প্রীতম দাশগুপ্ত: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। শুধু একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম নয়। এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির আত্মমর্যাদা। ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্ন। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বীরগাথা। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে ‘দেশনায়ক’ আখ্যা দিয়েছিলেন। সমগ্র বিশ্ব তাঁর লড়াইকে মর্যাদা দিয়েছে। অথচ বিজেপির সাংসদ নগেন্দ্র রায় ওরফে অনন্ত মহারাজ স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফুলবাড়িতে গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে তাঁর দাবি, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতাজির কোনো অবদান নেই। শুধু তাই নয়, তাঁকে সরাসরি ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যাও দিয়েছেন। কোন দেশের বিরুদ্ধে দ্রোহ? সেটা তো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। নেতাজিকে অবজ্ঞা করে বলা হচ্ছে কোচবিহারের মহারাজ জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণের কথা। নেতাজির সংগ্রামকে খাটো করে দেখা কিংবা আজাদ হিন্দ ফৌজ সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য শুনে আমার মনে হয়েছে, এ কি শুধুই একজন নেতার আস্ফালন? নাকি এর পিছনে রয়েছে কোনো গূঢ় উদ্দেশ্য? এটা ইতিহাসকে নতুন রাজনৈতিক মোড়কে লেখার চক্রান্ত নয় তো?
নেতাজির সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য ছিল এর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র। হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান—সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। সেখানে কোনো ধর্মীয় ভেদাভেদ ছিল না। নেতাজি প্রমাণ করেছিলেন যে, একটি অখণ্ড ও শক্তিশালী ভারত গড়তে হলে সমস্ত বিভেদ ভুলে দেশের প্রতিটি নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে। আজাদ হিন্দ ফৌজের বীরত্ব এবং নেতাজির ঘোষিত নীতি ব্রিটিশদের ভারতে টিকিয়ে রাখার ভিত্তিকে পুরোপুরি নাড়িয়ে দিয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতার সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ক্লিমেন্ট অ্যাটলি। তিনিও পরবর্তীকালে স্বীকার করেছিলেন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই এবং নৌবাহিনীর বিদ্রোহের কারণেই ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল আর বেশি দিন ভারতে শাসন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আর সেই নেতাজিরই অবদানকে যে ভাষায় অবজ্ঞা করেছেন অনন্ত মহারাজ, তাতে কোনো নিন্দাই যথেষ্ট নয়।
শুরুটা করেছিলেন অবশ্য বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। বলেছিলেন, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে আক্রমণ করেছিলেন নেতাজি প্রতিষ্ঠিত ফরোয়ার্ড ব্লকের ‘গুন্ডা’রা। তিনি শিক্ষিত ব্যক্তি। তাই নেতাজিকে অনেকটা রেখে ঢেকে আক্রমণ করেছেন। নাম না করে বলেছেন, এই নির্দেশটা কোথা থেকে এসেছিল, সেটা বললে বিতর্ক বাড়বে। গুন্ডাদের সর্দার বলতে যে তিনি নেতাজিকেই বুঝিয়েছেন, এটা একটা বাচ্চাও বুঝতে পারবে। কিন্তু তিনি বুদ্ধিমান। কারও নাম নেননি। তাই সরাসরি তাঁকে বলা যাবে না, আপনি নেতাজিকে গুন্ডাদের সর্দার বলেছেন। উলটে অনন্ত মহারাজের মন্তব্যে বিতর্ক শুরু হওয়ায় প্রকাশ্যে শমীক বলেছেন, নেতাজি নেতাদের নেতা। তাঁর প্রতি বিজেপির অগাধ শ্রদ্ধার কথা সমাজমাধ্যমে তুলে ধরেছেন। কিন্তু এসব বললেও এটা অস্বীকার করা যাচ্ছে না, বিজেপি রাজ্য সভাপতির কল্যাণেই শ্যামাপ্রসাদ ও নেতাজির মতের ভিন্নতার কথা আবার চর্চায় এসেছে।
সংবাদমাধ্যম থেকে সমাজমাধ্যম— শমীকবাবু বেশ সক্রিয়। নেতাজি নিয়ে দলের অবস্থান তিনি বলেই ফেলেছেন। আর সেটাতেই ফাঁপরে পড়েছে বিজেপি। শ্যাম (শ্যামাপ্রসাদ) রাখি না কুল (নেতাজি) রাখি দশা। আসলে বিজেপি তৈরি হয়েছে ১৯৮০ সালে ঠিকই। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদের হাতে তৈরি জনসংঘই আদতে বিজেপিতে রূপান্তরিত হয়েছে। আর মতাদর্শগতভাবে জনসংঘের সঙ্গে নেতাজির দূর দূরান্তের কোনো সম্পর্ক নেই। স্বয়ং নেতাজি তাঁর প্রতিষ্ঠিত ফরোয়ার্ড ব্লকের গঠনতন্ত্রে লিখেছিলেন, হিন্দু মহাসভা বা মুসলিম লিগের কেউ এই দলের সদস্য হতে পারবে না। শ্যামাপ্রসাদের হিন্দুত্ব রাজনীতির সরাসরি বিরোধিতা এমনকি প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের কথাও নেতাজি বলেছিলেন বলে বহু পণ্ডিত ব্যক্তির লেখায় জানা যায়। দলিল থেকে জানা যায়, ১৯৪০ মহারাষ্ট্রে এক প্রকাশ্য সভায় জনসংঘ ও মুসলিম লিগের কড়া সমালোচনা করেছিলেন নেতাজি। বিজেপি নেতারা ভালোই জানেন, একইসঙ্গে শ্যামাপ্রসাদের আদর্শ মেনে চলব। আবার নেতাজির ভাবধারারও গুণগান গাইব, সেটা চলতে পারে না। একসময় বিজেপি দিনরাত বলেছে, কংগ্রেস নেতাজিকে তাড়িয়েছে (সেটাও ইতিহাসের বিকৃতি)। কমিউনিস্টরা গাল দিয়েছে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষিতে)। আর এখন তারাই যদি নেতাজিকে অসম্মান করে, তবে তো রাজনৈতিক ফায়দা লোটা যাবে না। তাই ব্যালান্সের রাজনীতিতে এগতে চাইছে বিজেপি। একদিকে, নেতাজির নাম পালটে শ্যামাপ্রসাদকে তুলে ধরা হবে (বীরভূমের রাস্তার নাম বদল)। আবার অন্যদিকে নেতাজির সামরিক লড়াই ও জাতীয়তাবাদকে সম্মান জানাব।
গত ১২ বছর ধরে শুনে আসছি, ভারতের যা কিছু উন্নয়ন হয়েছে সব মোদির আমলে। নেহরুজি কিছুই করেননি। এমনকি নেহরুকে ম্যালাইন করতে তুলে ধরা হচ্ছে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে। যেমন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রকে তুলে ধরতে খাটো করা হচ্ছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকে। একটা কথা বুঝতে পারি না, একজনকে মহান করতে গিয়ে, কেন অন্য একজনকে খাটো করতে হবে। স্বাধীনতার লড়াইয়ে কেউ সশস্ত্র সংগ্রাম করেছেন। কেউ অহিংস আন্দোলন করেছেন। পথ ও মত নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে। কিন্তু তাঁদের সদিচ্ছা ও দেশমাতৃকাকে শৃঙ্খলমুক্ত করার ভাবনায় কোনো ঘাটতি ছিল না। মনে রাখতে হবে, বিতর্ক মানে ইতিহাসকে বিকৃত করা বা অস্বীকার করা নয়। একজনের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করতে গেলে সেই সময়কাল ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিচার করতে হয়।
স্বাধীনতা সংগ্রামের দুই অবিসংবাদী চরিত্রের একজন যদি হন গান্ধীজি, তবে দ্বিতীয়জন নিঃসন্দেহে নেতাজি। গান্ধীজি তো সেই কবে থেকেই হিন্দুত্ববাদীদের নিশানায়। এখানেই গান্ধীজির মতো একজনকে কাউন্টার করতে বিজেপির দরকার ছিল তেমনই মাপের একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীকে। সেটা নেতাজি সুভাষ বসু ছাড়া আর কে হতে পারেন? সুভাষ বসু আবার কংগ্রেস ত্যাগ করেছিলেন। ফলে সুযোগ বুঝে নেতাজিকে কাজে লাগিয়ে কংগ্রেসকে রাজনৈতিক আক্রমণের সুযোগ ছাড়তে চায়নি বিজেপির বর্তমান নেতৃত্ব। তাঁরা কি জানেন না নেতাজি ধর্মীয় ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে ছিলেন? তাঁর সংগ্রামে ধর্মের লড়াই ছিল না। আর বিজেপির রাজনৈতিক গুরু শ্যামাপ্রসাদের রাজনীতির ভিত্তিই ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদ। এসব অজানা নয় বিজেপি নেতৃত্বের। তবু নেতাজি নিয়ে প্রচার বাড়ানো হয়েছে। ২৩ জানুয়ারিকে পরাক্রম দিবস ঘোষণা করা হয়েছে। রাজধানীর কর্তব্য পথে নেতাজির মূর্তি স্থাপন হয়েছে। দেখানোর চেষ্টা হয়েছে, নেতাজিকে প্রকৃত মর্যাদা দিয়েছে বিজেপি সরকারই। সবটাই হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে রাজনীতির সুক্ষ্ম কৌশলটা রয়ে গিয়েছে। কেন একথা বললাম? একজন দেশনায়ককে প্রকৃতপক্ষে কখন শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব? শুধু মূর্তি বসিয়ে নাকি তাঁর মতাদর্শকে মান্যতা দিয়ে? বিজেপির পক্ষে নেতাজির মতাদর্শ মেনে চলা অসম্ভব। কারণ তাহলে শ্যামাপ্রসাদকেই অস্বীকার করতে হয়। অথচ নেতাজি এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর বিরুদ্ধাচরণ দেশের মানুষ মেনে নেবে না। তাই ওই কৌশল।
অনন্ত মহারাজের মন্তব্যের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীও। রাজ্য সরকার আবার তাঁর বঙ্গবিভূষণ সম্মান কেড়ে নিয়েছে। তাতেই অনেকে ধন্য ধন্য করতে শুরু করেছে। অথচ মজার ব্যাপার, শুভেন্দুবাবু যখন বিরোধীপক্ষে ছিলেন, তখন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া এই সম্মানকেই অবজ্ঞা করেছিলেন। এখন সেই সম্মান কেড়ে তিনি কী প্রমাণ করতে চাইলেন? বঙ্গবিভূষণ না হলে অনন্ত মহারাজের কতটা ক্ষতি হবে? সমাজমাধ্যমে এ সংক্রান্ত পোস্টের জন্য পাঁচ-ছ’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু মূল মাথারা নিশ্চিন্তে আছেন। আবার বিজেপির কেউ কেউ বলছেন, এটা ওঁর ব্যক্তিগত মত। দলের নয়। বিজেপির মতো একটা রেজিমেন্টেড পার্টিতে আবার এটা হয় নাকি? একজন সাংসদ দলের নির্দেশ না শুনে মত দেবেন? যদি মনে হয়, কেউ বেসুরো, তবে তো তাঁকে বহিষ্কারের রাস্তা খোলাই রয়েছে। নগেন্দ্র রায়ের ক্ষেত্রে বিজেপি তো সে পথে হাঁটছে না। শমীকবাবুকে তো সতর্ক করা হয়নি। বরং দেখা গেল, নগেন্দ্র রায় সমাজমাধ্যমে দুঃখপ্রকাশ করতেই রাজ্যের বিজেপি নেতৃত্ব বলতে শুরু করল, ব্যাস সব মিটে গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলছেন, ব্যাপারটাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা উচিত। মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ বলছেন, ক্ষমা চাওয়াকে সম্মান দেব। বোঝাই যাচ্ছে, নেতাজি অবমাননা গৌণ। রাজবংশী ভোটই এখন মুখ্য। তাই দ্রুত মাফ মিলেছে।
নেতাজিকে নিয়ে যেভাবে রাজনীতির খেলা শুরু হয়েছে, বলতে বাধ্য হচ্ছি ভাগ্যিস তিনি ফেরেননি। আমরা কি সত্যি নেতাজিকে ডিজার্ভ করি?