Bartaman Logo
৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

চিরনায়ক

অন্ধভক্ত কাকে বলে জানেন? উত্তমদার জন্য আমি ছিলাম সেটাই। কলেজের ক্লাস বাঙ্ক করে কতবার যে ওঁর সিনেমা দেখতে গিয়েছি, ইয়ত্তা নেই

চিরনায়ক
  • ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

আমার অভিনয়ের পাঠশালা

Advertisement

রঞ্জিত মল্লিক: অন্ধভক্ত কাকে বলে জানেন? উত্তমদার জন্য আমি ছিলাম সেটাই। কলেজের ক্লাস বাঙ্ক করে কতবার যে ওঁর সিনেমা দেখতে গিয়েছি, ইয়ত্তা নেই। আমি ভবানীপুরের ছেলে। সাউথ ক্লাবে উত্তমকুমার মাঝেমধ্যেই টেনিস খেলতে আসতেন। প্রায়ই সন্ধ্যায় ওখানে গিয়ে হত্যে দিতাম। দূর থেকে দু’বার দেখেছি উত্তমদাকে। একবার একটা ছবির কাজে উত্তমকুমারের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন এক পরিচালক। সেটা ’৭৪-এর আগে। ছবিটা পরে হয়নি। তবে যে স্মৃতিটা এখনও মনে জ্বলজ্বল করে, সেটা ‘মৌচাক’-এর সেটের। অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনা। উত্তমকুমারের সঙ্গে আমার প্রথম কাজ। একসঙ্গে সিন। যাঁকে পর্দায় দেখতাম, তাঁর সামনে সংলাপ বলব, এটা ভেবে প্রথমে টেনশন হচ্ছিল। তবে সেটে গিয়ে দেখলাম, সত্যিই যেন নিজের দাদা। আসলে মানুষটাই ছিলেন ওরকম। সহ অভিনেতাদের কখনো বুঝতে দিতেন না, উনি উত্তমকুমার। ‘মহানায়ক’ হিসাবে কবে থেকে ওঁকে ডাকা শুরু হল, জানা নেই। তবে সেট থেকে বেরলেই শুরু হত ‘গুরু’, ‘গুরু’ বলে চিল-চিৎকার।
উত্তমদার সঙ্গে পার্ট করলে আলাদা করে আর অভিনয়ের স্কুলে যাওয়ার প্রয়োজন হত না। ‘মৌচাক’-এর একটা ঘটনা বলি, উত্তমদা আর সাবিত্রীদির সঙ্গে আমার সিন। তারপরই উত্তমকুমারের অন্য একটি দৃশ্য ছিল। সেখানে আমি নেই। অরবিন্দদা বললেন, ‘মেকআপ রুমে গিয়ে রেস্ট নাও। এখন আর শট নেই।’ আমি কিন্তু যাইনি। দাঁড়িয়েছিলাম ফ্লোরেই। অবাক হয়ে সেদিন দেখলাম, কী দ্রুত এক্সপ্রেশন পরিবর্তন করলেন! তারপর থেকে উত্তমদার সঙ্গে যেক’টি ছবি করেছি, শট না থাকলেও সবসময় ফ্লোরেই থাকতাম। কতকিছু যে শিখেছি এভাবে। এমন পাঠশালা আর কোথায় পাব? এভাবে ফ্লোরে দাঁড়িয়ে থাকায় মাঝেমাঝে বিব্রতও হতে হয়েছে। শট শেষে উনি জিজ্ঞাসা করতেন, পাঠ ঠিক ছিল কি না! জবাব খুঁজে পেতাম না। কীভাবে বলতাম, ওই অভিনয় দেখেই তো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি! ওঁর সঙ্গে যা কথা হতো তা শ্যুটিং শুরুর আগে। মেকআপ নিয়ে চরিত্রের মধ্যে ঢুকে গেলে ওঁর নাগাল পাওয়া মুশকিল ছিল। দেখতাম, শটের ফাঁকে চেয়ার বা বেঞ্চ নিয়ে উলটো দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে রয়েছেন। কারণটা জেনেছিলাম সেট থেকেই। আসলে কোনো চেনা মানুষের চোখে চোখ পড়ে গেলে মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটতে পারে, তাই ওভাবে বসে থাকা! কী ডেডিকেশন। সিনেমার শ্যুটিং তো থিয়েটারের মতো একটার পর আরেকটা দৃশ্য হয় না। সেট অনুযায়ী হয়। সেজন্য সম্পূর্ণ গল্পটি মাথায় রাখতেন। দৃশ্য অনুযায়ী ওঁর চরিত্র কী করছে, কী সংলাপ, কার কার সঙ্গে সিন, কোন ঘটনা ইতিমধ্যে হয়ে গিয়েছে... সব দেখতেন ভালো করে। বারবার রিহার্সাল করতেন। তবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতেন। সেটে গল্প করা একদম পছন্দ করতেন না। শট হয়ে গেলে চলে যেতেন মেকআপ রুমে। 
অভিনেতা হিসাবে কেমন ছিলেন, এ তো আলাদা করে বলার কিছু নেই। পাঠক-দর্শক তা জানেন। আমি ভাগ্যবান, মানুষ হিসাবে ওঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি।  তবে মানুষটাকে এত কম পাওয়ার আক্ষেপ আমার জীবনে থেকে যাবে চিরকাল। ‘ওগো বধূ সুন্দরী’র সেটে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমি ছিলাম ওঁর শ্যালকের চরিত্রে। সলিল দত্তর পরিচালনায় টেকনিশিয়নাস’ স্টুডিয়োতে সেট তৈরি হয়েছিল। ১৯৮০ সাল। ২১ জুলাই ওঁর সঙ্গে আমার সিন ছিল। কে জানত, ওটাই হবে উত্তমদার সঙ্গে আমার শেষ শট। আসলে ১৯৬৭ সালে প্রথম হার্ট অ্যাটাকের পর থেকেই উত্তমদা খানিক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সে কারণে সলিলদা বিশ্রাম দিয়েই শ্যুটিং করাতেন। ২৩ জুলাই কাঁধে তোয়ালে নিয়ে উত্তমদার সেটের সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামার দৃশ্যটা ছিল। ওই দৃশ্যটা করতে গিয়েই ধকল হয়ে গিয়েছিল। সিঁড়িগুলি উঁচু ছিল বলেই বোধহয়। তা সত্ত্বেও পারফেক্ট শট না দিয়ে ছাড়েননি। তারপর বাড়িতে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ভরতি করা হয় নার্সিংহোমে। আমাকে খবরটা দেন মামাজি অর্থাৎ সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়ের স্বামী প্রযোজক রবীন্দ্রনাথ মালহোত্রা। পরদিন সকালেই ওঁর ভবানীপুরের বাড়িতে ছুটেছিলাম। রাতেই শুনলাম, উত্তমদা আর নেই! ইন্ডাস্ট্রিকে উনি যেভাবে আগলে রেখেছিলেন, তা আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। ওঁর মতো নায়ক এই ১০০ বছরে আর এল না। আসবেও না। মহানায়ক হিসাবে ওঁর পরিচয় সকলেই জানে। কিন্তু আমার কাছে উত্তম কুমারের আরও একটি পরিচয় আছে—তিনি ছিলেন অসাধারণ মানুষ। আর সেই মানুষটিকেই আজও সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।

সারাজীবনের সম্পদ

লিলি চক্রবর্তী: ‘বউঠান, বেণু রান্না করে পাঠিয়েছে। খাবে এসো’... মাঝেমধ্যেই  দুপুরে এভাবে ডাকতেন উত্তমদা।‘দেয়া নেয়া’র সেট থেকেই সম্পর্কটা তৈরি হয়েছিল। ওই ছবিতে আমি বুড়োদার (তরুণ কুমার) বউ। উত্তমদা ‘বউঠান’ বলে ডাকতে শুরু করেন তখন থেকেই। আজীবন সেই ডাকটাই থেকে গিয়েছে। এমনকী, ‘ভোলা ময়রা’ ছবির সেটেও। ওই ছবিতে কিন্তু আমি ওঁর স্ত্রী। এখন এসব ভাবলেই হাসি পায়। আমাদের প্রথম দেখা ‘বিপাশা’ ছবির সেটে। আমার অবশ্য যাবতীয় সিন ছিল সুচিত্রা সেনের সঙ্গে। তবে দেখা হয়েছিল ফ্লোরে। কী হ্যান্ডসাম ছিলেন উত্তমদা! আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন পরিচালক। উনি বলেছিলেন, ‘তুমি তো নতুন এসেছ। মন দিয়ে কাজ করো।’ ওঁর এই আশীর্বাদ আমার সারাজীবনের সম্পদ। উত্তমদার সঙ্গে যাঁরা সিন করেছেন, তাঁরা জানেন উনি কতবার রিহার্স করতেন এক-একটা দৃশ্য। ‘দেয়া নেয়া’র সময় পারফেকশন কাকে বলে ওঁর থেকে শিখেছিলাম। আমি তো স্টেজ আর্টিস্ট। মাঝে মাঝে ইম্প্রোভাইজও করতাম। উনি সাহস জোগাতেন। বলতেন, ‘ভয় পেয়ো না। ঘাবড়ে যাবে না।’ 
উত্তমদার সঙ্গে বেশ কয়েকটি ছবিতে কাজ করেছি। ‘দুই পুরুষ’, ‘দেবদাস’। তবে বিপরীতে কাজ করার সুযোগ পেলাম ‘ভোলা ময়রা’য়। ছবিটি প্রযোজনাও করেছিলেন উনি। আমি তখন মুম্বইয়ে, ডাক পেয়ে চলে এসেছিলাম। শ্যুটিংয়ে একটা মজার কাণ্ড করেছিলাম। হয়েছিল কী, ইন্দ্রপুরী স্টুডিয়োতে একদিন দুপুরবেলায় লাইটের কাজ চলছে। আমি আর বেণুদি গল্প করছি। গল্প করতে করতেই বললেন, ‘পান খাবি?’ আমি সদ্য পান খেতে শিখেছি। বেণুদিকে দেখে আমি আবার আলাদা করে জর্দা নিলাম। আগে থেকেই যে ওটা দেওয়া ছিল জানতাম না। ব্যস, শরীর খারাপ করতে শুরু করল। কিছু দূরেই উত্তমদা বসে ডিরেক্টরের সঙ্গে আলোচনা করছেন। আমি ভাবছি, উনি জানতে পারলে তো কেলেঙ্কারি! সঙ্গে সঙ্গে গলায় আঙুল দিয়ে সবটা ফেলে দিলাম। তাও শরীর ঠিক হয় না। বেণুদি কাঁধে ভর দিয়ে নিয়ে গেল একটা সোফার সামনে। সেটাতেই শুয়ে পড়লাম। উত্তমদা ততক্ষণে সব জেনে ফেলেছেন। ‘সহ্য হয় না যখন খাও কেন?’ বলে চলে গেলেন। আমার তো মাথা লজ্জায় কাটা যাওয়ার মতো অবস্থা। ঘুম থেকে উঠে দেখি বিকাল হয়ে গিয়েছে। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। কী করব ভাবছি এমন সময় প্রোডাকশন ম্যানেজার এসে বললেন, ‘আপনি উঠেছেন! দাদা বলে গিয়েছেন, আপনার খাবার রেখে দিতে। আপনি সুস্থ হলে যেন গরম করে দিই।’ ওঁর যে সবদিকে নজর থাকত, সেটা বুঝেছিলাম ওইদিন। মনটা বিরাট বড়ো ছিল। স্টুডিয়োর বাইরে গাড়ি থেকে নেমে পড়তেন। টেকনিশিয়ানরা দেখেই ছুট্টে যেত ‘দাদা’ বলে। সকলের সঙ্গে গল্প জমাতেন। কার কী অসুবিধা জানতে চাইতেন। তেমন মনে হলে ম্যানেজারের হাত দিয়ে টাকা পাঠিয়ে দিতেন। প্রতিটা সিন হয়ে যাওয়ার পর জনে জনে জিজ্ঞাসা করতেন, ঠিক আছে কি না। টেকনিশিয়ানরা ঘাবড়ে গিয়ে বলতেন, ‘আমরা কী বলব?’ তখন হেসে বলতেন, ‘তোরাই তো বলবি। তোদের ভালো না লাগলে দর্শকের ভালো লাগবে কেন?’ আমাকেও কতবার এসে এসে জিজ্ঞাসা করতেন... ‘কেমন হয়েছে?’ সত্যিই মানুষটি অদ্বিতীয়। একশো বছর পরেও। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ