দিল্লির যন্তরমন্তরে জেন-জি বিক্ষোভের জেরে মাথানত করতে হয়েছে মোদি সরকারকে। বিরোধী দলগুলির চেনা ছকের বাইরে অকুতোভয় আন্দোলন প্রশমিত করতে খোদ প্রধানমন্ত্রীকে বারবার মাঝরাতে ভিডিয়ো বার্তা দিতে হয়েছে। শেষমেশ কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর ককরোচ বিক্ষোভ উঠলেও ফের বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশের নতুন প্রজন্ম তথা যুবশক্তিকে সতর্ক থাকতে বলে ফের নকশালদের ‘ভূত’ দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর কথায়, জঙ্গলে থাকা অস্ত্রধারী মাওবাদীদের কাবু করা গেলেও বহু বছর ধরে নকশাল মনোভাবাপন্ন মানুষ সমাজের মধ্যেই রয়েছে। এদের চিন্তাভাবনা একাধিক প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগে প্রভাব ফেলেছে। এই ভাবনার মানুষেরা নতুন সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। এদের চিহ্নিত করে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার ডাক দিয়েছেন মোদি। দেশের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী নকশালদের সম্পর্কে এর থেকে বেশি কিছু না বললেও এই নিয়ে শিক্ষিত তরুণ সমাজ ও বিরোধীদের প্রবল প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ে মোদির মন্তব্যের বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। তাঁর সাফাই, বিরোধীদের উদ্দেশে এসব বলেননি প্রধানমন্ত্রী। প্রশ্ন হল, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ব্যাখ্যা কেন দিতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে? এ কি ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা? নাকি শিক্ষিত সমাজকে ভয় পাচ্ছে এই সরকার?
কিন্তু ইতিহাস বলছে, প্রতিবাদী কিংবা সরকার বিরোধী স্বর শোনা গেলেই তাকে ‘আরবান নকশাল’ বা মাওবাদী বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে বারবার। যেমন, ২০১৮ সালে ছত্তিশগড়ে এক নির্বাচনি সভায় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ‘আরবান নকশাল’-দের সমর্থন করার অভিযোগ করেন মোদি। বলেছিলেন, শহরের এসি ঘরে থাকা ‘আরবান মাওবাদীরা’ আদিবাসী অঞ্চলের নকশালদের নিয়ন্ত্রণ করে। এই ‘আরবান নকশাল’-রাই ২০১৯-এ মোদির কাছে ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ হয়ে যায়! সেটাও ছিল এক নির্বাচনি জনসভার বক্তৃতার অংশ। এর তিন বছর পর ২০২২ সালে লোকসভায় রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর ধন্যবাদসূচক প্রস্তাবের জবাবে মোদি সরাসরি কংগ্রেসকে ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’-এর ‘লিডার’ বলে সম্বোধন করেন। ২০২৪-এ রাজস্থানে ভোটের প্রচারে গিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, কংগ্রেস ‘আরবান নকশালদের’ কবলে রয়েছে। এরপর ২০২৬-এর ১৫ আগস্টে লালকেল্লা থেকে বক্তৃতায় শোনা গেল নতুন শব্দবন্ধ ‘দিমাগি নকশাল!’ এই দিমাগি নকশালরাই নাকি হিংসা ও নৈরাজ্যের পথকে জাগিয়ে তুলে সমাজকে ভুল পথে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বলে জেন-জিকে সতর্ক থাকতে বলেন প্রধানমন্ত্রী।
টুকরে টুকরে গ্যাং, আরবান নকশাল বা দিমাগি নকশাল বলে গত বারো বছরে মোদি জমানায় যাদের ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার’ মামলা দিয়ে জেলে আটকে রাখা হয়েছে, নানাভাবে অত্যাচার নামিয়ে আনা হয়েছে, ভয় দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ— তাঁদের অনেকেই আসলে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন বা মানবাধিকার কর্মী, অধ্যাপক-শিক্ষক-গবেষক-ডাক্তার বা আইনজীবী। গণতান্ত্রিক বা মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে, সাংবিধানিক অধিকার, নাগরিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার হরণের সরকারি চেষ্টার বিরুদ্ধে মুখ খুলে অনেকেই মোদিবাহিনীর বিরাগভাজন হয়েছেন। নানা পাপকর্মে জর্জরিত সরকার এই প্রতিবাদী আন্দোলনকে ভয় পেয়ে ‘নকশাল’ তকমা দিয়ে মিথ্যা ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে বলে অভিযোগ। যন্তরমন্তরের আন্দোলন মোদি সরকারকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, এই নতুন প্রজন্মকে ধর্মের দোহাই দিয়ে কুসংস্কারের কথা বলে ভুলিয়ে রাখা যাবে না। কারণ, এরা অনেক বেশি সচেতন, যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক। শাসক দলের হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থানের দাবি এদের অগ্রাধিকার। এই শিক্ষিত, আধুনিক মনস্ক তরুণ সমাজকেই ভয় পাচ্ছে গেরুয়াবাহিনী। বুঝতে পারছে, এদের ভুল বোঝানো অত সহজ হবে না। ইতিমধ্যেই ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) মোদির ‘দিমাগি নকশাল’ বক্তব্যের প্রতিবাদে প্রশ্ন তুলেছে, ‘কীভাবে আপনি শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মকে নকশাল বলতে পারেন? তারা শুধুমাত্র আপনার সরকারকে প্রশ্ন করে বলে?’ ককরোচরা একে চরম ঔদ্ধত্য আর সমস্যা সমাধানে অযোগ্যতা হিসাবেই দেখতে শুরু করেছে। তাই নকশালদের জুজু দেখিয়ে প্রতিবাদ আটকানোর যে চেষ্টা হচ্ছে তা কতটা সফল হবে বা আদৌ সফল হবে কি না তা সময়ই বলবে। বোঝাই যাচ্ছে, সরকার-বিরোধী যাবতীয় গণআন্দোলন, সমালোচনা, প্রতিবাদ ও ভিন্নমতকে ‘অপরাধ’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছেন মোদি। কিন্তু শাসকের এই ভয় অবশ্য তোয়াক্কা না করে জেন-জি বলতে শুরু করেছে, জাগরণের এক নতুন যুগ শুরু হয়েছে। ওরা যত বিভাজন তৈরির চেষ্টা করবে, আমরা ঐক্যবদ্ধ হব। ওরা ভয় দেখাবে, আমরা সাহস ছড়াব। জেন-জির মন ভয়মুক্ত।