দেহতত্ত্ব অত্যন্ত জটিল। ইহা ভেদ করিতে হইলে দেহের সকল, সকল-নিষ্কল ও নিষ্কল, এই তিনটি স্তর ভেদ করিতে হয়। অকুল সহস্রার হইতে মুলাধারাদি যাবতীয় কুলপদ্ম ভেদ করিয়া ক্রমশঃ উপর দিকে উঠিতে হয়। আমরা সাধারণতঃ যে সহস্রদল কমলের কথা শুনিয়া থাকি তাহা দেহের উর্দ্ধদেশে অবস্থিত। অকুল হইতে আজ্ঞাচক্র পর্যন্ত প্রদেশের ভাবনা সকল, বিন্দু হইতে উন্মনী পর্যন্ত সকল-নিষ্কল এবং মহাবিন্দু নিষ্কল।
ভ্রূমধ্যে কিঞ্চিৎ উপর দিকে ললাটে বিন্দুর স্থান। ইহা বর্ত্তুলাকার এবং দেখিতে দীপের ন্যায়। বিন্দু-আবরণে মূল পাঁচটি কলারই স্থিতি রহিয়াছে। চারিদিকে নিবৃত্তি প্রভৃতি চারিটি কলা এবং শান্ত্যতীতা নামে পঞ্চম কলা বিন্দুর মধ্যে অবস্থিত। ‘মতঙ্গ পরমেশ্বর’ নামক আগমের মতে যে পরম তত্ত্বকে লয় অবস্থাতে শিব বলা হয়—ব্যক্ত অবস্থাতে তাহাকেই বিন্দুও বলা হয়। সৃষ্টির উন্মুখ অবস্থাই বিন্দু। আবার অন্য দিক্ দিয়া দেখিলে অনন্তে প্রবেশ করিবার প্রথম দ্বারই বিন্দু। সকল অবস্থাতে সাধক সীমার মধ্যে বর্তমান থাকে, কিন্তু এই অবস্থায় পর পর ভূমি ভেদ করার ফলে চিত্ত ক্রমশঃ অধিকতর একাগ্রতা লাভ করে। আজ্ঞাচকে একাগ্রতারা পূর্ণ বিকাশ হয়। পাতঞ্জল মতে সম্প্রজ্ঞাত সমাধির পূর্ণ বিকাশ অস্মিতা নামে অভিহিত হয়। উহাতে প্রজ্ঞার পূর্ণ বিকাশ হইলেও উহা স্থূলেরই ব্যাপার, কারণ সর্বজ্ঞত্বও স্কুলের ধর্ম্ম ভিন্ন অপর কিছু নহে। বিশুদ্ধ চিদানুভূতি এই ভূমিতে হয় না। গ্রন্থিভেদের পর নিরোধের দ্বার খুলিয়া গেলে সুক্ষ্ম চিদানুভূতির সূত্রপাত হয়। নিরোধের ক্রমবিকাশের ইতিহাস এবং পূর্ববর্ণিত নব নাদের ক্রমিক উৎকর্ষ একই কথা। নিরোধের চরম অবস্থায় চিত্ত বৃত্তি-শূন্য হয়। অতএব এই সব নাদের ব্যাপারটি নিরুদ্ধ চিত্তের গুপ্ত রহস্য।
বিন্দুর কথা পূর্বেই বলা হইয়াছে। এই ভূমিতে জ্যোতির্ম্ময় জ্ঞানরূপে ঈশ্বরবোধের সূচনা ঘটে। এখানে প্রবিষ্ট হইতে না পারিলে জাগতিক জ্ঞান বিলুপ্ত হইতে পারে না। সমাধিজনিত প্রজ্ঞা হইতে ইহা অনেক উপরের অবস্থা, কারণ সমাধি জনিত জ্ঞান উৎকৃষ্ট হইলেও জাগতিক জ্ঞান মাত্র। কিন্তু অর্দ্ধমাত্রার জ্ঞান চিন্ময় অনুভব, তাই উহা শ্রেষ্ঠ। লৌকিক জ্ঞানে ত্রিপুটীর লোপ ঘটে না—বিরাট, অভেদজ্ঞানের উদয় হইলেও ভেদবোধের নিবৃত্তি ক্রমশঃ ঘটিয়া থাকে। ঐ ভেদবোধ ক্রমশঃ স্তর ভেদ করিতে করিতে কাটিয়া যায়। তখন প্রথম দেশকালের জ্ঞান থাকে বটে, তবে তাহা একটু অন্য প্রকারের। যোগিগণ যে পঞ্চ শূন্যের পরিচয় প্রাপ্ত হন বিন্দুই তন্মধ্যে প্রথম শূন্য। বিন্দুস্তরে বীজ থাকে না অর্থাৎ প্রকৃতির স্ফুরণ থাকে না, তাই ইহাকে পুরুষের অভিন্ন স্বরূপও বলা যাইতে পারে।
বিন্দুর পর অর্দ্ধচন্দ্র। এইটি দ্বিতীয় ভূমি। ইহার মাত্রা ১/৪। বিন্দুকে পূর্ণচন্দ্র বা চন্দ্রবিন্দু কল্পনা করিয়া অর্দ্ধচন্দ্রকে তাহারই অর্দ্ধাংশরূপে কল্পনা করা হইয়াছে। ইহা বিন্দুর উপরে অবস্থিত। ইহার চারিদিকে চারিটি এবং মধ্যে একটি মোট পাঁচটি কলা আছে। ইহা কিন্তু শূন্য নহে। ললাটস্থিত অর্দ্ধচন্দ্রের বিন্দুর জ্ঞেয় প্রধান ভাব কাটিয়া যায়।



