Bartaman Logo
৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

আদিম মানুষদের ডাক্তার

আধুনিক মানুষের বৈজ্ঞানিক নাম হোমো স্যাপিয়েন্স। আমরা সাধারণত মনে করি যে, আমরাই পৃথিবীর একমাত্র মনুষ্য প্রজাতি। কারণ ১০-১২ হাজার বছর ধরে কেবলমাত্র আমাদের প্রজাতিই পৃথিবীতে বিচরণ করেছে।

আদিম মানুষদের ডাক্তার
  • ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্বরূপ কুলভী: আধুনিক মানুষের বৈজ্ঞানিক নাম হোমো স্যাপিয়েন্স। আমরা সাধারণত মনে করি যে, আমরাই পৃথিবীর একমাত্র মনুষ্য প্রজাতি। কারণ ১০-১২ হাজার বছর ধরে কেবলমাত্র আমাদের প্রজাতিই পৃথিবীতে বিচরণ করেছে। যদিও ‘মানব’ শব্দের সত্যিকারের অর্থ হল গণের অন্তর্গত প্রাণী। পূর্ব আফ্রিকা থেকে এদের যাত্রা শুরু। হোমো সেপিয়েন্স ছাড়াও ওই গণের অন্যান্য প্রজাতির প্রাণীও একসময় পৃথিবীতে ছিল। তাদের মধ্যে অন্যতম নিয়ান্ডারথাল। আদি মানবদের একটি দল ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। বহু বছরের বিবর্তনের জেরে তারা নিয়ান্ডারথাল মানব নামে পরিচিতি লাভ করে। ইউরেশিয়া অঞ্চলে তুষারযুগের পরিবেশে তারা বেশ ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পেরেছিল। আধুনিক মানুষের তুলনায় ওদের চেহারা ছিল বেশ বড়োসড়ো ও পেশিবহুল। নিয়ান্ডারথালদের পাশাপাশি স্যাপিয়েন্সরাও ছিল। একই সময়ে একই এলাকায় তাদের বসবাস ছিল। তাদের মধ্যে মেলামেশাও ছিল। ২৪ হাজার বছর আগে এই প্রজাতি বিলুপ্ত হয় বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। স্যাপিয়েন্স শব্দের অর্থ বুদ্ধিমান বা জ্ঞানী। তাহলে কি নিয়ান্ডারথাল সহ অন্যান্য প্রজাতির আদিম মানুষ কি বুদ্ধিমান ছিল না? সুপ্রাচীন যুগের প্রতিকূল পরিবেশে তারা কি তাদের বুদ্ধিমত্তা খাটাত না? উত্তর হল শুধু স্যাপিয়েন্সকে বুদ্ধিমান ভাবলে অবিচার হবে। অন্যান্য মানব প্রজাতির মানুষ ছিল যথেষ্ট বুদ্ধিমান। পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের  মানিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে দিব্যি বেঁচেবর্তে ছিল তারা। একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে গবেষণা বিজ্ঞানীদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে। আধুনিক মানুষের নিকটাত্মীয় নিয়ান্ডারথালরা চিকিৎসা করতেও জানত! তারা দাঁতের রোগও সারাত! তখন তো আর এখনকার মতো চিকিৎসার সরঞ্জাম ছিল না। তাহলে কীভাবে এই কাজ করত তারা? বিজ্ঞানীদের ধারণা, পাথরের হাতিয়ার দিয়েই রোগ সারাতে দাঁতে গর্ত খোঁড়া হয়েছিল। তাও প্রায় ৬০ হাজার বছর আগে। দাঁতের চিকিৎসার এটাই সর্বপ্রাচীন তথ্য বলে মনে করা হচ্ছে। কয়েকমাস আগে প্লোস ওয়ান নামে জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিষয়টি সম্পর্কে জানানো হয়েছে। দক্ষিণ রাশিয়ার চাগিরস্কায়া গুহায় বসবাসকারী নিয়ান্ডারথালরা পাথরের হাতিয়ার দিয়ে দাঁতে গর্ত করে সংক্রমিত অংশ সরিয়ে ফেলেছিল। তীব্র ব্যথা ও সংক্রমণ থেকে বাঁচতে সূক্ষ্ম ও ছুঁচালো পাথরের হাতিয়ার দিয়ে দাঁতে ড্রিল করেছিল তারা। 

Advertisement

রাশিয়ান অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজির গবেষকরা চাগিরস্কায়া গুহায় নিয়মমাফিক খনন কাজ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। ওই গুহায় বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে। তারমধ্যে রয়েছে মানুষ ও নিয়ান্ডারথালদের জীবাশ্ম, পাথর ও হাড়ের হাতিয়ার। সংখ্যাটা প্রায় ৯০ হাজার। সেখানে গবেষক দলের নজর পড়ে একটি চোয়ালের দাঁতের উপর। ওই দাঁত কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নিয়ান্ডারথালের। ওই দাঁতে যেরকম ক্ষত ছিল, তা অন্য কোনো নিয়ান্ডারথালের দাঁতে এর আগে দেখা যায়নি। এই বিষয়টিই তাঁদের আগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাঁরা ওই ক্ষত আণুবীক্ষণিক যন্ত্র ও সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখেন। ওই ক্ষত স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য। এই পরীক্ষার ফল রীতিমতো অবাক করে দেয় গবেষকদের। দেখা যায়, দাঁতের এই গর্ত মোটেই স্বাভাবিক নয়। বরং কোনো সূক্ষ্ম ও তীক্ষ্ণ হাতিয়ার দাঁতের ভিতর বারবার ঘুরিয়ে গর্তটি তৈরি করা হয়েছে। এরপর মাইক্রো সিটি-স্ক্যান করে গবেষকরা জানতে পারেন, যার দাঁতে এইভাবে গর্ত করা হয়েছিল, সে জীবিত ছিল। এর একটাই অর্থ হতে পারে। তাহলে অসুখে আক্রান্ত ব্যক্তির দাঁতে একেবারে পরিকল্পনামাফিক সার্জারি করা হয়েছিল। সংক্রমিত অংশটি তুলে ফেলতেই তা করা হয়েছিল। তখন এখনকার মতো দাঁত অসাড় করার পদ্ধতি নিয়ান্ডারথালরা জানত না। ফলে নিয়ান্ডারথালদের ‘দন্ত চিকিৎসকে’র এই কাজের সময় রোগীকে যে প্রচণ্ড রকমের যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। গবেষকরা বলেছেন, নিয়ান্ডারথালরা যে দাঁতে আটকে থাকা খাবার বের করতে টুথপিকের মতো জিনিস ব্যবহার করত, ওষুধি গুণযুক্ত পপলার গাছের ছাল ব্যবহার করত, তা এখনও পর্যন্ত প্রাপ্ত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে জানা ছিল। কিন্তু দাঁতে গর্ত খুঁড়ে এধরনের চিকিৎসার নজির এর আগে পাওয়া যায়নি। আর এধরনের কাজের জন্য অত্যন্ত দক্ষতা ও পরিকল্পনার প্রয়োজন। তা নিয়ান্ডারথালদের ছিল বলেই জানিয়েছেন গবেষকরা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ