দেবী দুর্গার মর্তে আবাহনের সময় আসন্ন। তিনি আমাদের ঘরের মেয়ে। উমা ঘরে ফিরলে মনে হয় আঁধার কেটে চারদিক আলোয় ভরেছে। এবার সব দুঃখের অবসান হবে। লিখছেন অরুণ মুখোপাধ্যায়।
মা আসছেন। মা আমাদের ঘরের মেয়ে। মাকে আপনি অনেক নামেই ডাকতে পারেন। কখনো সতী, কখনো উমা, কখনো অপর্ণা, কখনো বা দুর্গা, চণ্ডী। তাঁর প্রিয় সন্তানকে সঙ্গ দিতে মা আসছেন এই ধরাধামে। সাংসারিক এবং পারিবারিক জীবনে আমরা কল্পনা করে নিয়েছি, মা উমা বা দুর্গা তিন দিনের জন্য তাঁর বাপের বাড়িতে আসছেন। আবাহনের পরে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এই তিন দিন পিতৃগৃহে থেকে দশমীর দিন বিজয়ায় তিনি পতিগৃহে ফিরে যান। পদকর্তা রামপ্রসাদ সেন লিখছেন, ‘প্রসাদ বলে, থাক ব’সে ভবার্ণবে ভাসাইয়ে ভেলা।/ যখন জোয়ার আসবে উজিয়ে যাবে, ভাটিয়া যাবে ভাটার বেলা।।’
মা মেনকা দুঃখ প্রকাশ করছেন। মেনকা তাঁর পাষাণহৃদয় স্বামী হিমালয়ের কাছে আকুতির সঙ্গে বলছেন, কেন তিনি তাঁর কন্যাকে পিত্রালয় নিয়ে আসছেন না? এ তো আবহমান কাল ধরে সব মায়েরই অনুযোগ। গিরিরাজ উমাকে নিয়ে এলেন মেনকার কাছে। কমলাকান্ত ভট্টাচার্য লিখছেন, ‘গিরিরাণী! এই নাও তোমার উমারে।/ ধর ধর হরের জীবনধন।।’ তিন দিন চলে যায়। মা মেনকার মনখারাপ। কন্যা উমাকে তিন দিন ধরে প্রচুর আদর-যত্ন করেছেন। কিন্তু নবমীর রাত উপস্থিত। উমাকে এবার চলে যেতে হবে। তখন মেনকা আর কী করেন, তিনি উদ্বেল হয়ে বলেন, কমলাকান্তের পদে পাই, ‘ফিরে চাও, গো উমা! তোমার বিধুমুখ হেরি।/ অভাগিনী মায়েরে বধিয়ে, কোথায় যাও গো!.../ এই খানে দাঁড়াও উমা! বারেক দাঁড়াও মা/ তাপের তাপিত তনু, ক্ষণেক জুড়াও গো।।’
বাঙালি মায়ের কন্যা-বিরহের বাস্তব বেদনা এই গানগুলিতে মানবিক মাধুর্য দান করেছে। এগুলি আগমনি গান। দেবীর আগমন-বার্তা। উমা যেখানে মেয়েরূপে মর্তে আসেন, সেখানে মা কালী আসেন মাতৃরূপে। তিনি তাঁর ভক্ত-সন্তানদের জন্য সেবা বিতরণ করেন অথবা তাঁর ভক্ত সন্তানেরা মায়ের কাছে প্রার্থনা নিবেদন করে। কত আকুতি, কত চাওয়া, কত প্রার্থনা। শুধু আমাকে দাও আর দাও। অর্থ দাও, শিক্ষা দাও, বুদ্ধি দাও।
সতীর দেহত্যাগ হল। মহাদেব সতীর দেহ নিজের কাঁধে নিয়ে নটরাজ রূপে নাচতে শুরু করলেন। সতীর শরীরের অঙ্গ তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে ৫১ পীঠে ছড়িয়ে দিলেন শ্রীবিষ্ণু। তৈরি হল সতীর একান্ন পীঠ। সতী পরের জন্মে হিমালয়-মেনকা কন্যা উমা বা পার্বতী হয়ে জন্ম নিলেন। বাল্যকালেই তার বিবাহ হয়েছিল দরিদ্র ভিক্ষুকবেশী শিবের সঙ্গে। প্রতিটি মুহূর্তেই মেনকার দুর্ভাবনা হত। প্রতি বছরের শেষে একবার উমা ঘুরে আসেন বাপের বাড়ি থেকে। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এই তিনদিন পিতৃগৃহে থেকে চতুর্থ দিবসে আবার ফিরে যান পতিগৃহে। উমার আগমন উপলক্ষ্যে জননী মেনকার উৎকণ্ঠা, আবেগ, আগ্রহ, উৎসাহ, উল্লাস ও আনন্দ নিয়ে রচিত আগমনি গান। যা বাঙালির নিজস্ব সম্পদ। মাতা পিতার সংসার ছেড়ে মা মেনকাকে এবং প্রতিবেশীদের দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দশমী তিথিতে শিবগৃহে প্রত্যাবর্তন নিয়ে সংগীতগুলি বিজয়া নামে পরিচিত।
শরৎকালে দেবীর আগমন। দেবীর আগমনকে কেন্দ্র করে আকাশে বাতাসে শরতের প্রকৃতি তার রূপ ছড়িয়ে দেয় নির্দ্বিধায়। স্বচ্ছ নীল আকাশ, সাদা পেঁজা তুলোর মতো মেঘের হালকা লুকোচুরি খেলা। আর পথের ধারে দেখা যায় সাদা কাশের গুচ্ছ। মা আসছেন এমন প্রাকৃতিক পটভূমিকায়। রামপ্রসাদ সেন গান লিখেছেন, ‘আজি শুভনিশি পোহাইল তোমার।/ এই যে নন্দিনী আইল, বরণ করিয়া আন ঘরে। মুখশশী দেখ আসি দূরে যাবে দুঃখরাশি,/ ও চাঁদ মুখের হাসি, সুধারাশি ক্ষরে।’ গানটির মধ্যে রয়েছে কন্যার আগমনে মাতৃহৃদয়ের আনন্দ উচ্ছ্বাস। আরেকটি খুব বিখ্যাত পদ। যেখানে ক্ষণিকের আনন্দ অনুভূত হবার পর বিজয়ার বিচ্ছেদ ভাবনায় নিরানন্দ এক অদ্ভুত দুঃখ জড়িয়ে রয়েছে। রামপ্রসাদ সেনের গান, ‘গিরি, এবার আমার উমা এলে, আর উমা পাঠাব না। /বলে বলবে লোকে মন্দ, কারো কথা শুনব না।’ আমাদের পরিবারে যখন বাড়ির মেয়ে আসে এবং পতিগৃহে ফিরে যাওয়ার দিন তার পিতা-মাতার বা ভাই বোনের যে মানসিক অবস্থা হয়, যে মানবিক দুঃখের বহিঃপ্রকাশ ঘটে তারই যেন সারাৎসার এই গান। মাত্র তিন দিনের জন্য উমা পিতৃগৃহে এসেছেন। হিমালয়ের গৃহে আনন্দের জোয়ার এসে গেছে। আবার তিন দিন পরেই নবমী শেষ হচ্ছে, দশমী আসছে। নবমীর রাত পেরলেই দশমী তিথি চলে আসবে। উমাকে বিদায় জানাতে হবে। বিচ্ছেদ ভাবনায় কাতর মেনকার দুঃখ, শোক, আর্তি বিজয়ার গানে প্রকাশিত। কমলাকান্ত ভট্টাচার্য লিখছেন, ‘ওরে নবমী নিশি! না হৈও রে অবসান।/
শুনেছি দারুণ তুমি, না রাখ সতের মান॥/
খলের প্রধান যত, কে আছে তোমার মত;/আপনি হইয়ে হত, বধ রে পরেরই প্রাণ॥’ আরেকটি গানে পাই অভিমানী মায়ের ব্যথিত মানসিকতা। বাপের বাড়ি থেকে কন্যা স্বামীর বাড়ি চলে গেলে এই দেহ এই জীবন তার মা কী করে রাখবে? তার কন্যারত্নের আলোয় আলোকিত এই ভবন আজ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। এ তো সব মায়েরই কথা, একই ভাবনা। কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের গান, ‘রতন ভবন মোর, আজি হৈলো অন্ধকার, ইথে কি রহিবে দেহে/ এছার জীবন।’
দীনেশচন্দ্র সেন এই গান সম্পর্কে চমৎকার বলেছেন ‘বাংলার কুটিরের বালিকা-দুহিতাদের স্বামীগৃহে যাওয়ার পর মাতৃহৃদয়ের হাহাকারকে করুণরসের উৎস করিয়া যে সকল আগমনী গান পল্লীতে পল্লীতে প্রবাহিত হইয়া গিয়াছে— সেই আগমনী গানের আদি গঙ্গা প্রসাদসঙ্গীত। আশ্বিন মাসের ঝরা শিউলিফুলের মত এই যে মাতৃ মিলনের প্রত্যাশায় বালিকাবধূদের চক্ষুজল দিনরাত্রি ঝরিত, এই সকল আগমনী গান সেই অশ্রু রচিত হার, ইহা তৎকালিক বঙ্গজীবনের জীবন্ত বিচ্ছেদরসে পুষ্ট।’
দুর্গাপুজোয় মা আসছেন। উমা-সংগীতে যিনি স্নেহের পুতুলরূপী ঘরের কন্যারূপে বন্দিতা হন, তিনিই আবার শ্যামাসংগীতে স্নেহময়ী জননী রূপে প্রতিভাত হয়েছেন। আদ্যাশক্তি সনাতনী রূপে সাধক কবিদের চোখে মাতৃরূপ লাভ করেছেন। তিনি তখন স্নেহময়ী।
একটি আগমনি গানে রয়েছে ‘আমি কি হেরিলাম নিশি-স্বপনে/ গিরিরাজ, অচেতনে কত না ঘুমাও হে।।/ এই এখনি শিয়রে ছিল, গৌরী আমার কোথা গেল হে,/আধ আধ মা বলিয়ে বিধুবদনে!’ কমলাকান্তের পদ বুঝিয়ে দেয় মা মেনকা তাঁর কন্যা সম্পর্কে কতটা সচেতন। গিরিরাজ হিমালয় ঘুমিয়ে আছেন। কিন্তু মা মেনকা রাতে স্বপ্ন দেখছেন যে তাঁর শিয়রে কন্যা গৌরী ছিল। এই মুহূর্তে সে যে কোথায় চলে গিয়েছে, আধো আধো স্বরে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করছে ‘মা’। যা মা মেনকাকে কষ্ট দিচ্ছে। আবার কন্যাকে দেখার জন্য হৃদয়ের যে আকুলতা তা পাই কমলাকান্তের পদে। ‘কবে যাবে বল গিরিরাজ, গৌরীরে আনিতে।/ ব্যাকুল হৈয়েছে প্রাণ উমারে দেখিতে,হে।’ পিতা-মাতার সঙ্গে কন্যার যে সম্পর্ক তার একটা চিরকালীন অদ্ভুত রূপ এই কবিতা গুলির মধ্যে আছে। কালীনাথ রায়ের একটি পদ পাচ্ছি। সেখানে তিনি লিখছেন, ‘চল মা, চল মা গৌরী, গিরিপুরী শূন্যাগার।/ মা হলে জানিতে উমা, মমতা পিতা-মাতার।।’ কন্যাসন্তান শ্বশুরবাড়িতে থাকলে মা বাবার চিন্তা হয়। তার মনের মধ্যে যে আকুলতা থাকে তা এইসব ভাবনার মধ্যে আছে। উমা যদি মা হত তাহলে জানতে পারত দীর্ঘদিন কন্যার অদর্শনে পিতা মাতার কতটা কষ্ট হয়। ‘যাও যাও গিরি, আনিতে গৌরী, উমা নাকি বড় কেঁদেছে।’ অজ্ঞাত পদকর্তার লেখা গানও মাতৃভাবের অদৃশ্য কষ্টকেই প্রকাশ করে। উমা আমার ঘরের মেয়ে এই ভাবনারই বহিঃপ্রকাশ প্রতিটি পদে।
আমাদের বাড়ির মেয়ে যখন শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার ঘরে ফেরে মনে হয় তাকে এত তাড়াতাড়ি শ্বশুরবাড়িতে ফিরতে দেব না। গিরিশচন্দ্র ঘোষ চমৎকার লিখছেন, ‘বোঝাব মায়ের ব্যথা, গণেশকে তোর আটকে রেখে।/ মায়ের প্রাণে বাজে কেমন, জানবি তখন আপনি ঠেকে।।’ উমা ঘরে ফিরলে মনে হয় আঁধার কেটে চারিদিক আলোয় ভরেছে। দেবীকে বন্দনা করে বলব, ‘গিরি, এবার আমার উমা এলে আর উমা পাঠাব না।’



