Bartaman Logo
১৭ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নাগরিকত্বের অন্তহীন পরীক্ষা

নাগরিকত্বের পরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ভোটার তালিকা ও জনগণনা কি নাগরিকের পরিচয় যাচাইয়ের অংশ? বিস্তারিত জানুন।

নাগরিকত্বের অন্তহীন পরীক্ষা
  • ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নাগরিকত্বের পরীক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না। এসআইআরের আপাত-লক্ষ্য ছিল ভোটার তালিকার সংশোধন। এখন জনগণনার ছয়টি প্রশ্নের আড়ালেও যদি নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ছায়া দেখা যায়, তবে তাকে নিছক আকস্মিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেন্সাস রাষ্ট্রের নাগরিককে গণনা করার কাজ, নাগরিকত্বের পরীক্ষা নেওয়ার কাজ নয়। অথচ একের পর এক নথি, পরিচয়, ঠিকানা, জন্মস্থান, বংশপরিচয়—এই সবের গোলকধাঁধায় সাধারণ মানুষকে ঢুকিয়ে দেওয়া হলে প্রশ্ন উঠবেই, এর শেষ কোথায়? আজ ভোটার তালিকা (এসআইআর), কাল জনগণনা, পরশু নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি)—রাষ্ট্র কি ধীরে ধীরে এমন এক দরজা খুলছে, যার ওপারে দাঁড়িয়ে নাগরিককে নিজের নাগরিকত্ব বার বার প্রমাণ করতে হবে? নাগরিককে কি এবার নিজের দেশেরই নাগরিক হওয়ার জন্য রাষ্ট্রের কাছে পরীক্ষার্থী হয়ে দাঁড়াতে হবে? সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই আশঙ্কার কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক জবাব নেই। বরং সরকারি ব্যাখ্যার অস্পষ্টতা যত বাড়ছে, সন্দেহও তত ঘন হচ্ছে। গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের কাজ নাগরিককে সন্দেহের চোখে দেখা নয়, বরং নাগরিকের অধিকারকে সুরক্ষিত রাখা। জনগণনা যদি নিছক পরিসংখ্যান সংগ্রহের প্রক্রিয়া হয়, তবে তার সঙ্গে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কোনো সম্পর্ক নেই—এই কথাটি স্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন এবং আইনি নিশ্চয়তাসহ বলা সরকারের দায়িত্ব। কারণ রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ যখন মানুষের অস্তিত্ব, পরিচয় এবং অধিকারকে ছুঁয়ে যায়, তখন ‘এ নিয়ে এত প্রশ্ন কেন’ বলে প্রশ্নকর্তাকেই কাঠগড়ায় তোলা চলে না।

Advertisement

আর এখানেই গণতন্ত্রের আসল বিপদ। নাগরিকত্ব কোনো সরকারি দপ্তরের দয়ার দান নয়, আর ভোটাধিকার কোনো পরীক্ষার খাতা নয়। গরিব চাষি, পরিযায়ী শ্রমিক, উদ্বাস্তু পরিবার, সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—যাঁদের বহু প্রজন্মের জীবনের কাগজপত্র হয় সংরক্ষিত হয়নি, নয়তো নানা বিপাকে খোওয়া গিয়েছে, তাঁদের কাছে ‘নথি দেখান’ কথাটি নিছক প্রশাসনিক নির্দেশ নয়, সম্ভাব্য আতঙ্ক। একটি বানান ভুল, পুরানো ঠিকানা, হারিয়ে যাওয়া জন্মশংসাপত্র, জমির দলিলে অসংগতি কিংবা বাবা-মায়ের নথির অভাবই যদি ভবিষ্যতে নাগরিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে রাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিই সর্বপ্রথম বিপন্ন হয়ে পড়বেন। শহরের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি হয়তো আলমারি খুলে কাগজ বের করতে পারবে, কিন্তু নদীভাঙনে ঘর হারানো মানুষ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম নথি ছাড়াই জীবন অতিবাহিত করা শ্রমিক কিংবা ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়ে বারবার ঠিকানা বদলানো পরিবার কী করবে? রাষ্ট্রের নথির খাতায় একটি অসংগতি তখন মানুষের জীবনের চেয়েও বড়ো হয়ে উঠতে পারে। গণনার নামে যদি সন্দেহের সংস্কৃতি তৈরি হয়, তাহলে গণতন্ত্রের নাগরিক আর নাগরিক থাকেন না—তিনি হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রের কাছে সম্ভাব্য অভিযুক্ত। এই মানসিকতাই ভয়ংকর। কারণ রাষ্ট্র যখন নাগরিককে বিশ্বাস করে না, তখন নাগরিকও রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করার নৈতিক ভিত্তি হারাতে শুরু করেন। গণতন্ত্রের শক্তি নাগরিককে ভয় দেখিয়ে নয়, নাগরিকের আস্থা অর্জন করে। অথচ বারবার পরিচয় প্রমাণের চাপ সেই আস্থার ভিতেই ফাটল ধরাতে পারে।
তাই প্রশ্নটি ছয়টি ঘর, কয়েকটি তথ্য বা একটি প্রশাসনিক ফর্মের নয়, প্রশ্নটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের। সরকারকে স্পষ্ট করে বলতে হবে—জনগণনার তথ্যের সঙ্গে নাগরিকত্ব যাচাই, ভোটাধিকার ছাঁটাই বা এনআরসির কোনো ভবিষ্যৎ প্রক্রিয়ার যোগ আছে কি না। ‘কিছুই হবে না’ ধরনের রাজনৈতিক আশ্বাস যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন আইনি নিশ্চয়তা, স্বচ্ছ নিয়ম এবং সংসদ ও জনসমক্ষে পূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান। নাগরিকের ঘাড়ে সন্দেহের বোঝা চাপিয়ে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় না। শক্তিশালী রাষ্ট্র সেটাই, যে তার নাগরিককে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করায় না, যে নাগরিকের অধিকারকে প্রমাণের বোঝায় পিষে না-ফেলে সুরক্ষিত রাখে। জনগণনার ছয়টি প্রশ্ন যদি সত্যিই কেবল গণনার প্রশ্ন হয়, তবে সেই সীমারেখা স্পষ্ট করতে সরকারের আপত্তি থাকার কথা নয়। বরং সেই স্পষ্টতাই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ গণতন্ত্রে ভয়কে অবহেলা করলে ভয় কমে না, বরং তার রাজনৈতিক অভিঘাত বৃদ্ধি পায়। রাষ্ট্র যদি সত্যিই নাগরিকের পাশে থাকে, তবে তাকে বলতে হবে—নাগরিকত্ব কোনো অন্তহীন পরীক্ষা নয়। আজকের ভোটারকে কাল নিজের অস্তিত্বের প্রমাণপত্র নিয়ে আবার লাইনে দাঁড় করানো হবে না। নীরবতা যত দীর্ঘ হবে, সংশয় তত গভীর হবে। আর তখন মানুষের মনে স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠবেই—দরজায় কড়া নাড়ছে জনগণনা, নাকি তার আড়ালে নাগরিকত্বের আরও এক পরীক্ষা?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ