্ধর্মঃ সদাকার্যঃ সর্ববণৈঃ প্রযত্নতঃ॥”
সবাই সুখ চায়। সুখ পাবার ইচ্ছা, সুখ পাবার অভিপ্রেষণা থেকেই ধর্মবোধের উদ্ভূতি হয়েছে। বিশ্বের প্রতিটি মানুষ—তা সে বিপ্রই হোক, ক্ষত্রিয়ই হোক, ব্যবসায়ী বা কর্ষকই হোক, বুদ্ধিজীবী বা শক্তিজীবীই হোক—সর্বাবস্থায় সবাইকার উচিত ধর্মের অনুশীলন করা। এই হ’ল ধর্ম।
আর সব জীবের ধর্ম আছে, কিন্তু ভাগবত ধর্ম মানুষ ছাড়া আর কারো নেই। তাই মানুষ শ্রেষ্ঠ, কারণ মূল গুণটা ভাগবত ধর্মে, অন্য জীবের তা’ নেই। এমন দিন আসতে পারে যেদিন মূল গুণটা অন্য জীবের ভাগবত ধর্ম হলেও হতে পারে কিন্তু আজ তা’ নয়। এই ধর্ম অনুশীলন করতে হলে চাই একটা পাঞ্চভৌতিক শরীর, দরকার হচ্ছে স্নায়ুকোষ (nervecell), স্নায়ুতন্তু (nervefibre)। এই সমস্ত কিছুর সমবায়ে যে পাঞ্চভৌতিক উপাদান নিয়ে প্রপঞ্চাত্মক শরীর, এটা না থাকলে ধর্ম সাধনা হয় না।
শ্রীআনন্দমূর্ত্তির ‘কৃষ্ণতত্ত্ব ও গীতাসার’ থেকে