মহাকাশে পাড়ি দিয়ে নিত্যনতুন তথ্য আবিষ্কার করছেন ভারতীয় বিজ্ঞানী মহাকাশচারীরা। যা যুগান্তকারী বলা যায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও পিছিয়ে থাকবেন কেন? তাঁর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারও চাকরিতে নিয়োগের নতুন ‘সংজ্ঞা’ আবিষ্কার করে ফেলেছে! গত ১৫ জুলাই একটি সংসদীয় কমিটির বৈঠকে কেন্দ্রীয় কর্মিবর্গ মন্ত্রক মোদি জমানায় কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরিতে নিয়োগের যে তথ্য দিয়েছে, সেখানেই পদোন্নতিকে নিয়োগ বলে জানানোর চেষ্টা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, মোদি জমানায় ২০১৪ থেকে ২০২৫-এর এই সময় পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন শূন্যপদে পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ হয়েছে ৭ লক্ষ ৮০ হাজার ৪১ জনের। বর্ণপরিচয় হওয়া একটা অবোধ শিশুও বোঝে, পদোন্নতিকে নতুন নিয়োগ বলা যায় না। কিন্তু কমিটির বৈঠকে সরকারের আমলারা এই হিসাবকে নিয়োগের তালিকায় জুড়ে দিয়ে জানিয়েছেন, মোদির রাজত্বে ১১ বছরে কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি হয়েছে ২২ লাখের। আরও আছে, ২ লক্ষ পদে নিয়োগের পরীক্ষা এ বছর হওয়ার কথা। তার মাধ্যমে নিয়োগ সম্পূর্ণ হতে কমপক্ষে এক বছর সময় লাগবে। মানুষকে অবাক করে দিয়ে ২২ লাখ চাকরির তালিকায় এই দু’লক্ষকেও ঢোকানো হয়েছে! তার মানে ২২ লাখ নয়, ১১ বছরে মোদি সরকারের আমলে প্রকৃত চাকরি প্রাপকের সংখ্যা আসলে ১২ লক্ষ। একেই ‘নিয়োগের নতুন সংজ্ঞা আবিষ্কার’ বলে মনে করছেন তথ্যভিজ্ঞমহলের একাংশ। খবরে প্রকাশ, সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এই প্রশ্নে বিরোধী দলের এমপিদের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পড়ে সরকারের আমলারা ছিলেন মৌন। আর কমিটির চেয়ারম্যান, বিজেপি দলের সাংসদকে রীতিমতো ঢোঁক গিলতে দেখা গিয়েছে।
২০১৪-তে মোদিজির প্রতিশ্রুতি ছিল, বছরে ২ কোটি বেকারের চাকরির। যা পূরণ করলে ১১ বছরে ২২ কোটি বেকারের চাকরি হওয়ার কথা। তা তো হয়নি, উল্টে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সরকারি চাকরির প্রশ্নে একের পর এক অসত্য ভাষণ ও তথ্যের জাগলারি করে চলেছে মোদি সরকার। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যানেরই ঝোলা থেকে যেমন ‘প্রকৃত’ নিয়োগের বেড়াল বেরিয়ে পড়েছে, তেমনই বেকারত্বের ভয়াল ছবিটাও সামনে এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের রিপোর্টই বলছে, মোদি জমানায় ২০১৬-১৭ সালে দেশে বেকারত্বের হার (৬.১ শতাংশ) যা ছিল, তা ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এখন তা সামান্য কমলেও গত জুন মাসে সেই হার ছিল ৫.৬ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, চাকরির বাজারে ৫ শতাংশের বেশি বেকারত্ব থাকাকে ‘চড়া হার’ হিসেবে ধরা হয়। এর মধ্যে শহরে বেকারত্বের হার বেড়ে হয়েছে ৭.১ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হল, দেশে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সিদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়ে হয়েছে ১৫.৩ শতাংশ। বেকারত্বের ভয়াবহ ছবিটা উঠে এসেছে ১৫ জুলাইয়ের সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও। যেখানে একজন সাংসদ জানান, ১১ বছরে শুধু গ্রুপ সি এবং গ্রুপ ডি পদে চাকরির জন্য ২২ কোটি আবেদনপত্র জমা পড়েছে। এঁদের পরিণতির কোনও তথ্য অবশ্য দিতে পারেননি আমলারা।
বাস্তব সত্য হল, মোদিজি প্রতিশ্রুতি দিলেই চাকরি হয়ে যায় না। আর চাকরিটা আকাশ থেকেও পড়ে না। আসলে প্রতিশ্রুতি দিলেই যে তা পূরণের কোনও দায় থাকে না তার প্রমাণও বারবার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কারণ মুখের কথায় তো কোনও ট্যাক্স লাগে না। তথ্যের ‘জাগলারি’ তে মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টাও চলে হামেশাই। কিন্তু তাতে আসল সত্যটা ঢাকা যায় না। অস্বীকার করার উপায় নেই দেশের চরম বেকারত্ব ঘোচাতে শুধু সরকারি চাকরি নয়, প্রয়োজন শিল্প ও বিনিয়োগ। সরকারি তথ্য বলছে, সে ক্ষেত্রেও ডাহা ফেল করেছে মোদি সরকার। শাসকের দাবি, ভারতীয় অর্থনীতি দ্রুত গতিতে এগচ্ছে। সেটা হলে দেশের শিল্পোৎপাদন চোখে পড়ার মতো বৃদ্ধি হওয়ার কথা। কিন্তু জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর জানাচ্ছে, গত এপ্রিলে দেশে শিল্পবৃদ্ধির হার থমকে দাঁড়িয়েছে ২.৭ শতাংশে। ২০২৪-এর এপ্রিলে এই হার ছিল ৫.২ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কলকারখানার উৎপাদন নির্ভর করে দেশের চাহিদার উপর। দেশে সেই চাহিদা তৈরি হচ্ছে না। বিশেষত কলকারখানা, বিদ্যুৎ ও খননের মতো ক্ষেত্রগুলিতে উৎপাদন কম হচ্ছে। পরিকাঠামো ক্ষেত্রেও ফলাফল আশাব্যঞ্জক নয়। শিল্প, বিশেষত বড় শিল্পের এই বেহাল দশায় নতুন নিয়োগের সুযোগ যে অধরাই থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। বরং দেখা যাচ্ছে, উৎপাদন শিল্পের বেহাল দশার কারণে কাজ হারাচ্ছেন বহু মানুষ। স্থায়ী চাকরি দূর অস্ত, অসংগঠিত ক্ষেত্র বা চুক্তিভিত্তিক চাকরির বাজারও রীতিমতো ধুঁকছে। এমন প্রায় বন্ধ্যা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে জলমেশানো নিয়োগের তথ্য পেশ করছে সরকার। আর ‘রোজগার মেলার’ ফানুস ফুলিয়েই চলেছে! অথচ নিঃশব্দে বেড়ে চলেছে ‘বেকারত্ব’। তাই সরকারের নিয়োগ বিষয়ক তথ্য শুধু অসত্যই নয়, দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টাও। নির্লজ্জ সরকার তবু চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির ঢাক পিটিয়ে চলেছে!