Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

সুরথেশ্বর মন্দির সংস্কারে খননে গিয়ে মিলল পালযুগীয় উমা-মহেশ্বরের ২টি মূল্যবান মূর্তি

বোলপুরের শিবপুর মৌজার সুরথেশ্বর শিব মন্দিরের গর্ভগৃহ সংস্কার করতে গিয়ে খননে মিলল উমা-মহেশ্বরের দু’টি মূল্যবান মূর্তি

সুরথেশ্বর মন্দির সংস্কারে খননে গিয়ে মিলল পালযুগীয় উমা-মহেশ্বরের ২টি মূল্যবান মূর্তি
  • ২১ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সংবাদদাতা, বোলপুর: বোলপুরের শিবপুর মৌজার সুরথেশ্বর শিব মন্দিরের গর্ভগৃহ সংস্কার করতে গিয়ে খননে মিলল উমা-মহেশ্বরের দু’টি মূল্যবান মূর্তি। মূর্তিগুলি পালযুগের বলে জানা গিয়েছে। শহরের অন্যতম প্রাচীন ধর্মস্থল থেকে ঐতিহাসিক মূর্তি দু’টি উদ্ধারের ঘটনায় এলাকায় প্রবল উন্মাদনার সৃষ্টি হয়েছে। মূর্তিগুলি দেখার জন্য ইতিমধ্যেই মন্দিরে পুণ্যার্থীদের ভিড় উপচে পড়েছে। শ্রাবণ মাসের প্রথম সোমবারের আগে রবিবার সেই মূর্তিগুলির অভিষেক করে মহাসমারোহে পুজো করেন মন্দির কমিটির সদস্যরা।

Advertisement

ইতিহাস থেকে জানা গিয়েছে, বর্তমান মন্দিরটি আগে জৈনদের তীর্থস্থান ছিল। পরবর্তীতে তাদের প্রভাব কমলে রাজা সুরথ সেখানে শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। সুরথেশ্বর মন্দিরের দক্ষিণদিকের জঙ্গলে ছিল শিবাক্ষাতলা। রাজা সেখানে দুর্গার আরাধনা করতেন। ‌দেবীকে সন্তুষ্ট করতে তিনি নির্দিষ্ট সন্ধিক্ষণে লক্ষ মোষের বলি দিয়েছিলেন। এই বলির কারণে পরবর্তীতে এলাকার নাম হয় ‘বলিপুর’। যা বর্তমানে বোলপুর নামে পরিচিত। এরপর পালযুগের রাজারাও এখানে রাজত্ব করেন। ঐতিহাসিকভাবে এই মন্দিরের গুরুত্ব থাকলেও বাম আমলে যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। তবে, বোলপুর ও রায়পুর এলাকার কিছু মানুষের আন্তরিক প্রয়াসে এই মন্দিরকে ঢেলে সাজানো হয়।
প্রতিবছর শ্রাবণ মাসে ভক্তদের ভিড় উপচে পড়ে এই মন্দিরে। সম্প্রতি মন্দিরের গর্ভগৃহে জল ঢালার কুণ্ড সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর সেখানে খনন করতে গিয়েই মূর্তি দু’টি উদ্ধার হয়। স্থানীয় ইতিহাসবিদদের কাছে মূর্তিগুলির ঐতিহাসিক গুরুত্ব জানতে পেরে উচ্ছ্বসিত মন্দির কমিটির সদস্যরা। পরবর্তীতে সেগুলি পরিষ্কার করে মন্দিরেই রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, মূর্তিগুলি একাদশ থেকে চতুর্দশ শতকের, অর্থাৎ পালযুগের। সে যুগের শিল্পনৈপুণ্যের অনন্য নিদর্শন ফুটে উঠেছে মূর্তিতে। উমা-মহেশ্বর মূর্তির গঠন ও অলঙ্করণ বিশ্লেষণ করে গবেষকরা মনে করছেন, এগুলি কালো পাথরে খোদাই করা। যা বিশেষভাবে বীরভূম জেলার আদি শিল্পধারার প্রতিফলন। ওই সময়কালে বীরভূমের মুরারই থানার বারা গ্রাম কালো পাথরের মূর্তি খোদাইয়ের জন্য বিখ্যাত ছিল। এমন শিল্পগুণ ও প্রাচীনত্বের কারণে এই মূর্তিগুলির ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম। অনেকের মতে, প্রতিটির মূল্য কোটি টাকার বেশি হতে পারে। যদিও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এগুলি এখনও যাচাই করেনি বলে জানা গিয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, শিব ও দুর্গার মূর্তি বিভিন্ন নামে পরিচিত। জগতের রক্ষাকর্তা হিসেবে শিব ও পার্বতীর যে মূর্তি রয়েছে, তা সাধারণত ‘হর-পার্বতী’ বলে পরিচিত। অর্থাৎ, সেই মূর্তিতে ‘যুদ্ধং দেহি’ মনোভাব ফুটে ওঠে। একেবারেই সংসারী, ঘরোয়া ও প্রেমের দিকটি শিব-পার্বতীর যে মূর্তিতে ফুটে ওঠে, তা সাধারণত উমা-মহেশ্বর নামে পরিচিত। সুরথেশ্বরে পাওয়া মূর্তিগুলিতে দেখা যাচ্ছে, দেবী উমার থুতনি ধরে রয়েছেন মহেশ্বর। যা প্রেমেরই প্রতীক। স্বভাবতই খননে এই ধরনের মূর্তি আবিষ্কৃত হওয়ায় সুরথেশ্বর মন্দিরের গুরুত্ব আরও বাড়ল।
স্থানীয় ইতিহাসবিদ মানস ভট্টাচার্য বলেন, গোটা বোলপুরের জন্য এটি এক ঐতিহাসিক আবিষ্কার। এমন মূর্তি বহুযুগ পর খুঁজে পাওয়া গেল। এতে বীরভূমের ঐতিহাসিক কদর আরও বাড়বে। সুরথেশ্বর শিব মন্দির তত্ত্বাবধায়ক কমিটির সভাপতি দীনবন্ধু সিংহ বলেন, মূর্তিগুলি মন্দিরেই সংরক্ষিত থাকবে। আগত দর্শনার্থীদের জন্য তা দর্শনের ব্যবস্থা করা হবে। ইতিমধ্যে প্রত্নতত্ত্ব দপ্তরের আধিকারিকদের তা জানানো হয়েছে। মন্দিরের নিরাপত্তা বাড়ানোর বিষয়ে প্রশাসন ও পুলিসকে জানানো হবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ