সম্প্রতি বিরল দৃশ্যের সাক্ষী ছিল রাশিয়া। আকাশে জ্বলজ্বল করছে দু’টি সূর্য! এর নেপথ্য কারণ জানালেন শান্তনু দত্ত
সম্প্রতি বিরল দৃশ্যের সাক্ষী ছিল রাশিয়া। আকাশে জ্বলজ্বল করছে দু’টি সূর্য! এর নেপথ্য কারণ জানালেন শান্তনু দত্ত
‘‘সুয্যি মামা জাগার আগে
উঠব আমি জেগে।
‘হয়নি সকাল, ঘুমোও এখন,’
মা বলবেন রেগে।’’
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় ‘সকাল বেলার পাখি’ হতে চেয়েছিল শিশুটি। মায়ের ধমকে তা সম্ভব হয়নি। তাই সুয্যি মামার আগে ঘুম থেকে উঠে পড়াও যায়নি। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে যদি দেখা যায়, একটা নয়, দু’-দুটো সূর্য জ্বলজ্বল করছে আকাশে? নিশ্চয়ই ভাবছ, ধুত! তা আবার হয় নাকি? আলবাত হয়। সম্প্রতি রাশিয়ায় একই সময় পাশাপাশি দু’টি সূর্য দেখা গিয়েছে। কীভাবে? এর নেপথ্যে রয়েছে এক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
তোমরা সকলেই জানো, সৌরমণ্ডলে মাত্র একটি নক্ষত্র রয়েছে। তার নাম সূর্য। সূর্যকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীসহ সব গ্রহ, উপগ্রহ, গ্রহাণু ও ধূমকেতু আবর্তিত হয়। কয়েকদিন আগে রাশিয়ার সাখালিন দ্বীপের বাসিন্দারা আকাশে দু’টি সূর্যের দেখা পেয়েছেন। এমন বিরল ও বিস্ময়কর মহাজাগতিক দৃশ্যে অবাক হয়ে যান তাঁরা। বিজ্ঞান বলে, এটি একটি বিরল প্রাকৃতিক বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনা। আসল সূর্যের পাশে যে উজ্জ্বল আলো দেখা গিয়েছে সেটি দৃষ্টিভ্রম বা অপটিক্যাল ইলিউশন। এই অপটিক্যাল ইলিউশনের জন্যই মরুভূমিতে পথিক ভুল করে মনে করেন সামনে মরূদ্যান মানে জল আছে। মরুভূমিতে বালি খুব গরম হলেও উপরের বাতাস ঠান্ডা থাকে, অথচ নীচের দিকের বায়ু গরম হয়। তাপের ভিন্নতার কারণে আলো বেঁকে যায়। একে আলোর অভ্যন্তরীণ পূর্ণ প্রতিফলন বলে। তাই দূরের আকাশের আলো মাটিতে জলের মতো কাঁপে— এটা দেখেই পথিক মরূদ্যান বলে ভুল করেন। এমনই এক ইলিউশন বা ভ্রমের কারণে দু’টি সূর্যের দেখা মিলেছে। একে বলা হয় ‘সান ডগ’ বা প্যারহিলিয়ন।
খুব ঠান্ডা জায়গায় আকাশে অনেক উঁচুতে পাতলা মেঘ থাকে। এগুলির ভিতরে থাকে বরফের অসংখ্য ছোটো ছোটো কণা। কণাগুলি ক্ষুদ্র হলেও তাদের আকৃতি ছয় কোনা আয়না বা প্রিজমের মতো। সূর্যের আলো এই বরফের কণার ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় সোজা পথে চলতে পারে না। বেঁকে যায়। ঘটে প্রতিসরণ। সেই প্রতিসারিত রশ্মি প্রতিফলিত হয় সাদা মেঘের মধ্যে। এর ফলে তৈরি হয় এক বা একাধিক নকল সূর্য। দেখা যায় উজ্জ্বল আলোর বলয়।
সাধারণত ভীষণ ঠান্ডা এলাকায় সান ডগ তৈরি হয়। সেখানে বরফের কণা সহজেই তৈরি হয়। শীতকালের সকালে বা বিকেলের সময়, যখন সূর্য একটু নীচের দিকে থাকে, তখন সান ডগ দেখার সুযোগ বেশি হয়। অনেক সময় এই আলোগুলির মধ্যে হালকা লাল, হলুদ বা নীল রংও দেখা যায়। বরফের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় আলোর বিচ্ছুরণের জন্যই ঘটে এমন ঘটনা। ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা আকাশে যে রামধনু দেখ, তার নেপথ্যেও অনেকটা এধরনের বৈজ্ঞানিক ক্রিয়াই কাজ করে। সেখানে প্রিজমের কাজ করে বৃষ্টির ফোঁটা। রাশিয়ার সাখালিন দ্বীপে যখন সান ডগ দেখা গিয়েছে, তখন সেখানকার তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পরে তা আরও কমে মাইনাস ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। এমন শীতই সান ডগ তৈরির জন্য আদর্শ।
তবে এমন দৃশ্যের নাম সান ডগ কেন? অনেক বছর আগে মানুষ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জানত না। তাঁরা ভাবতেন, সূর্যের পাশে যে আলোক বলয় দেখা যাচ্ছে, সেগুলি সূর্যের সঙ্গে থাকা সঙ্গী বা কুকুর। এই ভাবনা থেকেই নাম হয় সান ডগ। বিজ্ঞান না থাকলেও মানুষ প্রকৃতির এই দৃশ্য দেখে কল্পনার গল্প বানিয়েছিলেন। সেই গল্পগুলি আজও লোকমুখে প্রচলিত।
আরও একটি মজার প্রাকৃতিক ঘটনার কথা বলা যাক। সামনেই গ্রীষ্ম আসছে। নরওয়ের মতো দেশে এই সময় রাতেও সূর্য দেখা যায়। সেই জন্য নরওয়েকে বলা হয় নিশীথ সূর্যের দেশ। কেবল নরওয়ে নয়। সুইডেন, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও রাশিয়ার কিছু অংশেও এই ঘটনা দেখা যায়। অবাক হলে? নিশ্চয়ই ভাবছ কেন এমন হয়? এর নেপথ্যেও রয়েছে বিজ্ঞান। নরওয়ের উত্তরাংশ সুমেরু বৃত্ত বা আর্কটিক সার্কেলের মধ্যে অবস্থিত। সুমেরু বৃত্তের উত্তর দিকে অবস্থিত স্থানগুলিতে গ্রীষ্মকালে সূর্য পুরোপুরি অস্ত যায় না। বিশেষ করে মে মাসের শেষ থেকে জুলাই মাসের শেষ পর্যন্ত, ২৪ ঘণ্টা ধরে আকাশে সূর্যের দেখা মেলে। এসময়ে সূর্য দিগন্তের নীচে নামে না, তাই রাতও হয় না। কেন এমন হয়? আসলে পৃথিবী কক্ষতলের সঙ্গে সাড়ে ৬৬ ডিগ্রি কোণে হেলে থাকা অবস্থায় নিজের অক্ষের চারপাশে পাক খেতে খেতে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। এই হেলে থাকার কারণে গ্রীষ্মকালে উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে। ফলে সুমেরু বৃত্ত থেকে সুমেরু বিন্দু পর্যন্ত সূর্য সম্পূর্ণরূপে অস্ত যায় না। এর জন্যই দেখা মেলে নিশীথ সূর্যের। দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকালেও একই ঘটনা ঘটে।