কলকাতার বুকে আবার এক বিভীষিকাময় অগ্নিকাণ্ড। নিউ মার্কেট এলাকার ১৫ নম্বর মির্জা গালিব স্ট্রিটের অভিশপ্ত পাঁচতলা জতুগৃহে আগুনের ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে প্রাণ হারালেন একটি শিশু সহ ৯ জন নিরীহ মানুষ। মৃতদের মধ্যে বেশিরভাগই ওপার বাংলা থেকে এদেশে চিকিৎসা করাতে আসা মানুষ, যাঁরা ভালো পরিষেবার আশায় এ শহরে এসেছিলেন। দমকলের সদর দপ্তর থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে ঘটা এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি শুধু অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারাটাই উদ্ভাসিত করল না, বরং আরও একবার প্রমাণ করল—সাধারণ মানুষের প্রাণের মূল্য আসলে কত কম। ঘটনার বিবরণ অত্যন্ত নির্মম ও পরিচিত। ঘুপচি ঘর, অপরিসর গলি, একটা মাত্র সংকীর্ণ স্টিলের সিঁড়ি, ঝুলন্ত ইলেকট্রিক তারের জটলা আর ফায়ার সেফটি বা দমকলের ছাড়পত্র না থাকা। এক একটি পুরানো আবাসিক ভবনকে কোনো বৈধ প্ল্যান বা অনুমতি ছাড়াই কৃত্রিম দেওয়াল তুলে বেআইনিভাবে রূপান্তরিত করা হয়েছে বাণিজ্যিক গেস্ট হাউসে। মির্জা গালিব স্ট্রিটের এই একই ঠিকানায় প্রায় ১৫টি গেস্ট হাউস ও রেস্তরাঁ রমরমিয়ে চলছিল। চিকিৎসা আর ব্যবসার কাজে আসা সাধারণ মানুষকে সস্তায় ঘরের টোপ দিয়ে প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুকূপে বন্দি করা হচ্ছিল।
অগ্নিকাণ্ডের পর যথারীতি নিয়মমাফিক প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন, বিল্ডিং সিল করা, হোটেল লিজগ্রহীতাকে গ্রেপ্তার, শো-কজ নোটিস জারি এবং পুরসভার বরোভিত্তিক যৌথ অডিটের নির্দেশ—স্ক্রিপ্টের প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত নিখুঁত ও এক সুরে বাঁধা। অথচ এই ছবি কি রাজ্যবাসীর জন্য নতুন? গত ১৭ আগস্ট তারাপীঠের হোটেল, ২৬ জানুয়ারি আনন্দপুরের কারখানা বা বড়বাজারের ঋতুরাজ হোটেল—মৃত্যুর মিছিল কোনো নতুন ঘটনা নয়। প্রতিবারই আগুন লাগে, তাজা প্রাণ ভস্মীভূত হয়, তারপর শুরু হয় পরের দৃশ্যাবলি—প্রশাসনিক তৎপরতা, সিট গঠন, শো-কজ নোটিস, জোড়াতালি অডিটের নির্দেশ। যথারীতি শুরু হয় রাজনৈতিক দায় ঠেলাঠেলি। শাসকদল আঙুল তোলে পূর্বতন সরকারের অবহেলার দিকে। বিরোধীরা তোপ দাগে বর্তমান প্রশাসনের চরম ব্যর্থতাকে নিশানা করে। কিন্তু রাজনীতির কারবারিদের এই কাদা ছোড়াছুড়ির ভিড়ে ঢাকা পড়ে যায় আসল প্রশ্নটা—নিয়ম বহির্ভূতভাবে তৈরি হওয়া এমন ডেথ ট্র্যাপগুলো কার আশ্রয়ে বছরের পর বছর ধরে রমরমিয়ে চলে? ট্রেড লাইসেন্স বা অগ্নিনির্বাপণ ছাড়পত্র ছাড়া কীভাবে একটি ভবনে ১৫টি গেস্ট হাউস দিনের পর দিন ব্যবসা চালিয়ে যায়? প্রশ্নগুলো সহজ হলেও তার উত্তর মেলে না। শুধু প্রতিটা ঘটনার পর কড়া পদক্ষেপের হুংকার দেওয়া হয়। আর উত্তেজনা থিতিয়ে গেলেই সব ঢাকা পড়ে যায় পুরানো অনিয়ম আর দুর্নীতির নীচে।
মির্জা গালিব স্ট্রিটের এই অগ্নিকাণ্ড আবার উসকে দিয়েছে গত দুই দশকে কলকাতা শহরের একাধিক আগুনের বিভীষিকাময় স্মৃতি। গত ২০ বছরে শুধু এই শহরেই অন্তত আটটি বড়ো অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন দুই শতাধিক মানুষ। সময়ের চাকা ঘুরেছে, সরকার বদলেছে—বাম আমল পেরিয়ে তৃণমূল জমানা, আর বর্তমান রাজ্য বিজেপির শাসন। ক্ষমতার হাতবদল হলেও শহরবাসীর নিরাপত্তার চিত্রপট সামান্যতম বদলায়নি। ২০০৬ সালে তপসিয়ার চামড়া কারখানায় তালাবন্ধ দরজার পিছনে ন’জন শ্রমিকের জীবন্ত ভস্মীভূত হওয়া, ২০১০ সালে পার্ক স্ট্রিটের স্টিফেন কোর্টে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে ৪৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু বা ২০১১ সালে ঢাকুরিয়ায় আমরি হাসপাতালের আইসিইউতে বিষাক্ত ধোঁয়ায় ৯৩ জন ঘুমন্ত রোগীর দমবন্ধ হয়ে মারা যাওয়া—প্রতিটি ঘটনাই ছিল প্রশাসনিক ব্যর্থতার একেকটি রক্তাক্ত দলিল। এই একের পর এক অগ্নিকাণ্ড এবং তার কারণে প্রাণহানি কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, এটা আসলে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অবহেলার ফলশ্রুতি। প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা। সরকার আর বিরোধীরা যখন ক্ষমতার অঙ্কে ব্যস্ত, তখন সাধারণ নাগরিকের লাভের লাভ কিছুই হয় না। যদি সত্যিই সুরক্ষার সদিচ্ছা থাকে, তাহলে বেআইনি ভবনগুলির বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কারণ, শুধু শোকপ্রকাশ আর রাজনৈতিক তরজায় ভস্মীভূত প্রাণগুলি ফিরে আসে না। যার যায়, সে জানে।