Bartaman Logo
২১ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বঙ্গ রাজনীতিতে হুমকি, হুঁশিয়ারির সুর বেশি

সমাজে তো বটেই, উচ্চপদে আসীন হওয়া ব্যক্তিবর্গের মধ্যেও দু‌রকম বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। একটি অংশ যত ক্ষমতাধরই হন, সেটি তাঁর বাচনভঙ্গিতে প্রতিফলিত হয় না।

বঙ্গ রাজনীতিতে হুমকি, হুঁশিয়ারির সুর বেশি
  • ২১ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: সমাজে তো বটেই, উচ্চপদে আসীন হওয়া ব্যক্তিবর্গের মধ্যেও দু‌রকম বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। একটি অংশ যত ক্ষমতাধরই হন, সেটি তাঁর বাচনভঙ্গিতে প্রতিফলিত হয় না। তিনি থাকেন শান্ত, ধীর, স্থির। প্রকাশ্যে সংযত, পরিশীলিত বাক্য ব্যবহার করেন। আর অন্য একটি শ্রেণির মধ্যে লক্ষ্য করা যায়, সর্বদাই যেন যুদ্ধং দেহি মনোভাব। নেতা, নেত্রী, মন্ত্রীদের একাংশের প্রবণতা দেখা যায় যে, ‘আমি ক্ষমতাসম্পন্ন’ প্রমাণ করতে তাঁরা ধমকের সুরে কথা বলাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। আবার অন্যরা অত্যন্ত সৌজন্যপূর্ণ বাক্য ব্যবহার করেন। 

Advertisement

এই একই মনোভাব সমাজেও সাধারণ মানুষের মধ্যেও রয়েছে। কিন্তু আম জনতার ব্যক্তিগত ব্যবহারিক আচরণ সমষ্টিকে প্রভাবিত করে না। সরকারি নীতি নির্ধারণে সে-সবের দাম নেই। পক্ষান্তরে, ক্ষমতাবান উচ্চপদাধিকারীদের বক্তব্য দ্রুত সমাজে অভিঘাত সৃষ্টি করে। তাঁদের অনেক অনুগামী থাকে, ভক্ত থাকে, ভোটার থাকে, সমর্থক থাকে। সুতরাং তারাও ভেবে নেয় এটাই রীতি। এভাবে ওই ধমক-প্রবণতা ছড়িয়ে যায় সমাজে। 
বাংলায় নতুন সরকার গঠন হওয়ার পর লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সরকারের মন্ত্রী ও শাসক দলের নেতাদের একাংশের মধ্যে সর্বদাই ধমক দিয়ে কথা বলা, হুমকি প্রদান ও হুঁশিয়ারির সুর বিদ্যমান। অথচ সকলেই যে এরকম, তেমন নয়। প্রশ্ন উঠছে, এভাবে মন্ত্রী, বিধায়কদের কিয়দংশের যে বিবৃতি সমাজ মাধ্যমে অবিরত প্রচারিত হচ্ছে, সেখানে কেন দেখা যায় যে, তাঁদের বক্তব্যে ‘দেখে নেব’ জাতীয় হুঁশিয়ারির সুর? এখন সরকার বদল হয়ে গিয়েছে। অতীত শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস পরাজিত হয়েছে। এমনকি সেই দল ছত্রভঙ্গ। তিনটি দলে বিভক্ত। আবার বামপন্থীরা সংহত হওয়ার চেষ্টা করলেও এবারের ভোটেও প্রমাণিত যে, তাদের ভোটব্যাংক এখনও শক্তিশালী হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। আগামী দিনে পটপরিবর্তন হতেই পারে। কিন্তু বিজেপি এখন সবথেকে শক্তিশালী। তাদের ধমক হুঁশিয়ারি আর দেওয়ার দরকারই নেই। এখন কাজ করে দেখানোর সময়। 
বর্তমান রাজনীতিতে বিরোধীদের সকলেই দুর্বল। এমতাবস্থায় সরকারপক্ষ যদি প্রথম থেকেই নতুন দিশায় অগ্রগতির বার্তা দিয়ে জোরকদমে কাজে নেমে পড়ে, তাহলে সেটাই তাদের জন্য সুফলদায়ক হবে। অথচ সরকার এবং শাসক দলকে দেখা যাচ্ছে এখনও তাদের সবথেকে বেশি সময় ব্যয় করতে ভালো লাগে বিরোধীদের হেনস্তা, নাজেহাল, অপমান, নাস্তানাবুদ এবং ভয় প্রদর্শনে। আইন আইনের পথে চলুক। কিন্তু ক্ষমতা প্রদর্শন যেন প্রকট হয়ে পড়ছে। 
আদতে কিন্তু আম জনতা তাকিয়ে আছে কী কী বদল হচ্ছে সেটা দেখার জন্য। আজকাল সমাজ মোবাইল ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মুহূর্তে বাঁচে। অর্থাৎ পুরাতন সরকার অনেক ক্ষতি করে দিয়েছে, আমাদের সময় লাগবে নতুন করে সব ঠিক করতে, এরকম ঘোষণা সাধারণত বেশিদিন ধরে মানুষের মনঃপূত নয়। কারণ, আজকাল সবই মানুষ চটজলদি সমাধান  চায়। ভোটের আগে সেরকমই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে, ক্ষমতায় এসেই সরকার পরিচালন পদ্ধতি, সমাজের চালচলন সব বদলে দেওয়ার কাজ শুরু করবে। সেটার পরিবর্তে মাসের পর মাস ধরে বিরোধীদের হুমকি, হুঁশিয়ারি, ফুটপাতের দোকানিকে ধমক, সরকারি কর্মী, পুলিশ সকলের সঙ্গে ক্যামেরার সামনে ধমকের সুরে কথা বলার প্রবণতা ক্রমেই একঘেয়ে হয়ে যাবে। তাই আগে দরকার সরাসরি কাজের প্রয়োগ। 
বিশেষ করে যা পরিলক্ষিত হচ্ছে, সেটি হল, নতুন সরকারের মন্ত্রী ও দলীয় বিধায়কদের কথ্যভঙ্গিতে একটি উদ্ধত ও কঠোরতার সুর। বিধানসভায় মন্ত্রী, বিধায়ক অনেকেই তাঁদের ভাষণে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। সাংবাদিক সম্মেলনে হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন! প্রকাশ্যে উদ্দিষ্ট ব্যক্তিদের ধমক দিয়ে কথা বলছেন। শুধুই বিরোধী দল নয়, সেইসব কঠোর বার্তা আর ধমকের আওতায় আসছে সরকারি কর্মী, পুরসভার চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর, ফুটপাতের দোকানি, পুলিশ সকলেই। কাজ দেখানোর একটি সহজ ও পরীক্ষিত উপায় হল হাসপাতাল পরিদর্শন করা। সরকারি দপ্তরে হাজির হওয়া। ফুটপাত দখল হওয়া দেখা। এসব সব আমলে প্রায় সব মন্ত্রীই করেছেন। আর মন্ত্রীদের দেখা যায় সাধারণত কলকাতার একটি হাসপাতালে সারপ্রাইজ ভিজিট করতে।  ক্যামেরা সঙ্গে থাকে। কিন্তু জেলা, ব্লক, মহকুমার হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র একইরকম থাকে। 
 মন্ত্রী ও বিধায়কদের মধ্যে অনেকেই এই প্রথমবার বিধানসভায় প্রবেশ করেছেন। সুতরাং সর্বাগ্রে দরকার ছিল বঙ্গীয় বিধানসভার অতীত গরিমা, সংসদীয় রীতি, দৃষ্টি আকর্ষণীয় প্রস্তাব কাকে বলে, পয়েন্ট অফ অর্ডার কী, মুলতুবি প্রস্তাবের বিধি, বাজেট পেশ ও পাশ হওয়ার মধ্যে কীভাবে বিধানসভায় কোন পদ্ধতি অনুসৃত হয় ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যকভাবে জেনে নেওয়া। এই শিক্ষা প্রক্রিয়া নিয়মিত দেওয়া হয় বিধানসভায়। গুরুত্বসহকারে সেগুলিতে হাজিরা দেওয়া দরকার।
 পাঁচ বছরের জন্য প্রথমবার বিধায়ক ও মন্ত্রী হলে সর্বাগ্রে দরকার আগে মনোযোগী ছাত্র হওয়া। অর্থাৎ গতকাল পর্যন্ত একজন রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন, আজ সেই তিনিই বিধায়ক অথবা মন্ত্রী হয়েছেন, এই যে ভূমিকাবদল, তার তাৎপর্য কী?  এটা উপলব্ধি করা দরকার। জেনে নেওয়া যে বিধানসভায় একজন বিধায়ক ও মন্ত্রীর কী কর্তব্য। বিধায়ক ও নেতাদের অনেককেই দেখা যাচ্ছে, মন্ত্রী, পুলিশ সুপার, জেলাশাসক, পুরচেয়ারম্যান, ইত্যাদি সব ভূমিকায় একা একাই নেমে পড়েছেন! সরকার ও প্রশাসন যে একটি সিস্টেমে চলে, সেটা ভুলে যাওয়া হচ্ছে। তাঁরা নানাবিধ অনিয়মের কথা বলে একে তাকে ধমক দিচ্ছেন। বিধায়কদের ঠিক কী কী করতে হয় এবং ভূমিকা কী, সেটা আগে জেনে নেওয়া দরকার। কিন্তু সর্বাগ্রে বিধায়কদের একাংশ আগে বেছে নিয়েছেন ক্ষমতাপ্রদর্শনে ধমক, হুমকি ও হুঁশিয়ারিকে। এর ফলে দলের ক্ষতি হয়। সরকারের বদনাম হয়। 
একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হিসাবে রাস্তায়, সভা, সমাবেশ, স্ট্রিট কর্নারে, সাংবাদিক সম্মেলনে যে শরীরী ভাষা ও বাকরীতি ব্যবহার করা এবং বিধায়ক ও মন্ত্রী হয়ে অবিকল সেই একই ভাষ্যরীতিতে অবিচল থাকা কাঙ্ক্ষিত নয়। কারণ, বিধায়ক ও মন্ত্রীরা যখনই বিধানসভার সদস্য হয়ে গেলেন, তখন আর তাঁরা দলের নয়। নাগরিক সমাজের মন্ত্রী ও বিধায়ক। সুতরাং সেইমতোই আচরণ করা বিধেয়। বিধানসভায় মন্ত্রী, বিধায়ক কিংবা স্পিকার ঠিক কী বলছেন, সেই প্রতিটি সংসদীয় শব্দই লিপিবদ্ধ করা হয়। সেটি ওই মুহূর্তে নথিভুক্ত ইতিহাসের অঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। বিধায়ক ও মন্ত্রীদের মনে রাখতে হবে যে, আজ তাঁরা যেটা বলছেন, সেই প্রতিটি বাক্য, শব্দ ৫০ কিংবা ১০০ বছর পর কিন্তু বিধানসভার মহাফেজখানায় ভাষণের ফাইলে পাওয়া যাবে। বিধানসভায় বিধায়ক ও মন্ত্রীরা ঠিক কীভাবে কথা বলছেন, কোন বিষয়ে বলছেন, সমকালের সমস্যা, রাজনীতি, সমাজ, আইন সবকিছুর রেকর্ড হয়ে থাকছে প্রতিটি ভাষণে। একজন সফল ও আদর্শ বিধায়ক ও মন্ত্রী হওয়া প্রচণ্ড কঠিন কাজ। সুনির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে কাজ এবং বাগ্মিতা চিরকাল থেকে যায়।  ধমক, হুমকি টিকে থাকে না। 
প্রশ্ন উঠছে পারে, এই হুমকি সংস্কৃতি অর্থাৎ থ্রেট কালচার তো বিগত যুগেও ছিল। বিগত ১৫ বছর ধরে শোনা গিয়েছে। তারও আগে সিপিএমের বিরুদ্ধেও এরকম হুমকি হুঁশিয়ারি সাক্ষী হয়েছে গ্রামশহর। তাহলে হঠাৎ বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই প্রশ্ন উঠছে কেন? উঠছে, কারণ, ওই হুমকি হুঁশিয়ারিই তো বিগত শাসকদের পতনের কারণ হয়েছে। ১০ কোটি মানুষের সকলেই তো আর সিন্ডিকেট, কাটমানি, দুর্নীতি, জমি দখল, সামাজিক বয়কট, পুকুরে বিষ, রিগিং-এর শিকার হয়নি। যারা নিজেদের মতো করে জীবন কাটিয়েছে, যারা সব আমলেই ব্যক্তিগতভাবে কোনো ক্ষতির মধ্যে পড়েনি, তাদের কাছে কিন্তু বিগত দুই আমলেই সবথেকে বেশি দৃষ্টিকটু ও বিরক্তির জন্ম দিয়েছিল হুমকি, হুঁশিয়ারি এবং ধমক। তাই বিরুদ্ধ ভোট। 
বিজেপির উচ্চপদস্থ নেতা এবং সরকারের সর্বোচ্চ পদাধিকারীদের উচিত এখনই সর্বস্তরে বার্তা দেওয়া যে, ধমক, হুমকি, হুঁশিয়ারির সুরে লাগাম দিতে হবে। ক্ষমতার দম্ভে খুব ক্ষুদ্র ক্ষমতাসম্পন্ন নীচুতলার নেতাকর্মীরাও স্থানীয় স্তরে যখন উদ্ধত ও দাম্ভিক আচরণ করে, তখন প্রথমে উপরের তলায় সেই আচরণগুলির বিরূপ প্রভাবের খবর পৌঁছয় না। অথবা সঠিক সংবাদ সর্বোচ্চ স্তরের নেতারা পায় না। সেটাই হয়ে ওঠে ক্রমে সবথেকে বড়ো বিপদ। মানুষ মনে মনে রুষ্ট হয় স্থানীয় নেতাদের আচার আচরণে। 
নতুন সরকার ও দলের চালিকাশক্তিদের কাছে উদ্বেগজনক হল, মাত্র তিন মাসের মধ্যে এরকম ধমক, হুমকি, হুঁশিয়ারি, তোলাবাজির অভিযোগ উঠবে কেন? নতুন সরকারের একটা মধুচন্দ্রিমা সময়সীমা থাকবে! নিজেদের সংযত, মাত্রাজ্ঞানসম্পন্ন, সতর্ক ও বিনয়ী করার প্রয়াস ব্যর্থ হচ্ছে কেন? সরকার ও দলের নিয়ন্ত্রণ ও সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। 
বাংলায় ২৩৫ আসন পরাজিত হয়েছে। ২১৭ আসন পরাজিত হল। ২০৮ আসন সেখানে তুলনামূলকভাবে কম।  সতর্ক হওয়ার দরকার আছে এখন থেকেই। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ