কেন্দ্রের বিজেপি সরকার যেন এক মহান জাদুকর! তার হাতে এক আশ্চর্য জাদুর কাঠি আছে। যেকোনো ঘটনার পর সেটি একবার ঘোরালেই— ব্যস, যাবতীয় দোষ-দায়, দুঃখ, দুর্দশা, গাফিলতি, অত্যাচারের অভিযোগ থেকে মুক্তি! রিপোর্ট এবং জবাব তৈরিই থাকে। যেমন, পুলিশ গুলি চালিয়েছে? কার নির্দেশে? কেউ তো আহত হয়নি। লাঠি-কাঁদানে গ্যাস চলেছে? কোনো গুরুতর জখম নেই। মন্দিরের দান চুরি হয়েছে? ট্রাস্টের মাথাদের কোনো দায় নেই। যেন সরকার কিংবা সরকারি দলের কোনো ভুল হতেই পারে না। ভুল করে শুধু নাগরিক, সামান্য পুলিশকর্মী, নিরাপত্তারক্ষী, গণনাকর্মী কিংবা কোনো অখ্যাত কর্মচারী। আর সেই ভুলের দায় তাদের ব্যক্তিগত। সরকারের কেন হতে যাবে?
২০ জুলাই যন্তরমন্তর সহ গোটা দিল্লিতে যা ঘটেছিল, তার ছবি-ভিডিয়ো এখনও মানুষের চোখের সামনে। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। বলপ্রয়োগ হয়েছে। কাঁদানে গ্যাস, লাঠি, এমনকি পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। আহত হওয়ার ছবি ছড়িয়েছে। এমনকি আরটিআই তথ্য এবং হাসপাতাল নথিতে স্পষ্ট, দিল্লি পুলিশের ছোড়া পেলেট গানের আঘাত নিয়ে অন্তত ১০ জন ভরতি হয়েছিল লেডি হার্ডিঞ্জ এবং সফদরজং হাসপাতালে। অথচ সেসব কিচ্ছু খালি চোখে দেখতে পাচ্ছে না মোদি সরকার। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর বক্তব্য—যারা প্রতিবাদ করতে এসেছিল, তাদের একাংশ ‘অপরাধী’, ‘হুজুগে বিক্ষোভকারী’। তাও দিল্লি পুলিশ এমন ‘সংযম’ দেখিয়েছে যে গুরুতর আহত একজনও নেই। কারও হাড় ভাঙেনি, কাউকে হাসপাতালে ভরতি করতে হয়নি। সেই চিরচেনা তুলনাও টেনেছেন রিজিজু, ‘কংগ্রেস আমলে হলে কয়েক হাজার মৃত্যু হত।’ এ তো সেই যুক্তি, ‘আমি মারিনি, অন্যজন আরও জোরে মারত!’ বিজেপি জোট সরকার শাসিত বিহারে ছবিটা আরও ভয়াবহ। ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে এক কনস্টেবল একে-৪৭ থেকে গুলি চালিয়েছেন। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়েছে, এসপিকে সরানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রশাসন নিজেই স্বীকার করেছে, ঘটনাটি এতটাই গুরুতর যে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। তারপরও সরকারি ব্যাখ্যা—আত্মরক্ষায় গুলি চালানো হয়েছিল, কেউ আহত হয়নি! সেই একই মন্ত্র। আচ্ছা, আহত না হলে কি নির্বিচারে গুলি চালানো বৈধ কাজ?
অযোধ্যার রামমন্দিরের প্রণামি চুরির ঘটনা সেই একই নাটকের অন্য মঞ্চ। ভক্তরা যে টাকা শ্রীরামের চরণে অর্পণ করেছেন, সেই টাকা পাহারা দেওয়া, সংগ্রহ করা, গণনা করা—সব কিছুর সঙ্গে ট্রাস্টের প্রশাসনিক কাঠামো যুক্ত। সেখানে অভিযোগ উঠেছে চুরির। ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদককে পদত্যাগ করতে হয়েছে। তাঁর গাড়িচালক অন্যতম মূল অভিযুক্ত। তারপরও উত্তরপ্রদেশ সরকারের গঠিত সিট রিপোর্ট দিচ্ছে, ট্রাস্টের শীর্ষ কর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ঠিক আছে। প্রমাণ না থাকলে কাউকে অপরাধী বলা যায় না। কিন্তু ট্রাস্ট পরিচালিত যে ব্যবস্থায় দিনের পর দিন টাকা চুরি করার সুযোগ তৈরি হল, যে ব্যবস্থায় নজরদারি ব্যর্থ হল, যে ব্যবস্থায় দানপাত্র ও গণনার নিরাপত্তায় ফাঁক রইল, তার জন্য ট্রাস্টের কর্তাদের কি কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে না? এ তো চমৎকার ব্যবস্থা! এই যুক্তি মেনে নিলে দেশে কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতার জন্য নাগরিক বাদে আর কেউ দায়ী থাকবে না। ৫৬ ইঞ্চি ছাতির শক্তিশালী সরকারের ভুল স্বীকার করতে এত ভয় কেন? যে প্রশাসন বলে তারা স্বচ্ছ, তদন্তে সত্য প্রকাশ করতে তাদের এত অস্বস্তি কেন? কারণ, দায় স্বীকার করলে প্রশ্ন উঠবে। প্রশ্ন উঠলে জবাবদিহি চাইবে মানুষ। তাতে সরকারের অস্বস্তি বাড়বে। তাই তো সব ভিডিয়ো ভুল! রক্তাক্ত শরীরগুলো অপ্রাসঙ্গিক। চুরিও বিজেপি নেতাদের করতে দেখা যায়নি। অর্থাৎ, মেনে নিতে হবে অভিযোগ ভিত্তিহীন। তাহলে ঠিক কোনটা? সরকার যা বলছে। রাষ্ট্র যা বোঝাচ্ছে। পাবলিককে তাই খেতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে। না হলে? রাষ্ট্রদ্রোহী!