বিশ্বজিৎ দাস: ক’দিন আগেই দেশের সেরা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান দিল্লি এইমস থেকে ডিএম পাশ করে সদ্য রাজ্য সরকারের কাজে নিযুক্ত এক তরুণ শিক্ষক চিকিৎসক দেখা করতে এলেন। অল্প সময়ের আলাপ। কিন্তু হৃদয়ের গভীরতায় অনেকটা। তিরিশের কোটার ওই মেধাবী সোজাসাপ্টা বললেন, ‘কোনো এক্সপেরিমেন্ট নয়। এখানে ওখানে ঘোরাঘুরি, সময় নষ্ট নয়। চাকরি পেয়েছি। সোজা জয়েন করেছি। বাজারের অবস্থা খুব খারাপ দাদা। হাজারে হাজারে ডাক্তার পাশ করে বেরচ্ছে। এত ডাক্তার, খাবে কী?’
কিছুদিন আগে সংঘমনস্ক এক প্রভাবশালী চিকিৎসক সরকারের গুণ গাইতে গিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ডাক্তার নিয়োগের খতিয়ান পেশ করেন। সেই হিসাবের দিকে একটু তাকানো যাক। হিসাব বলছে, ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ক্ষমতায় আসার সময় দেশে মোট মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ছিল ৩৮৭টি। সরকারি ১৪৫টি। প্রাইভেট ২৪২টি। মোট মেডিকেল কলেজের মধ্যে সরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা তখন ছিল ৩৫ শতাংশ। আর মোট এমবিবিএস আসনের সংখ্যা ছিল ৫১ হাজার ৩৩৮। কীভাবে ভাজপা সরকারের সর্বব্যাপী ‘বিকাশ’ মেডিকেল কলেজের সংখ্যা এবং এমবিবিএস আসনবৃদ্ধিতে অভাবনীয় ভূমিকা রেখেছে, তা প্রমাণ করতে ঠিক পাশাপাশি তুলে ধরা হয় এখন কত কলেজ, কত আসন, তার মধ্যে সরকারি মেডিকেল কলেজ কত শতাংশ ইত্যাদি। সেই বন্ধুপ্রতিম চিকিৎসকের তুলে ধরা হিসাব বলছে, (সরকারিভাবেও হিসাবটি সত্যি) ২০২৬ সালে দেশের মোট মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৮২৩। সরকারি মেডিকেল কলেজ ৪৪১টি। প্রাইভেট ৩৮২। মোট মেডিকেল কলেজগুলির মধ্যে সরকারি মেডিকেল কলেজের শতাংশ ৫৩। আর মোট এমবিবিএস আসন? ১ লক্ষ ৩৬ হাজার ৯৩৯। সরকারি আসন ৬৩ হাজার ২৯৬। প্রাইভেট আসন ৭৩ হাজার ৬৪৩। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ছবিসহ সেই হিসাবে গর্বের সঙ্গে বলা হয়েছে, দেশে গত ১২ বছরে এমবিবিএস আসন বেড়েছে ১৬৬ শতাংশ! হিসাব করা যাক—সাড়ে ৮৫ হাজারেরও বেশি (৮৫ হাজার ৫৯১)!
বন্ধু মানুষ। অপ্রিয় সত্যি মুখোমুখি বললে হয়তো খারাপ লাগবে। কিন্তু সহজ সোজা প্রশ্নটা হল, ডাক্তার এবং এমবিবিএস আসনের সংখ্যা হুড়মুড় করে বাড়িয়ে লাভের লাভ খুব বেশি কিছু কি হচ্ছে?
প্রতি পাঁচ বছরে প্রায় সাত লক্ষ (৬ লক্ষ ৮৩ হাজার ১৯৫ জন) এমবিবিএস চিকিৎসক পাশ করে বেরচ্ছেন! খেয়াল রাখতে হবে, এই হিসাব শুধু মডার্ন মেডিসিন বা অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসকদের। হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদ, ডেন্টালের হিসাব ধরলে আরও প্রায় এক লক্ষ স্নাতক ডাক্তারি আসন আছে। মানে প্রতি পাঁচ বছরে আরও প্রায় পাঁচ লক্ষ আয়ুষ এবং ডেন্টাল চিকিৎসক পাশ করে বেরচ্ছেন। মানে প্রতি পাঁচ বছরে দেশে তৈরি হচ্ছে প্রায় ১২ লক্ষ চিকিৎসক
(সেটাও যদি আগামী পাঁচ বছর কোনো মেডিকেল কলেজ বা ডাক্তারি আসন না বাড়ে, যা অসম্ভব!)। বাড়লে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সংখ্যাটি ঈশ্বরই জানেন!
দেখা যাক রাজ্যের অবস্থা। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মোট এমবিবিএস সিটের সংখ্যা ছিল ১২০৫। ২০২৬ সালে তৃণমূল সরকার পতনের সময় মোট আসন ছিল ৬৪৯৯। আর এখন? প্রায় ৭৫০০। আগামী তিন চার বছরে কমপক্ষে আরও ১০০০ আসন বাড়বে। কারণ আরও পাঁচটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হচ্ছে। উত্তরবঙ্গে এইমস হচ্ছে। অন্তত দুই থেকে তিনটে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ হবে। মানে আনুমানিক সাড়ে আট হাজার আসন। ফলে প্রতি ৫ বছরে আরও আনুমানিক ৪২ হাজারের বেশি অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার যুক্ত হবেন। আয়ুষ আসন যোগ করলে তা আরও বাড়বে। আসন বাড়তে বাড়তে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর যা হাল হয়েছে, একই পরিণতি ডাক্তারিতে হবে না তো? সিনিয়র চিকিৎসকরাই বলছেন, কোনো সংশয় বা দ্বন্দ্ব নয়, এই হওয়াটা প্রায় অবশ্যম্ভাবী। যদি না এখনই পপুলিস্ট পলিটিক্সের জাঁতাকল থেকে বেরিয়ে আসে ডবল ইঞ্জিন সরকার! হোয়াইট কলার প্রফেশনের কৌলীন্য, বিক্রম, গাড়ি-বাড়ি, ফার্ম হাউস, বাগানবাড়ি, দম্ভ, উঁচু নাক এবং ঘনঘন বিদেশ ভ্রমণের স্বপ্ন বেসামাল হয়ে নড়বড় করবে তাসের ঘরের মতো। ১-২ শতাংশ চিকিৎসক বাদে বাকিদের ক্ষেত্রে তা নড়বড় করা শুরুও করেছে।
অনেকের মধ্যে প্রশ্ন জাগছে, ডাক্তারি আসন এবং মেডিকেল কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি কি ক্ষতিকর? এর সঙ্গে অর্থনীতি জড়িয়ে। চাকরিবাকরি জড়িয়ে। একটি মেডিকেল কলেজ মানে সঙ্গে একটি নার্সিং কলেজ হবে, প্যারামেডিকেল কলেজ হবে, খাবারের দোকান, ক্যান্টিন, হোটেল, ডায়াগনস্টিক ল্যাব, ওষুধের দোকান—হাজারো মানুষের রুজি-রুটি নির্ভর করে। কর্মসংস্থান বাড়ে। আর ডাক্তারির মতো পেশা আজও সম্মানের, আজও প্রতিষ্ঠার—তাই তো বছর বছর কুড়ি লক্ষের বেশি ছাত্রছাত্রী দেশের সর্ববৃহৎ প্রবেশিকা পরীক্ষা নিটে বসছেন।
তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা হল, এত ডাক্তার খাবেন কী? তাঁরা চাকরি পাবেন? যদি চাকরি না করেন বা না পান, প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে সম্মানের সঙ্গে থাকতে পারবেন তো? কংগ্রেস, বিজেপি, তৃণমূল, বাম, সরকারে যেই থেকেছে, তার কাছে কত ডাক্তারি আসন বাড়ল, কত মেডিকেল কলেজ বাড়ল, বরাবরই শ্লাঘার বিষয় হয়ে এসেছে। আত্মপ্রচারের এবং সরকার কত আদর্শ, তা প্রমাণের সূচক হয়ে এসেছে। আমরাও সেই প্রচারে ভুলেছি, সূচকে সম্মোহিত হয়েছি। শুধু যাঁদের নিয়ে সূচক, তাঁরা যখন আজ কাজের বাজারে নামছেন, বুঝছেন, চাল ঠিক কত ধানের!
আরও দু-তিনটে পরিসংখ্যানে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়ে যাবে। বর্তমানে দেশের আনুমানিক জনসংখ্যা ১৪০ কোটি। দশ বছর আগেও বিদগ্ধ মানুষজনের স্বাস্থ্য নিয়ে সভা সম্মেলন, কর্মশালায় একবার না একবার কেউ না কেউ বলে উঠতেনই, ‘এমনই পোড়া দেশে আমাদের বাস, এখানে প্রতি এক হাজার জনসংখ্যায় একজনও ডাক্তার নেই! অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রতিটি সভ্য দেশে প্রতি হাজার জনসংখ্যায় একজন চিকিৎসকের থাকা উচিত।’
সেই গালভরা পুরানো কাসুন্দি এখন আর কেউ বলবার সাহসও করবেন না। কারণ আজকের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি হাজার জনসংখ্যায় একজন চিকিৎসকের লক্ষ্যমাত্রা শুধু যে আমরা অর্জন করেছি, তাই নয়, ধীরে ধীরে আদর্শ জনসংখ্যা পিছু অতি-চিকিৎসকের দিকে এগচ্ছে দেশ। বর্তমানে দেশে ৭৭৮ থেকে ৮০০ মানুষ পিছু রয়েছেন একজন চিকিৎসক। তাই পলিসি মেকারদেরও ভাবতে হবে, হুড়মুড়িয়ে মেডিকেল কলেজ করলাম, ডাক্তারি আসন বাড়ালাম, কিন্তু তারপর? বেকারত্বের মহাসাগরে আরও বালতি বালতি জল ঢালছি না তো? ডাক্তারদের রুজি-রুটির ব্যবস্থা করতে পারব তো? ভালো করতে গিয়ে উলটে গুছিয়ে গাল খাব না তো?
ভারতবর্ষের প্রস্তাবিত জনসংখ্যা ২০৩০ সালে হতে চলেছে প্রায় দেড়শ কোটি। এদিকে আগামী চার বছরে দেশে যুক্ত হতে চলেছেন প্রতিবছর কমপক্ষে ২.৪ লক্ষ ধরলে আরও প্রায় ১০ লক্ষ চিকিৎসক! বর্তমানে রয়েছেন প্রায় ১১ লক্ষ অ্যাক্টিভ অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক এবং সাড়ে ৭ লক্ষ অ্যাকটিভ আয়ুষ চিকিৎসক। মানে সাড়ে ১৮ লক্ষ প্রায়। ২০৩০ সালে দেশের মোট ডাক্তারের সংখ্যা সেই হিসেবে বেড়ে হবে প্রায় ২৮ লক্ষ। মানে তখন প্রতি ৫০০ জনে থাকবেন একজন চিকিৎসক। কিন্তু বাস্তবে অবস্থাটা হবে আরও খারাপ। কারণ প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরিষেবার বুনিয়াদি জায়গাগুলিতে আর ডাক্তারই থাকবেন না। এখন যেমন উপ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দিরগুলি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিচালনা করছেন প্রশিক্ষিত নার্সরা। সরকারি ভাষায় যাঁদের নাম ‘কমিউনিটি হেলথ অফিসার’ বা সিএইচও। আগামী চার-পাঁচ বছরে সেই সংখ্যা আরো বাড়বে। তখন? চাকরি মানেই তো ডিম্যান্ড-সাপ্লাই। তা সে সরকারি হোক বা বেসরকারি। ব্যাপকভাবে চাহিদাই যদি তৈরি না হয়, জোগানেরও প্রশ্ন আসবে না। তাই আসল কথা হল, কত ডাক্তার তৈরি করছি, তা নয়, আগামী ১০ বছরে সমাজের একটি প্রতিষ্ঠিত পেশাকে বেকারত্ব এবং টেনশনে টেনশনে অস্থির জনগোষ্ঠীতে পরিণত করছি না তো?
শহরের একটি নামকরা মেডিকেল কলেজের প্রধান বলছিলেন, ক’দিন আগে আমাদের এক শিক্ষক চিকিৎসক অত্যন্ত লজ্জিতভাবে বললেন, ‘স্যার, মিথ্যা বলব না মুর্শিদাবাদে বাড়ির কাছে একদিন প্র্যাকটিস করি। কিছুদিন আগে গিয়ে দেখি, ডাক্তারদের নেমপ্লেটে আমার পাশেই আমার সিনিয়র রেসিডেন্টের নাম! আমার তো মাথা কাটা যায়! আর ওখানে কী করে প্র্যাকটিস করব?’ সর্বোচ্চ ডিএম-এমসিএইচ ডিগ্রি অর্জন করা অসংখ্য তরুণ চিকিৎসক পর্যন্ত জানালেন, তাঁরা এখন রুজি-রুটির টানে প্র্যাকটিস জমাতে পাড়ি দিচ্ছেন শহরতলি এমনকি গ্রামীণ এলাকায়ও। আগে যেখানে সপ্তাহে সপ্তাহে যাওয়ার কথা তাঁরা স্বপ্নেও ভাবতেন না।
পরিস্থিতি কীভাবে দ্রুত পালটাচ্ছে, বোঝাতে আরও দুটি তথ্য দিই। এ বছর গোড়ার খবর। জেনারেল ডিউটি মেডিকেল অফিসার পদে স্বাস্থ্যদপ্তরে শূন্যপদ ছিল ১২২৭টি। কয়েক বছর আগে যা পদ, সেই পরিমাণ আবেদনই জমা পড়ত না। আর ওই সাম্প্রতিক নিয়োগে আবেদনই জমা পড়ছিল ৭ গুণ বেশি।
এমডি-এমএস, ডিএম-এমসিএইচদের ভিড়ে তাহলে কী অবস্থা হতে পারে শুধু এমবিবিএস পাশ করলে? রাজ্যের সমস্ত মেডিকেল কলেজ হাউসস্টাফশিপের পদ কাতারে কাতারে ফাঁকা থাকত বছর কয়েক আগেও। এখন? যা ভ্যাকেন্সি, তার কয়েকগুণ বেশি আবেদন জমা পড়ছে। কিন্তু কেন? যতদিন হাউসস্টাফশিপ, ওই ক’ মাস প্রায় ৬২ হাজার টাকা করে তো পাবে। বাইরে ওই টাকা রোজগার করতে এখন যে কালঘাম ছুটছে! বললেন এক অধ্যক্ষই।
আর নিটে দু-তিন লক্ষ থেকে ১০-১২ লক্ষ র্যাঙ্ক করে ‘কোয়ালিফাই’ বা ‘উত্তীর্ণ হওয়া’ এবং তারপর প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকা খরচ করে এমবিবিএস পড়াদের ভবিষ্যতে কী হবে, তা নিয়ে হবে আরেকদিন আলোচনা । সে আর এক মহাভারত!