একশো দিনে একটা সরকারকে সম্যক বিচার করা সম্ভব নয়। করা উচিতও নয়। কিন্তু বদলের একটা আভাস তো মিলবে! পরিবর্তনের একটা ভিত্তি তো রচিত হবে ঐতিহাসিক পালাবদলের পটভূমিতে। কিন্তু কোথায় কী! বদল নয়, একই গড্ডলিকা প্রবাহ যেন চলছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, নিরাপত্তা এবং গুন্ডাদমনের ক্ষেত্রে কি নতুন কোনো কিছু খালি চোখে দেখা গিয়েছে এই সাড়ে তিন মাসে? সব মরশুমেই চুক্তি হয়। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়। কিন্তু যুবক-যুবতিদের চাকরি সেই তিমিরেই থেকে যায়। এবার তার কিছু পরিবর্তন হবে কি না, তা প্রত্যক্ষ করতে অপেক্ষা ছাড়া গতি নেই। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলুন তো ২৯ এপ্রিল বাংলার ভোটাররা যে আবেগে ভেসেছিলেন তা শ্রাবণ পেরিয়ে কি একটুও টোল খায়নি? এই ভরা শ্রাবণে শিবভক্ত মোদির সঙ্গে বসে মিটিং করছেন কী যেন পরিয়ে শিবের অবমাননার অন্যতম মুখ সায়নী ঘোষ! ভোটের আগে ভাবতে পেরেছিলেন? সংসদে বিল পাশের তাগিদ হার মেনেছে ধর্মের ভয়ংকর অবমূল্যায়নের সামনে। ৪ মে’র পর বিজেপি কর্মীদের থেকে হিসাব বুঝে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন জুন মালিয়া। পুরস্কার স্বরূপ তিনি শুধু বিজেপির রাজদরবারেই সম্মান পাননি, বিদগ্ধ রাজ্য সভাপতি শমীকবাবুর সঙ্গে সংসদ চত্বরে হাত ধরে ভাব বিনিময় করেছেন নিখাদ আহ্লাদে। ডিম আর তৃণমূলের দিকে ধাবিত নয়, ছুটে আসছে গেরুয়া অভিমুখেই। স্বয়ং রাজ্য সভাপতিকে স্বীকার করতে হচ্ছে, বিধায়ক হয়েই ফিতে হাতে ফ্ল্যাট মাপতে ছুটছেন দলের কেষ্টবিষ্টু থেকে নির্বাচিত বিধায়করা। সতর্ক করেও ফল মিলছে না। সংক্রামক রোগের মতো তা ছড়িয়ে পড়ছে গেরুয়া দলের সর্ব অঙ্গে। দরজা খিল দিয়ে আটকেও শমীকবাবু তৃণমূলের সংক্রামক রোগ গেরুয়া শরীরে রুখতে পারেননি। এবং মারণ রোগ যেভাবে ছড়াচ্ছে তাতে আগামী দিনে তা আরও মারাত্মক আকার নেবে। অন্তত তিনজন ইস্তফা দিয়ে অতি সহজে বিজেপির রাজ্যসভার সদস্য হয়েছেন। আর যাঁরা বিজেপির হয়ে খেটেছিলেন, তাঁরা গভীর হতাশায় আঙুল চুষছেন। তাঁদের ভাগ্যের শিকে ছেঁড়ার আশু কোনো সম্ভাবনা আছে বলে মনে হচ্ছে না।
ওই যে বললাম সময়টা বড্ড অল্প। কিন্তু এখনও পর্যন্ত একদিকে যেমন তৃণমূলের সিংহভাগ বিধায়ক এবং এমপি এই কদিনেই গেরুয়া আশ্রয়ে বহাল তবিয়তে, তেমনি রাজ্য বিধানসভায় কার্যত সাজানো বিরোধীদের রমরমা। সেই বিজেপির কথায় চলা বিরোধীদের কারও বিরুদ্ধে কি পুলিশে মামলা নেই, জামিনঅযোগ্য ধারা নেই? কিন্তু পরিবর্তিত সেটিং আবহাওয়ায় সাতখুন মাফ! তাহলে গুন্ডামুক্ত বাংলা গড়বে কে? তৃণমূল আমলের তোলাবাজদেরই বা উলটো করে ঝোলাবে কে? শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষার জন্য না হয় আর কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে, কিন্তু গুন্ডামি, তোলাবাজি এবং দলভাঙাভাঙি যে চলবেই বিগত ১০০ দিন তারই প্রমাণ! আর দেশের কথা? অমিত শাহ বিরোধিতা দেখলেই বলতেন টুকরে টুকরো গ্যাং। আরএসএস বলত রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি। রাজনাথদের কথায় পাকিস্তানের চর। আরবান নকশাল বলেও গালমন্দ কম করেনি মোদি ব্রিগেড। এবার তাই বদলে নতুন কয়েনেজ সামনে নিয়ে এলেন প্রধানমন্ত্রী। দিমাগি নকশাল। শুধু শব্দ বদলে জনগণের কী হবে? বলুন তো, পেট ভরবে? আপনি বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করতে বারবার শব্দবন্ধ বদলান। আসল উদ্দেশ্য আলাদা করা। কিন্তু এভাবে কি প্রতিপক্ষকে শেষ করা যায়?
আসলে মুকুল রায় মরিয়া প্রমাণ করেছেন, তিনি মরেন নাই। কারণ, তাঁর একটিমাত্র বেফাঁস কথা রাজ্য রাজনীতিতে রীতিমতো ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। দু’হাজার একুশের চব্বিশে ডিসেম্বর মুকুলবাবু বলেছিলেন, ভারতীয় জনতা পার্টি মানেই তৃণমূল। কেন বলছি? তৃণমূলস্তর থেকে একেবারে গুন্ডা-মাস্তানদের লেভেলেও নিঃশব্দে ‘বিজেপির তৃণমূলীকরণ’ হয়েই চলেছে। জেলায়-জেলায়, পাড়ায়-পাড়ায় একই ছবি। ক’টা উদাহরণ চান? একদা তৃণমূল আশ্রিত জয়ন্ত সিংয়ের অত্যাচারে আড়িয়াদহে কার্যত মধ্যযুগের অন্ধকার নেমে এসেছিল, সেই জয়ন্ত সিংয়ের যাবতীয় কুকীর্তির সঙ্গী, কার্যত ডানহাত, সুশোভন সরখেলকে দেখা যাচ্ছে দমদমে বিজেপির মঞ্চ আলো করে বসে থাকতে। তার মানেটা তো একেবারে পরিষ্কার। শমীক ভট্টাচার্য যতই মঞ্চের উপর থেকে বিবেকের ভূমিকায় সতর্কবার্তা দিন-না-কেন, কার্যক্ষেত্রে দলের উপরতলা থেকে নীচুতলা, কোথাও শমীকবাবুর কথামৃত তেমন গুরুত্বই পাচ্ছে না। দিল্লি না-হয় শমীকের কথা বা দলের ভেতর থেকে ওঠা প্রতিবাদ শুনছে না, কিন্তু নীচুতলাও কী আর রাজ্য সভাপতির কথায় আমল দিচ্ছে না? নাকি, আসলে এটা সেই মুখ আর মুখোশের খেলা? মুখে বলা হবে একরকম, আর কার্যক্ষেত্রে হবে আর একরকম? ১০০ দিনের এটাই সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা! ‘ভরসা আউট, ভয় ইন’।