Bartaman Logo
১৯ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

অটো: প্রশাসনকেও ডোন্ট কেয়ার

পরিবহণমন্ত্রী থাকাকালীন সুভাষ চক্রবর্তী একবার অটো চালকদের সহবত শেখাতে গিয়েছিলেন। সে সভায় মুরগির ডাক ডেকে মন্ত্রীকে কথা থামাতে বাধ্য করেছিলেন চালকরা।

অটো: প্রশাসনকেও ডোন্ট কেয়ার
  • ১৯ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলহার মুখোপাধ্যায়: পরিবহণমন্ত্রী থাকাকালীন সুভাষ চক্রবর্তী একবার অটো চালকদের সহবত শেখাতে গিয়েছিলেন। সে সভায় মুরগির ডাক ডেকে মন্ত্রীকে কথা থামাতে বাধ্য করেছিলেন চালকরা। তোলপাড় পড়ে গিয়েছিল রাজ্যে। কিন্তু কিছুই করতে পারেনি বাম সরকার। ঢোঁক গিলে নিয়েছিলেন মন্ত্রীও। ঘটনার কিছুদিন পর সুভাষবাবুর কাছে একান্তে প্রতিক্রিয়া চাওয়া হয়েছিল। তিনি কাষ্ঠহাসি হেসে বলেছিলেন, ‘আসলে অটো চালকরা সবাই তরুণ, তরতাজা তো, একটু আধটু ঔদ্ধত্য ওই বয়সে সবাই দেখিয়ে থাকে।’ 

Advertisement

সীমাহীন ঔদ্ধত্য আর প্রশাসনকে ডোন্ট কেয়ার করার সাহস অটো চালকদের অধিকাংশ বাম সময় থেকেই মজ্জাগত করে নিয়েছিলেন। সুভাষ চক্রবর্তী গত হয়েছেন। সিপিএম সরকার চলে গিয়েছে। তারপর তৃণমূল এসেছে, চলেও গিয়েছে। এখন রাজ্যে বিজেপি। এই তিন আমলেই অটো নিজের মহিমা বিন্দুমাত্র খাটো করেনি। উলটে ডোন্ট কেয়ার ভাব আরও বেড়েছে। যে চালকরা একজন মন্ত্রীকে বিদঘুটে ডাক ডেকে থামিয়ে দিতে পারেন, তাঁরা সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করবেন তা সহজেই অনুমেয়।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা অটো ইউনিয়নগুলি বাস্তবিকই ধরাকে সরা জ্ঞান করে। ফলে যাত্রী তো ছাড় পুলিশকে পর্যন্ত তোয়াক্কা করেন না অধিকাংশ চালক। বচসা হলে অনেক সময় যাত্রীদের দু’ঘা কষিয়ে দিতেও দ্বিধা করেন না। তাঁরা বিলক্ষণ জানেন, পাড়ার নেতা পাশে আছেন, ‘তিনি সব সালটে নেবেন।’ 
মারধরের খবর বেশিরভাগ সময়ই প্রকাশ্যে আসে না। যদি আসে তখন একপ্রকার বাধ্য হয়ে একটু নড়াচড়া করে প্রশাসন। তারপর ফের যে কে সেই। দুর্বিনীত চালকদের কোনোদিন বড়ো মাপের শাস্তি হয়েছে এমনটা শোনা যায় না। ইউনিয়ন-স্থানীয় নেতা আর পুলিশের মধ্যস্থতায় মিটমাট করতে বাধ্য হন অত্যাচারিত যাত্রী। এই শ্রেণির অটো চালকদের বিরুদ্ধে সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগগুলি একত্র করলে তালিকা এত দীর্ঘ হয় যে, পড়ে শেষ করা যায় না।
যে কোনো নিত্যযাত্রীকে প্রশ্ন করলে যে অভিযোগগুলি সর্বাগ্রে উঠে আসে সেগুলি হল, ১, যখন তখন কাউকে না জানিয়ে রুটের ভাড়া বাড়িয়ে দেয় ইউনিয়ন। কার সঙ্গে আলোচনা করে ভাড়া বৃদ্ধি করা হয় তা কেউ জানে না। রাজ্যের পরিবহণ বিভাগ এ সংক্রান্ত অনুমতিপত্র দেয় কি না, জানা যায় না। পুলিশ ভাড়া সম্পর্কে সরকারিভাবে কিছু জানে কি না, সেটাও জানা যায় না। বাসের মতো ভাড়ার কোনো তালিকা অটোয় থাকে না। ফলে সে ভাড়া সরকার স্বীকৃত কি না তা নিয়ে আজন্মকাল ধরে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। তাহলে অটোর ভাড়া ঠিক করে কোন পক্ষ? জানার বস্তুত কোনো উপায়ই নেই। এর পাশাপাশি অভিযোগ, যে কোনো উৎসবে স্বল্পকালীন মেয়াদে বাড়ানো হয় ভাড়া। দুর্গাপুজোর সময় তা প্রায় মাত্রাছাড়া চেহারা নেয়। উল্টোডাঙা থেকে জোড়াবাগান রুটে নিত্যদিন যাতায়াত করেন এমন এক যাত্রী বলেন, ‘পুজোর সময় এক ধাক্কায় ভাড়া প্রায় ডবল করে দেয়। গোটা বর্ষাকালটা বেশি ভাড়া নেয়।’ এই রুট তো শুধু নয়, কলকাতা, শহরতলি, জেলা সদর সর্বত্র একই চিত্র। যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিতে একটু গাঁইগুঁই করলেই জোটে দুর্ব্যবহার। 
অভিযোগ ২, (চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো বিষয়) শহরে এবং শহরতলির রাস্তায় চলা অনেক অটোর নাকি বৈধ পারমিটই নেই! এমনকি বেশ কিছু অটো আছে যার নম্বর প্লেট পর্যন্ত ভুয়ো। সল্টলেকে যেমন চোখ কান একটু খোলা রাখলে দেখা যায়, একই নম্বর প্লেট ব্যবহার করে দু’টি আলাদা অটো। এক যাত্রীর বক্তব্য খুব ইন্টারেস্টিং। তিনি উল্টোডাঙা থেকে উঠে করুণায়মী নেমেছেন। চালক দ্বিগুণ টাকা ভাড়া চান। যাত্রী পুলিশে অভিযোগ জানাবেন বলে মৃদু্ হুমকি দেন। তা শোনার পর অটো চালক হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘যা খুশি করুন। আমার কোনো রুট নেই। পারমিটও নেই। জীবনে পুলিশ ধরতে পারবে না।’ কথা কাটাকাটি চলাকালীন চালক বলেছিলেন, ‘ভাড়াটা দিন, না হলে পায়ের উপরে চাকা তুলে দেব।’ ই ই ব্লকের বাসিন্দা ওই যাত্রী ভয়ে পুলিশে যাওয়ার সাহস দেখাননি। বলেছেন, ‘পরিবার নিয়ে বাস করি। আমার কিছু হয়ে গেলে স্ত্রী ও মেয়ের কী হবে।’ 
অভিযোগ ৩, গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলিতে বেশিরভাগ সময় পুরো রাস্তা চলে না অটো। অর্ধেক রাস্তা যায়। আর ভাড়া নেয় গোটা রুটের। তারপর বাকি পথটুকু অন্য অটোতে উঠতে বাধ্য হন যাত্রীরা। সেখানেও ভাড়া দিতে হয়। ফলে খরচ দ্বিগুণ। অফিস টাইমে এই দৌরাত্ম্য ভয়ানক আকারে দেখা দেয়। বেহালায় সম্প্রতি এই নিয়ে অশান্তি হয়েছে। 
অভিযোগ ৪, বেশি যাত্রী তোলা। শহরতলিতে সাধারণত পাঁচজন যাত্রী ছাড়া কোনো অটোই চলে না। বেশিরভাগ রুটে ছ’জন যাত্রী নিয়ে চলাচল করে। কলকাতা শহরে পুলিশের নজরদারি একটু কড়া। তবে তাদের নজরের বাইরে গেলেই পাঁচ বা ছ’জন জন যাত্রী তুলে নেন চালক। ফলে সামনের আসনের যাত্রীকে প্রায় ঝুলতে ঝুলতে যেতে হয়। পাশ দিয়ে গাড়ি গেলে ধাক্কা লেগে হাঁটু ভাঙার সমূহ আশঙ্কা। উত্তর ও দক্ষিণ শহরতলিতে এই সমস্যা সবথেকে বেশি। উত্তরের বেলঘরিয়া, সোদপুর, কামারহাটি, দমদম ইত্যাদি এলাকা, উত্তর-পূর্ব কলকাতার সল্টলেক, নিউটাউন, বাগুইআটি, এয়ারপোর্ট, চিনার পার্ক, রাজারহাট ইত্যাদি, দক্ষিণে বেহালা, বারুইপুর  ইত্যাদি অঞ্চলে এ সমস্যা ভয়ানক প্রকট। আবার এয়ারপোর্ট ছাড়িয়ে বারাসত এবং দূরের এলাকাতে তা আরও গভীর। যাত্রীদের অভিযোগ, পুলিশে অভিযোগ জানিয়ে কোনো লাভই হয় না। প্রশাসনের সবকটি স্তর কার্যত চোখে কুলুপ এঁটে রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ শহরতলির বজবজ থেকে গড়িয়া, সোনারপুর থেকে মেটিয়াবুরুজ এ চিত্র কোনোদিনই বদলায় না। একেক সময় সব সীমা ছাড়িয়ে বজবজ বা মেটিয়াবুরুজে সাতজন পর্যন্ত যাত্রী তুলে ফেলেন কোনো চালক। 
অভিযোগ ৫, ট্রাফিক আইনকে তুচ্ছ ও হেয়জ্ঞান করা। শহরতলি বা গ্রামেগঞ্জে তো বটেই, খাস কলকাতাতেও আইনের তোয়াক্কা করেন না অধিকাংশ অটোচালক। সবসময়ই যাত্রী তোলার রেষারেষিতে দ্রুতগতিতে দৌড়ান। ফলে নিয়মিত দুর্ঘটনার খবর আসে। তবে বেয়াদপ অটো চালকদের শায়েস্তা করার কোনো কড়া পদক্ষেপের কথা কানে আসে না। শাস্তি দিতে গেলেই পথ অবরোধ, বিক্ষোভ, ভাঙচুর ইত্যাদি হয়। প্রশাসনকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে ইউনিয়ন। ফলে খানিক সমঝেই চলতে হয় পুলিশকে। 
অভিযোগ ৬, মহিলা যাত্রীদের সঙ্গে অভ্যবতা। অশালীন ইঙ্গিত ছুড়ে দেওয়া। এমনকি কখনো কখনো শ্লীলতাহানির মতো অভিযোগও ওঠে। অভিযোগ ৭, যাত্রী নিতে অস্বীকার। কোনো যাত্রীর চেহারা একটু ভারী হলে তাঁকে অটোয় তুলতে অস্বীকার করেন অনেক চালক। এমনকি বড়ো ব্যাগ থাকলেও নিতে রাজি হন না। অভিযোগ ৮, তারস্বরে গান। সে শব্দ এতটাই জোরালো যে, প্রবীণ যাত্রীদের কেউ কেউ অসুস্থ বোধ করেন। অনেকে প্রয়োজনের ফোন পর্যন্ত ধরতে পারেন না। অভিযোগ ৯,  অটো স্ট্যান্ডের সামনে বাস বা অন্য যাত্রীবাহী যান গায়ের জোরে দাঁড়াতে দেন না বহু চালক। ‘বর্তমান’ সংবাদপত্রেই প্রকাশিত হয়েছিল জুলুম সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন। সে খবরে লেখা হয়েছিল, রাতের দিকে উল্টোডাঙায় ভিআইপি রোডে ওঠার মুখে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে অটো। বাস, ট্যাক্সি, অ্যাপ নির্ভর বাইক বা ক্যাবকে সেখান থেকে যাত্রী তুলতে দেয় না তারা। ফলে মানুষকে বাধ্য হয়ে অটোয় উঠে বেশি ভাড়া দিয়ে যেতে হয়। এই খবর প্রকাশের পর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে কিছুদিন দৌরাত্ম্য বন্ধ রেখেছিলেন সেই চালকরা। তবে কয়েকদিন যেতে না যেতেই সেই একই অবস্থা। 
এমন নয় যে, এসব অভিযোগ আড়াল আবডাল থেকে ভেসে আসে। অভিযোগের ঝুলি নিয়ে পুলিশের কাছে যায় সাধারণ মানুষ। লাগাতার উষ্মামিশ্রিত সমালোচনা চলে নাগরিক মহলে। আর মজার বিষয়, এই সব অভিযোগ সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল অটো চালকরা। তাঁরা শুনে ব্যঙ্গের হাসি হাসেন। ফুৎকারে অভিযোগ উড়িয়েও দেন। চোরা কোনোদিনই ধর্মের কাহিনি শোনে না।
প্রশাসনিক হেলদোল বিশেষ না থাকলে সমাজে বিষবৃক্ষ মাথাচাড়া দেয়। খোঁজ নিলে জানা যায়, একবার কেস খাওয়ার পর অধিকাংশ অটোর কাগজপত্র পুলিশের কাছে জমা পড়ে থাকে। আর গাড়ির রুট পারমিট থেকে লাইসেন্স সহ যাবতীয় নথিপত্র কালার জেরক্স (ফটো কপি) করে দিনের পর দিন রাস্তায় দৌড়ায় অটো। কাগজ না থাকায় মামলা করা সম্ভব হয় না পুলিশের পক্ষে। আর সবাই সব জেনেও বন্ধ করে থাকে চোখ।
সাধারণ মানুষের দাবি, সমস্ত অটো রুটের বিস্তারিত তথ্য পুলিশ একত্র করুক। ভাড়া, রুটের দূরত্ব ইত্যাদি সব তথ্য পুলিশের পক্ষ থেকে নাগরিকদের জন্য প্রচার করা হোক। বছর খানেক আগে অটো সংক্রান্ত কয়েকটি পরিকল্পনা করেছিল সরকার। উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠনের পরিকল্পনা হয়েছিল। শোনা গিয়েছিল, অনধিক ৪৮৯ অটো রুটের বিস্তারিত তথ্য একত্র করে পর্যালোচনা হবে। তা কবে হবে কেউ জানে না। এ রাজ্যের নাগরিকরা ঘর পোড়া গোরু। না আঁচালে কিছু বিশ্বাসে তীব্র আপত্তি থাকাটাই তাদের স্বাভাবিক।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ