সমস্ত কর্তব্যের মূলে হচ্ছে ভালবাসা। ভালবাসা যার ওপর আসে তার সঙ্গে কোনও আত্মীয়তা থাকুক আর না থাকুক, সেখানে কর্তব্য আপনি গড়ে ওঠে এবং সে কর্তব্যটুকু ছাড়া মানুষ বাঁচতেই পারে না। কিন্তু যেখানে ভালবাসা নেই, সেখানে কর্তব্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তবে যোগীদের মন এমন যে, তারা এই কর্তব্যটাকে সমানভাবে সকলের জন্য ক’রে যেতে পারে। কারণ, সেই কর্তব্যের ভেতর থাকে একটা মোহহীন শান্ত ভালবাসা। উচ্ছ্বাস থাকে না, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের কর্তব্য নীরস বা প্রাণহীন হয় না। সংসারের ভালবাসার সঙ্গে যোগীর ভালবাসার এইখানেই তফাৎ। ভালবাসা এবং কর্তব্য আধার-বিশেষে এবং ক্ষেত্রবিশেষে এক একরকম রূপ নেয়। সাধারণ সংসারে কর্তব্য এবং ভালবাসা সীমিত রূপ নেয় কিন্তু একজন দেশপ্রেমিক কিংবা একজন ঈশ্বর-প্রেমিকের ভালবাসা বিরাট রূপ নেয়।
সেদিন নিজেদের মধ্যে একটি কথা হয়েছিল, রেডিওতে যখন নাটক হয়, তখন class ভাগ ক’রে দেওয়া হয় কি? অর্থাৎ এই নাটকটি এত বছর বয়েসের ছেলেমেয়েরা শুনবে না, এত বছরের যারা, শুধু তারা শুনবে? তা তো সম্ভব হয় না। অথচ যা পরিবেশন করা হল তা সকলের শোনা উচিত নয়, বিশেষ ক’রে ছোটদের তো নয়ই। কাজেই হয় সেগুলি ভাগ ক’রে দিতে হয়, বলে দিতে হয় যে, এটাতে অন্ধকার দিক আছে, এটা এই বয়সের যারা তাদের শোনা উচিত নয়। আর নয়তো এমন জিনিস দিতে হবে যা সকলের পক্ষেই গ্রহণীয়। কিন্তু তা তো হচ্ছে না। বরং এমন সব জিনিস পরিবেশন করা হচ্ছে যার মধ্যে থেকে ভাল বেছে নেওয়া বড়দের পক্ষেই কঠিন, অপরিণতদের পক্ষে আরও কঠিন। হাল্কা জিনিস চট ক’রে তারা ধরে ফেলবে।
এখানে কবি সম্মেলনে একবার একটি কবিতা পাঠ হ’ল, শেষের দিকে এমন কতকগুলো terms বা শব্দ use করলেন কবি যে, সেটা আমরা ‘ভাবমুখে’-তে দিতে পারলাম না। কোনও জনসভায় আমরা যখন যাই, তখন ভদ্রভাবে যাই, সেজেগুজে যাই। একটু পালিশ ক’রে আমাদের সভায় যেতে হয়। কারণ, জনসমাজ বলে একটা জিনিস আছে—তার ঐতিহ্য আছে, কৃষ্টি আছে—তাই সেখানে যেতে হলে পরিষ্কার জামা কাপড় পরতে হয়, সাজতে হয়, চুল আঁচড়াতে হয়। নোংরাভাবে, এলোমেলোভাবে যেতে পারি না। তেমনি সাহিত্যের ক্ষেত্রে, কাব্যের ক্ষেত্রেও অন্ধকার দিকটা যদি বলতেই হয় তো এমন ক’রে বলতে হবে যাতে অন্ধকার দিকটা প্রকট না হয়ে আলোটাই ফুটে উঠবে। আলোটুকু ফোটাবার জন্য যেটুকু দরকার সেটুকুই শুধু বলতে হবে। আসল কথা হচ্ছে, চরিত্রে এই পবিত্র ভাবটি না থাকলে তা হয় না। মনে রাখতে হবে কলমের ভেতর দিয়ে, বাক্যের ভেতর দিয়ে, যে স্খলন সেটাও মনের স্খলন। কবিতা সাহিত্য মানে বক্তব্য বিষয়টাকে নর্দমায় এনে ছেড়ে দেওয়া তো নয়। কবিতা বললেই মনে হয় আকাশ, ফুল, যা কিছু সুন্দর।
শ্রীঅর্চনাপুরী মায়ের বাণী ‘ছড়ানো মুক্তো’ থেকে