তন্ময় মল্লিক: আজ স্বাধীনতা দিবস। প্রতিটি ভারতবাসীর আনন্দের ও গর্বের দিন। দেখতে দেখতে স্বাধীন ভারতবর্ষ আশি বছরে পা দিল। তার পরে আজও কেন কথায় কথায় ওঠে স্বাধীনতার দাবি! শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন দানা বাঁধলেই তা ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’-র লড়াই বলে চিহ্নিত হয়। কারণ শুধু অন্য রাষ্ট্রের অধীনে থাকাই নয়, দেশীয় শাসকের লালচোখের সামনে বশ্যতা স্বীকারও একঅর্থে পরাধীনতা। তাই মানুষ ভয়মুক্ত না হলে, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ না পেলে বারে বারে উঠবে স্বাধীনতার দাবি।
ইংরেজ শাসনের নাগপাশ থেকে দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার আন্দোলনই হল স্বাধীনতা সংগ্রাম। বিদেশি কোনো রাষ্ট্র বা শক্তি নয়, দেশ পরিচালনা করবে দেশের মানুষ। সেই লক্ষ্যেই হয়েছিল স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার লড়াই। তাই সংবিধানে লেখা আছে, ভারতবর্ষ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাধারণতন্ত্র। সংবিধান প্রতিটি ভারতবাসীকে নির্ভয়ে কথা বলার, স্বাধীনভাবে ধর্মাচরণের এবং নিজ নিজ সংস্কৃতি পালনের অধিকার দিয়েছে। তাও পদে পদে লঙ্ঘিত হয় নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সেটা মাত্রা ছাড়ালেই আছড়ে পড়ে জনরোষ। তাকে ভয় দেখিয়ে দমন করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে মরিয়া হয়ে ওঠে শাসক।
কোনো শাসক দলই ক্ষমতা থেকে চলে যেতে চায় না। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য খোঁজে নানান ফন্দিফিকির। নতুন নতুন আইন করে। জারি করে অর্ডিন্যান্স। তবে, নজির গড়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। জরুরি অবস্থা জারি করে কেড়ে নিয়েছিলেন মানুষের মত প্রকাশের অধিকার। তারজন্য তিনি শুধু দেশের মানুষের কাছেই নয়, গোটা বিশ্বে তীব্র সমালোচিত হয়েছিলেন। তাঁকে উচিত শিক্ষা দিতে জোট বেঁধেছিল বিরোধীরা। নাম জনতা মোর্চা। ছিল একটাই লক্ষ্য, ইন্দিরা গান্ধীকে হারানো। তাই ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি মাসে তৈরি বিরোধী মোর্চা মাত্র দু’মাসের মধ্যেই অর্জন করেছিল দেশের সরকার গড়ার শক্তি। পেয়েছিল ২৯৮টি আসন। জন্ম হয়েছিল এক নতুন ইতিহাসের। দেশে প্রথম অকংগ্রেসি সরকার।
কথায় আছে, শাসকের লালচোখ। প্রশ্ন হচ্ছে, শাসক দল বা সরকার ভয় দেখায় কখন? যখন সে বোঝে, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হলে তারা সরকার গড়তে পারবে না। ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা থেকেই শুরু হয় ভয় দেখানো। এমন সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হয় যাতে মানুষ সত্যি বলতে ভয় পায়। মানুষকে ক্রীতদাস বানানোই যখন শাসকের লক্ষ্য হয় তখনই তীব্র হয় মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। ইংরেজ আমলে নীলকর সাহেবদের অত্যাচার চরমে উঠেছিল বলেই হয়েছিল নীল বিদ্রোহের মতো আন্দোলন।
স্বাধীন ভারতেও সাধারণ মানুষের উপর শাসকের মতামত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় কোনো খামতি নেই। নরেন্দ্র মোদি জোর করে নয়া কৃষি আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু চাষিদের দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইয়ের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছিল সরকার। প্রত্যাহার করতে হয়েছিল নয়া কৃষি আইন।
ভারতবর্ষের গণতন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে অত্যন্ত শক্তপোক্ত কাঠামোর উপর। দেশ ও রাজ্য পরিচালনা করে সরকার। আবার সরকার নির্বাচিত করার ক্ষমতা জনগণকেই দিয়েছেন সংবিধান প্রণেতারা। তাঁরা মনে করেছিলেন, সরকার নির্বাচনের চাবিকাঠি জনগণের হাতে থাকলে জনপ্রতিনিধিরা জনস্বার্থে কাজ করবেন। ভোটারদের চাহিদা পূরণের চেষ্টা করবেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। কিন্তু, এখন ঘটছে তার উলটো। বিজেপির বিরোধিতা করার জন্য মানুষ যাঁদের নির্বাচিত করে লোকসভায় পাঠিয়েছে, তাঁরাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিঃশর্ত সমর্থনের লিখিত প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন! তাঁর সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাসিমুখের গ্রুপ ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে আত্মশ্লাঘা অনুভব করছেন।
সেই সব ছবি দেখে তাঁদের যাঁরা ভোট দিয়েছিলেন তাঁরা তো আঙুল কামড়াচ্ছেন। গালিগালাজ দিয়ে ঝাল মেটাচ্ছেন। কিন্তু বিজেপি কর্মী সমর্থকদের অবস্থা আরও খারাপ। তাঁদের সাপের ছুঁচো গেলা অবস্থা। যাঁদের হারানোর জন্য কড়া রোদের মধ্যে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করেছেন এখন তাঁরাই মোদিজির সঙ্গে প্রাতঃরাশ করছেন। ২০২৯ সালে হয়তো তাঁদেরই ভোট দেওয়ার জন্য গলা ফাটাতে হবে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে রাজ্যেও। বিরোধীদের হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে আসার এক ভয়ঙ্কর খেলা শুরু হয়েছে। তাতে বিপন্ন হচ্ছে গণতন্ত্র। কারণ চটের আড়ালে ইভিএমের বোতাম দাবানোর ব্যবস্থা করলেই গণতন্ত্র রক্ষা হয় না। সম্মান জানাতে হবে বিরোধিতাকেও।
বিজেপি সেই পথে না হেঁটে গোটা দেশে বিরোধীদের মুখ বন্ধ করতে চাইছে। কিন্তু, কেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এর পিছনেও কাজ করছে ভয়। বিরোধিতাকে ভয় পাচ্ছে সরকার পক্ষ। কারণ কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বয়স দেখতে দেখতে ১২ বছর হয়ে গেল। এই সময়ের মধ্যে তারা এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা সাধারণ মানুষ পছন্দ করেনি। ফলে সরকারকে ঘিরে বাড়ছে ক্ষোভ। সেই ক্ষোভ কোন পর্যায়ে যেতে পারে, সেটা সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে। ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফাতে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে জমা ক্ষোভ জল হয়ে গিয়েছে ভাবলে ভুল হবে। বরং বুঝতে হবে, সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ চড়ছে বলেই ছাত্র আন্দোলন এই উচ্চতায় গিয়েছে।
অনেকে বলছেন, আর জি কর কাণ্ডের প্রতিবাদে যে গণআন্দোলন হয়েছিল, তা কেবল একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হয়নি। শাসক দলের নেতাদের প্রতি মানুষের ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছিল। অভয়ার মৃত্যুতে সেই জমা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছিল। কাতারে কাতারে মানুষ রাত জেগে, রাস্তায় নেমে বুঝিয়ে দিয়েছিল, সরকারের কাজ তাদের নাপসন্দ। আন্দোলনকারীদের নানানভাবে সাহায্য করেছিল অতি সাধারণ মানুষও। একইভাবে নিট কেলেঙ্কারি ইস্যুতে ছাত্রদের এই লড়াইকে জেন জি’র আন্দোলন বলা হলেও বহু সাধারণ লোকজন তাঁদের সাহায্য করেছেন। কারণ সরাসরি বিরোধিতার সাহস তাঁদের নেই, কিন্তু তাঁরা সরকার বিরোধী। বিভিন্নভাবে তাঁদের দমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদের রাস্তা বন্ধ। তাই সুযোগ পেলেই তাঁরা সরকার বিরোধী আন্দোলনে মদত জোগান।
সাধারণ মানুষের মত প্রকাশে বাধা থাকলেও রাজনৈতিক নেতাদের কোনো সমস্যা নেই। তাঁরা যা খুশি তাই বলতে পারেন। অন্যায় বললেও ভক্তরা তাঁদের বক্তব্যকে সমর্থন করে। হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানায়। নেতারা মনে করেন, পদ পেলে যা খুশি বলা যায়। সাত খুন মাফ। এমনকি, দেশবরেণ্য পরম শ্রদ্ধেয় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়েও কটূক্তি করা যায়। আর সেটা করে দেখিয়ে দিয়েছেন বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজ। একাধিকবার তিনি নেতাজিকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। কিন্তু, কিছু হয়নি। তাতেই তিনি হয়েছেন বেপরোয়া। তার কারণও আছে। অনন্তবাবু বোঝাতে পেরেছেন, তিনি রাজবংশী ভোটের নিয়ন্ত্রক। তিনি যেদিকে যাবেন রাজবংশী ভোট সেদিকেই ঢলবে। তাই তাঁকে তোয়াজ করা নিয়ে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে চলেছে প্রতিযোগিতা। একপক্ষ রাজ্যসভার সাংসদ করলে, অন্যপক্ষ দেয় বঙ্গবিভূষণ উপাধি(যা কেড়ে নিল রাজ্য সরকার)। না হলে যদি পিছিয়ে পড়তে হয়।
ভোটসর্বস্ব রাজনীতিই তোষণ এবং দুর্নীতির মূল কারণ। ভোটে জেতার জন্যই দুর্নীতি দেখেও নেতৃত্ব মুখে কুলুপ আঁটে। আবার ভোটে জেতার জন্যই নানান কারচুপিকে প্রশ্রয় দেয়। এই সমস্ত কারণেই চোখের মণি হয়ে ক্ষমতায় বসা একটা দল হয়ে যায় জনগণের চোখের বালি। সরকারের এটা না বোঝার কথা নয়। তা সত্ত্বেও আমাদের দেশে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। নিজের মতামত অন্যকে মানতে বাধ্য করার বাসনা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। তাতে শুধু মানুষের কথা বলার বা মত প্রকাশের স্বাধীনতাই ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না, জাঁকিয়ে বসছে ভয়।
প্রশ্ন উঠছে, স্বাধীন ভারতের বুকে বারে বারে কেন ওঠে স্বাধীনতার দাবি। স্বাধীন ভারতের বয়স যত বাড়ছে স্বাধীনতা সংগ্রামী ও ১৫ আগস্টকে ঘিরে ততই বাড়ছে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের শ্রদ্ধা জানাতে বড়ো বড়ো মূর্তি বানানো হচ্ছে। কিন্তু, তাঁদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন হবে তখনই যখন ভারতের প্রতিটি নাগরিক আক্ষরিক অর্থেই হবে স্বাধীন। তারজন্য দূর করতে হবে ভয়ের বাতাবরণ। একমাত্র ভয়মুক্ত পরিবেশই মানুষকে দিতে পারে প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ। তা না হলে একটার পর একটা ১৫ আগস্ট চলে যাবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে স্বাধীন দিবস অর্থহীন হয়েই থেকে যাবে।