Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

চাপে পড়ে...

গত ২৭ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গ সহ ১২টি রাজ্যে এসআইআর-এর নির্ঘণ্ট প্রকাশের প্রথম দিন থেকেই প্রশ্নটা উঠেছিল, এত তাড়া কীসের?

চাপে পড়ে...
  • ২ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

গত ২৭ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গ সহ ১২টি রাজ্যে এসআইআর-এর নির্ঘণ্ট প্রকাশের প্রথম দিন থেকেই প্রশ্নটা উঠেছিল, এত তাড়া কীসের? ২০০২-এ ‘সার’-এর কাজ দু’বছর ধরে চললে এবার কীভাবে দু’মাসে কাজ শেষ করার নির্দেশ দিল নির্বাচন কমিশন? মাসাধিককাল এই মূল প্রশ্নকে কোনও গুরুত্ব না দিলেও ইনিউমারেশন ফর্ম জমার শেষ দিন (৪ ডিসেম্বর)-এর চারদিন আগে ‘সার’-এর প্রতিটি ধাপে সময়সীমা ৭ দিন করে বাড়িয়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা করল নির্বাচন কমিশন। অনেকেই মনে করছেন, ‘সার’-এর প্রথম ধাপেই ফর্ম পূরণ ও তা ডিজিটাইজ করা নিয়ে যে পাহাড় প্রমাণ অসংগতির ছবি উঠে এসেছে, ভোটার থেকে বিএলও-দের মধ্যে যেভাবে আতঙ্ক ছড়িয়েছে— তাতে কমিশনের ব্যর্থতা ও পরিকাঠামোগত ত্রুটি আড়াল করা যাচ্ছে না। এবং এইসব প্রসঙ্গের কথা তুলেই পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, তামিলনাড়ু ও উত্তরপ্রদেশ থেকে এসআইআর-এর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। সেইসব মামলার শুনানি শেষ না হলেও ইতিমধ্যে প্রধান বিচারপতি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, প্রয়োজনে খসড়া তালিকা প্রকাশের দিন পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে। একগুচ্ছ প্রশ্ন তুলে ইতিমধ্যে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে দু’ দফায় চিঠি দিয়েছেন এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এসআইআর নিয়ে অসন্তোষের কথা জানিয়ে কয়েকদিন আগে তৃণমূলের সংসদীয় প্রতিনিধিদল দিল্লিতে বৈঠক করেছে কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে। পাশাপাশি সোমবার থেকে শুরু হওয়া সংসদের অধিবেশনে এই নিয়ে উত্তাল হওয়ার হুংকার দিয়েছে বিরোধীরা। সন্দেহ নেই, এই সাঁড়াশি চাপের কাছে নতি স্বীকার করে, সাতদিন সময় বাড়াতে বাধ্য হয়েছে কমিশন। যদিও বিরোধীরা এই ‘সামান্য’ সময় বৃদ্ধিতে আদৌ সন্তুষ্ট নয়। 

Advertisement

কমিশনের তরফে এই সময় বাড়ানোর পিছনে অন্য ‘চাপ’-এর তথ্যও উঠে আসছে। খবরে প্রকাশ, ‘সার’-এর কাজের চাপ সহ্য করতে না পেরে রবিবার পর্যন্ত ১২টি রাজ্যে ২৮ জন বিএলও আত্মহত্যা করেছেন। এরমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের চার জন। এ রাজ্যে চারজনের আত্মহত্যার কারণ হিসেবে সাফাই দেওয়া হয়েছিল, এঁরা নাকি রাজ্যের শাসকদলের চাপে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশে ৫ জন, রাজস্থানে ৩ জন, মধ্যপ্রদেশে ৮ জন এবং গুজরাতে ৬ জন বিএলও আত্মহত্যা করায় পশ্চিমবঙ্গের সাফাই ওই রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে দিতে পারছে না কমিশন। বিশেষত কয়েকজন বিএলও-র ‘সুইসাইড নোট’, ‘সার’ নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ (নির্বাচন কমিশনের হাত রক্তে লাল) এবং কমিশনের সাফাইয়ের আড়ালে প্রকৃত সত্যকেই যেন বেআব্রু করে দিয়েছে। এসআইআর-এর কাজের চাপ এবং কমিশনের নানা হুঁশিয়ারির কারণেই যে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন, উত্তরপ্রদেশের মোরাদাবাদের এক বিএলও ‘সুইসাইড নোট’-এ তা লিখে গিয়েছেন।‘... রাত-দিন কাজ করেও এসআইআর-এর লক্ষ্যপূরণ করতে পারিনি। সময় বেশি পেলে করে ফেলা যেত। এই সময় পর্যাপ্ত নয়’। রাজস্থানের এক বিএলও চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করার সময় তাঁর পকেটে যে ‘সুইসাইড নোট’ মেলে তাতে লেখা ছিল, ‘এত চাপ আর নিতে পারছিলাম না। অনলাইনে নাম তুলতে পারছিলাম না। তার মধ্যে চাকরি যাওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন সুপারভাইজার’। এই চাপের কাছে হার মেনে আত্মহত্যা করেছেন বলে এ রাজ্যের এক বিএলও-ও সুইসাইড নোট লিখে যান। প্রশ্ন উঠেছে, এই মৃত্যুর দায় কার? কেনই বা মানুষের এমন মর্মান্তিক পরিণতি হবে ভোট বিষয়ক কাজ করতে গিয়ে? 
কমিশনের এই সাতদিন সময় বাড়ানোর পিছনে অন্য উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। আসলে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা কাজ করছে বলে মনে করছেন অনেকে। প্রসঙ্গটি উড়িয়ে দেওয়ার নয়। এসআইআর-এর কাজের অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ করে কমিশন জানিয়েছে, রবিবার পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সহ ১১টি রাজ্যে ৮০ শতাংশের উপর কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। একমাত্র উত্তরপ্রদেশে এই কাজ হয়েছে ৬৯.৫৬ শতাংশ। সুতরাং যোগীরাজ্যকে কাজ শেষ করার সুযোগ করে দেওয়াই যে কমিশনের সময় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ, তা মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। নিন্দুকেরা বলছেন, এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের নানা আশঙ্কা, সুপ্রিম কোর্টের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ, বিএলও থেকে ভোটারের আত্মহত্যা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব, কমিশনের সার্ভারের সমস্যা সহ যেসব অসংগতির ছবি প্রতিদিন উঠে আসছে তাতে পরিষ্কার— ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা তৈরি করার চেয়ে কেন্দ্রীয় শাসকদলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করাতেই যেন কমিশনের আগ্রহ বেশি। অত্যন্ত কম সময়ে বিপুল কাজ শেষ করায় বিহারে বহু আসল ভোটারের নাম বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। চলতি এসআইআর-এর শেষেও তেমনটা হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রশ্ন হল, এই তাড়াহুড়োর চাপে কাজ শেষ করতে গিয়ে আর কত মৃত্যু দেখতে হবে? আগামী সপ্তাহে এই সংক্রান্ত মামলার পরবর্তী শুনানি রয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। প্রশ্ন হল, তাই কি সুপ্রিম সমালোচনা সামলাতে এখন এই সময়সীমা বাড়ানো হল? তবে বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শীর্ষ আদালত কোনও কঠোর পদক্ষেপ করে কি না, এখন সেটাই দেখার।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ