শান্তনু দত্তগুপ্ত: কঙ্গনা রানাওয়াত সমাজ মাধ্যমে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করেছেন। ভীষণ আনন্দে ভারতের জাতীয় পতাকা দুলিয়ে দুলিয়ে তিনি দেশের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছেন। সে করুন, আপত্তি নেই। কিন্তু তিনিই তো বলতেন... এই ‘আজাদি ফেক’। ভিক্ষায় পাওয়া। ভারত স্বাধীন হয়েছে ২০১৪ সালে। তাহলে কঙ্গনাদেবী ১৫ আগস্ট কেন স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করলেন? তাঁর স্বাধীনতা দিবস হওয়া উচিত ছিল ২৬ মে। কারণ, ওইদিনই নরেন্দ্র মোদি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছিলেন। কোন অধিকারে তিনি আম জনতার স্বাধীনতা দিবসে পতাকা দোলালেন?
অধিকার নেই ওই নিন্দুকদেরও। কোন সাহসে তাঁরা স্বয়ং মোদিজির সমালোচনা করছেন? উনি প্রধানমন্ত্রী। শিক্ষিত সমাজকে ‘দিমাগি নকশাল’ বলে যতই তোপ দাগুন না কেন, মানসিকতায় তো কোনো গলদ ছিল না! ওটাই আসল। খামোকা বিরোধিতা করবে কেন? সরকারের ভালোটা কি এরা দেখতেই পায় না? ওঁর বক্তব্য নিয়ে, ফ্যাশন নিয়ে সব সময় টানাহেঁচড়া। গণ্ডগোল যদি কেউ করেই থাকে, তাহলে সেটা স্ক্রিপ্ট রাইটার। সেটা তো আর মোদিজির দোষ নয়! ফ্যাশন নিয়ে তো কথাই হবে না। লালকেল্লায় ভাষণের সময় বুকে রাখা তেরঙ্গা নিয়ে কতই না নিন্দামন্দ চলছে। ওটা নাকি আয়ারল্যান্ডের পতাকা। আরে বাবা ফ্যাক্ট চেকাররা সব নিয়মনীতির বই খুলে দেখিয়ে দিয়েছেন, ভার্টিকালি রাখলে দর্শকের দিক থেকে গেরুয়া রং ডানদিকেই থাকবে। নিন্দুকরা আজ যাঁরা হাঁইহাঁই করছেন, তাঁরাও সেটা জানেন। বিলক্ষণ বোঝেন, মোদিজি পকেটে ভারতীয় কায়দাই রাখতে চেয়েছিলেন। বুঝতে তো সবাই পারছেন। তাহলে এত গেল গেল রব কেন? কবে আর এমন মহান স্তরের রাষ্ট্রনেতার আবেগ, অনুভব, মানসিকতাটা বুঝবেন তাঁরা? এটা কি অধিকার লঙ্ঘন নয়? সারাক্ষণ ‘জেন-জি’... ‘জেন-জি’ করে গেলেই হবে? গত ১২ বছরে এই সরকার আমাদের জন্য কত কী-ই না করেছে। সেগুলো আমরা ভুলে যাই। সেই কারণেই তো প্রতিবার ভাষণে মোদিজিকে মনে করিয়ে দিতে হয়। হ্যাঁ, ওষুধ খেলে তার কিছু সাইড এফেক্ট থাকেই। সেটা মানিয়ে নিতে হবে। দেশের স্বার্থে। সমাজের স্বার্থে। বিজেপির স্বার্থে। শিক্ষার জন্য অবদান তাঁর অনস্বীকার্য। এই যে প্রতি মাসে ‘মন কি বাত’ হয়... পড়ুয়ারা কত কী না শিখতে পারে। ‘পরীক্ষা পে চর্চা’ শুনে ছেলেমেয়েরা তো আপ্লুত। সেসব নিয়ে আলোচনা নেই। বরং গত ১০ বছরে প্রায় এক লক্ষ সরকারি স্কুল দেশজুড়ে বন্ধ হয়েছে কি হয়নি, তা নিয়ে গলা ফাটিয়ে যাচ্ছে। যন্তর মন্তরের পর এখন নতুন হিড়িক উঠেছে, ‘জেন আলফা আন্দোলন’। স্কুলের ছেলেমেয়েরা রাস্তায় নেমে আসছে। অবস্থান করছে। পরিকাঠামো ঠিক করার জন্য দাবি তুলছে। আরশোলা পার্টিও তাতে সায় দিচ্ছে। এ যেন নতুন পর্ব। ওই যে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার পর বলেছিল, ‘আঙ্কল দেখা হবে নেক্সট ইস্যুতে।’ এটাই যেন সেই ইস্যু। লোকজন এতে আবার সমর্থনও জোগাচ্ছে। এটা কোনো বিষয় হল?
হচ্ছে না হয় প্রতিবাদ। হচ্ছে বিক্ষোভ। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশে। সব ডবল ইঞ্জিন! সে তো হতেই পারে। বিজেপি এখন গোটা দেশের গৈরিকীকরণ প্রায় সেরে এনেছে। সেখানে ডবল ইঞ্জিনের নামে অকথা-কুকথা বলার সুযোগ যে বাড়বে, তাতে সন্দেহ কী? তা বলে ছোটোখাটো মাধ্যমগুলি ভুলভাল সব ভিডিয়ো পোস্ট করবে! স্কুলে ঢুকে মাইক্রোফোন ধরছে অঙ্কের শিক্ষকের সামনে। বলছে, দেড় লক্ষ টাকা বেতন আপনাদের। একটু বলুন না, তিন-পনেরো কত হয়? শিক্ষক মহাশয় বলছেন, ‘এখন ডিসপ্রেশনে আছি। কিচ্ছু বলব না। দিন পনেরো পর আসুন।’ বুমধারী কী বলছেন? ‘কথাটা ডিসপ্রেশন নয়, ডিপ্রেশন।’ তিনি না হয় একটু ভুল বলে ফেলেছেন... অঙ্কের মাস্টারমশাই একটা ইংরেজি শব্দ কম জানতে পারেন... তা বলে এরকম হেনস্তা? আর একটি ডবল ইঞ্জিন গ্রামের আবাসিক স্কুলের দৃশ্য সামনে আসছে। পানীয় জলের ট্যাঙ্কে সেখানে ভাসছে মরা পাখি। শ্যাওলার আস্তরণ সর্বত্র। সেই জলই শিশুরা খাচ্ছে। অসুস্থও হচ্ছে। ফ্যান খারাপ হয়ে গেলেও সারাতে তিন-চার মাস। আর জেলা প্রশাসনে অভিযোগ করলে? নাম কাটা যাচ্ছে সেই পড়ুয়াদের। এ নিয়েও প্রতিবাদ করতে হবে? এই তো বয়স। দেশের স্বার্থে একটু মানিয়ে বুঝিয়ে নিতে পারছে না জেন আলফা? এটুকু ভক্তি তো হেডস্যার-স্যারদের প্রতি থাকবে? নাকি চলল কমপ্লেন করতে! এখন ভক্তি না দেখালে ভবিষ্যতে অন্ধভক্ত হবে কীভাবে? সাহস পাচ্ছে কীভাবে এই পড়ুয়ারা? কে উসকানি দিচ্ছে? খুঁজে নিশ্চয়ই বের করবে শাসককুল। তাই তো প্রধানমন্ত্রী লালকেল্লার ভাষণে বলেছেন ‘দিমাগি নকশাল’দের কথা। আগে ছিল ‘আরবান নকশাল’। নতুন ভারতে সেইসব উধাও হয়ে গিয়েছে। জঙ্গলে অস্ত্রধারী নকশালরাও ‘কর্পোরেট কালচারের’ পদধ্বনিতে নিশ্চিহ্ন। রয়ে গিয়েছে এই দিমাগি নকশালরা। মানে, যাদের মস্তিষ্কের মধ্যেই নকশালি মনোভাব গেঁথে রয়েছে। মোদিজি কিন্তু হুঁশিয়ার করেছেন, ‘এরা সুযোগ খুঁজছে। অরাজকতার। হিংসা ছড়ানোর।’ উনি নিশ্চয়ই এই জেন-জি বা জেন-আলফার ছেলেমেয়েদের উদ্দেশ করে এ কথা বলেননি! কারণ, তাদের তো মোদিজি ক্ষমা করে দিয়েছেন। উনি খুঁজছেন বিক্ষোভের পিছনে যারা রয়েছে, তাদের। ওরাই দিমাগি নকশাল। এইসব লোকজন সমাজে না থাকলে বিক্ষোভই হত না! ওই যে বছর দশেকের স্কুল ইউনিফর্ম পরা মেয়েটা ক্যামেরার সামনে বসে বলছে, ‘বিল্ডিং বানিয়ে দাও। বৃষ্টিতে... রোদে আর পারি না। ছুটতে হয়। বাড়ি চলে যেতে হয়। দয়া করে স্কুল বিল্ডিং বানিয়ে দাও।’ চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়ে তার। কেউ শেখাল তাকে এ কথা? কে বলল ওকে, এটা অধিকার? শিক্ষার অধিকার? ভারতীয় নাগরিক হিসাবে জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম পরিষেবার অধিকার? তাকে খুঁজে বের করতে হবে। ওইটে দিমাগি নকশাল। এরা কেন বুঝবে না... বললেই কি বিল্ডিং বানিয়ে দেওয়া যায় নাকি? হাতের মোয়া? স্পেস টেকনোলজির রাস্তা, পাঁচ বছরে ৭৫ দেশে সফর, বিদেশনীতি, ডায়াস্পোরা, প্রচার, ভোটের আগে রাজ্যে রাজ্যে খয়রাতি... এসবে টাকা যায় না? ওখানে খরচ না করে বিল্ডিং বানাবে? ট্যাঙ্কের শ্যাওলা তুলবে? ফ্যান সারাবে? পড়ুয়াদের জন্য চব্বচোষ্য খাবারের আয়োজন করবে? এটা কি সরকারের কাজ? অনেক বড়ো বড়ো ব্যাপার থাকে। বুঝতে হবে। অত অধিকার... অধিকার করলে হবে না। উত্তরপ্রদেশের ফতেপুরে হাজার দেড়েক পড়ুয়া রাস্তায় বসে পড়েছিল। স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবিতে। ছ’ঘণ্টা পথে ছিল তারা। ফ্যান, বেঞ্চ, পরিষ্কার টয়লেট, পানীয় জল... এই ছিল দাবি। যতক্ষণ না ডিস্ট্রিক্ট ইনস্পেক্টর এবং স্কুল কর্তৃপক্ষ লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ওঠেনি তারা। এটা অধিকারের দাবি? ভালোভাবে বলতে পারত! ভরসা রাখতে পারত সরকারের উপর। না হয় স্বাধীনতার শতবর্ষে পৌঁছে সবকিছুই হয়ে যেত। কিন্তু হত। নিশ্চিত হত। অথচ তারা বিক্ষোভ-টিক্ষোভ করতে শুরু করল। রাজস্থানের আলোয়ারের স্কুলটিতে ছাদের চাঙড় ভেঙে পড়েছিল। হতেই পারে। পুরানো স্কুল। পুরানো বিল্ডিং। ঐতিহ্য বলে কথা! ধরে রাখতে হবে তো! আর চাঙড় ভেঙেছে... কারও মাথায় পড়েছে নাকি? এর জন্য রাস্তায় নামতে হবে? পুলিশ তাদের সরাতে গেলে তর্কাতর্কি করতে হবে? এটা নতুন ভারত? বিশ্বাসই হয় না। চাপের মুখে পিছু হটতে হচ্ছে প্রশাসনকে। তদন্তের নির্দেশ দিচ্ছে। মেরামতির ব্যবস্থাও করছে। এটা মোটেই ভালো হচ্ছে না। এই প্রবণতা রাষ্ট্রের পক্ষে ক্ষতিকর। অন্ধভক্তরা দূরে সরে যাচ্ছে। প্রচুর মাইলেজ নিচ্ছে আরশোলারা। তাদের ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচি মাটিতে পড়তে না পড়তে হিট। সবাই নিজের নিজের এলাকার স্কুলে চলে যাচ্ছে। চেপে ধরছে... কেন ক্লাস হচ্ছে না? ২টোর সময় ছুটি, কিন্তু ছেলেরা ১১টায় বাড়ি চলে যাচ্ছে কেন? ব্ল্যাকবোর্ডের এই দশা কেন? এরাই দিমাগি নকশাল। প্রধানমন্ত্রী ঠিক চিহ্নিত করেছেন। একবার মুখ ফসকে যখন বলে ফেলেছেন, পুলিশ-প্রশাসন ঠিক কাজে নেমে পড়বে। খুঁজে বের করবে এদের। পেতে খুব একটা অসুবিধাও হবে না। কারণ খুঁজতে হবে, বিরোধিতা কারা করছে। তারাই আগে ছিল আরবান নকশাল। এখন হয়ে যাবে দিমাগি নকশাল। সমাজের এইসব ক্ষতিকর অংশকে আগে ‘বিচ্ছিন্ন করতে হবে।’ মোদিজি এই বার্তা স্পষ্টভাবে দিয়েছেন। নতুন ইতিহাস গড়ার পথে দেশ। ইতিহাস বদলানোর পথে দেশ। বিজেপির ইতিহাস। সংঘের ইতিহাস। প্রতিষ্ঠাতাদের ইতিহাস। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস। দিমাগি নকশালরা এই মহান পরিকল্পনায় চরম বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই ‘বিচ্ছিন্ন করো’। থামাও আন্দোলন। জেন-জি হোক বা জেন-আলফা... পথে নিয়ে এসো। মুশকিল হল, এরা প্রতিশ্রুতিতে ভোলে না। নিজেদের দাবিতে বড্ড বেশি অনড় হয়ে থাকে। এরও উপায় খুঁজে বের করতে হবে। দেশ স্বাধীন হোক। কিন্তু অধিকার পরাধীন না হলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন হয় না। রাষ্ট্রগুরুরও না। এ মা, ছি ছি! এসব বলতে নেই। এটাও নিন্দুকদের কথা। আমরা শুধু বিকাশের কথা বলব। আর জাতীয় পতাকার আগে বিজেপির পতাকা তুলব।