চন্দন চক্রবর্তী: সকালবেলাতেই যে এমন কাণ্ড হবে কে জানত? হঠাৎ কালো গাইয়ের পেটের মতো মেঘ কালো হয়ে গুম গুম ডাক ছাড়ল। তারপরেই টেনে বৃষ্টি।
চন্দন চক্রবর্তী: সকালবেলাতেই যে এমন কাণ্ড হবে কে জানত? হঠাৎ কালো গাইয়ের পেটের মতো মেঘ কালো হয়ে গুম গুম ডাক ছাড়ল। তারপরেই টেনে বৃষ্টি।
যাইহোক কাকভেজা হয়ে বাড়ি ফিরলাম। বাজারের ব্যাগটা ভিজে জবজবে। ব্যাগের ভেতর মরা তেলাপিয়া মরার পরও জল পেল। গিন্নি দরজা খুলেই কাকভেজা লোকটিকে দেখেই ক্যা ক্যা করে উঠল। যদিও আমার হাতে নতুন ছাতা ছিল। তা দেখে আরও অবাক! বৃষ্টি আসবে বলে কোনো চিঠিপত্তরও দেয়নি। মোবাইলেও ম্যাসেজ করেনি। তাই ছাতা নিইনি। তাছাড়া খুব ছাতা হারাই বলে ছাতা নিই না।
মাথাটাথা মুছে পোশাক পরিবর্তন করে সোফায় বসলাম। হঠাৎ মনে পড়তে, রান্নাঘরে উঁকি মেরে গিন্নিকে বললাম, ওর মধ্যে কালো প্লাস্টিকের প্যাকেটে একদম টাটকা ছাড়ানো মোচা আছে।
—টাটকা! কী করে বুঝলে? তুমি কি কলাগাছে উঠে পেড়ে এনেছ?
—আমি উঠতে যাব কেন? ছাতা বুড়ি কাউকে উঠিয়েছিল গাছে। ওর নিজের ঘরের সামনে কাঁচকলার গাছ আছে। আজ ভোরেই কাটিয়েছে। যত্ন করে ছাড়িয়েছে। আমি মোচা ভালোবাসি ও জানত, তাই নিয়ে এসেছে। বুড়িটা সত্যিই খুব ভালোবাসে।
—বুদ্ধি করে একটু চিংড়ি মাছ আনতে পারতে।
—হ্যাঁ, এনেছি তো।
কিন্তু গিন্নি হ্যাঁচোর প্যাচোর করে খোঁজার পরও ব্যাগটার মধ্যে কোনো কালো প্লাস্টিকের প্যাকেট পেল না।
—হ্যাঁ গো কোথায় তোমার টাটকা মোচা? প্যাকেট ব্যাগে নেই তো!
—নেই বললেই হবে! এই এক স্বভাব হয়েছে তোমার। না দেখেই বল ‘নেই’! সেদিন টম্যাটো আনোনি বললে তারপরে পেলে তো।
—কোথায় পেলাম! ওটা দোকানে ফেলে এসেছিলে। পরের দিন নিয়ে ফিরেছিলে।
—না রে বাবা! আজকে ছাতাবুড়ি দোকানে যাওয়া হয়নি। ও হাতে করে বয়ে নিয়ে এসেছিল!
—আমি না হয় সাত কাজে ভুলে যাই। তুমি যেদিন ছাইপাঁশ লেখালেখি কর, সেদিন থেকে ভুলভাল কর। দিলে গেল কোথায়?
ভাবতে বসলাম! তাই কী?
মুহুর্মুহু বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। কালো মেঘ ফুঁড়ে বিদ্যুতের চিড়িক, বিড়িক ঠান্ডা বাতাস। বাতাসে জল-কুয়াশা। বাজার তখন সারা। ফিরতেই পারতাম। কিন্তু বর্ষার প্রথম বাদলধারায় ভিজতে ইচ্ছে হল। বৃষ্টিতে ভিজতে ভীষণ ভালো লাগে। বৃষ্টি পড়লেই আমরা ব্যাঙের মতো ডাকতে ডাকতে ছুটে যেতাম জল-কাদা মাঠে। লাল রবারের বল নিয়ে সাররা খাওয়া। কতই বা বয়স তখন বছর বারো। আর এখন বাহাত্তর! হার্টের রোগ। ক’দিনই বা আছি! বৃষ্টিকে আজ চেটেপুটে খাব।
এখন অজস্র ডিমপোনা বৃষ্টি না নেমে আমার বড়ো ছেলের মতো ত্যান্ডাই ম্যান্ডাই করাই সার! চাকরি ধরা ছাড়াই তার কাজ। তারপর বিয়ের পর থিতু হল। এখন বড়ো চাকরি করে! থাকে সল্টলেকে! কিন্তু ত্যান্ডাই ম্যান্ডাই করা যায়নি। বউমা ফোন করে বলে, ‘বাবা আপনার ছেলের যা মেজাজ!’ ভিজব বলে রাস্তায় তো দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। এই বাজারে মোটামুটি সবাই চেনে, জানে আমাকে। কী ভাববে তারা। হঠাৎ হাওয়ায় বৃষ্টি ফোঁটা সোঁদা গন্ধ! বুক ভরে সেই গন্ধ টানতে থাকি, রাস্তার লোকজন ছোটাছুটি শুরু করল। ছাউনিতে মাথা বাঁচাতে ঢুকে পড়ে। কেউ কেউ বাহারি ছাতা বের করে। বাতাসে বাগ মানে না। ছাতা ব্যাঙের ছাতার মতো উলটে যায়।
যাইহোক, শুরু হল বৃষ্টি। বৃষ্টির ছাঁটে অর্ধেক ভেজা হয়ে গেছে। এরপর পেছন পাকা বৃষ্টি আর থামে না। কমবেশি হয়েই চলল। ভাবছি এবারে হাঁটা লাগাই। বৃষ্টি থেমে গেলে আর ভেজা হবে না। তখনই সেই সবজিওয়ালি, তথা ছাতা-বুড়ি প্রায় ছুটতে ছুটতে এল।
ছাতা-বুড়ি। নামটি অদ্ভুত হলেও আমার দেওয়া। বুড়ির নাম হয়তো বাসন্তী। লক্ষ্মী বা পদ্মা! জানি না। জিজ্ঞেস করাও হয়নি। ফুটপাতের ধারে দুই বুড়ির দোকান। শাক সবজি নিয়ে বসে। প্রথম জনের নাম কলগেট বুড়ি। তার সাদা দাঁতগুলো এখনও অটুট। বলেছিল কালো ছাই দিয়ে দাঁত মাজে তাই। পরের জনের অবস্থা খুব করুণ। বেশ ক’দিন আগে ঝাঁঝালো তেজিয়াল রোদে একটা দুমড়ে যাওয়া ফাটা শিক ভাঙা ছাতা নিয়ে বসে। ঝলসে যাচ্ছিল তার গা বা তার সবজি। পুঁইশাক কিনতে গিয়ে চোখে পড়ল। রোদ খাওয়া শাক পাতা ঝিমিয়ে পড়েছে। নিতে চাইছিলাম না। ধ্যাৎ। শুকনো বাসি শাক। চলবে না। বলে, বাবু গো সকালের কাটা। রোদে নেতিয়ে গেছে। বলেই জলের ঝাপটা মারল। শাকগুলো কিছুটা ব্যাগের ছায়ায় ঢুকবে বলে উজ্জীবিত হল। দাম দিয়ে নিলাম। তার মলিন ফাটা শাড়ির গা বেয়ে রোদ তার গরিবিয়ানাকে দংশন করছিল। তখনই ভেবেছিলাম, ‘আহা! একটা নতুন ছাতা হলে মন্দ হয় না।’
গিন্নি সব শুনে বলে, দেবে যখন একটা নতুন ছাতা দিও। আর আমার একটা ভালো ছাপা শাড়ি দিচ্ছি নিয়ে যাও। ওগুলো হাতে নেওয়ার পর বুড়ির মুখে যে অনাবিল হাসি আর কৃতজ্ঞতা পূর্ণ চাউনি দেখেছিলাম তা আমাকে মুগ্ধ করেছিল।
কিন্তু মুশকিল হল তারপরে ওর দোকানের পাশ দিয়ে হাঁটা যেত না, আজ থোড়, পালং তো কাল মোচা ঢ্যাঁড়শ। দাম নিতে চায় না। বিস্তর জোরাজুরির পর নেয়। কম নিতে চায়। বলি, তা হবে না। যা দাম তাই নিতে হবে। সেই থেকে আমার এক প্রিয় বুড়ি ‘ছাতা-বুড়ি!’ পরের ক’দিন দূর থেকে দেখতে যেতাম। অনেক সময় গরিব মানুষ ছাতাটা হয়তো বেচে দেবে। অথবা ছেলেকে দিয়ে দেবে— যা বাবা রিকশ টানিস গরমে- রোদে। ছাতাটা মাথায় দিস। সন্তান স্নেহ বলে কথা।
না, তা ও করেনি। শুধু নতুন ছাতাটা নয়, সেই গিন্নির দেওয়া হলুদ শাড়িটা পরেও এসেছিল। ওকে বেশ লাগছিল। গিন্নিও খুশি হয়ে বলেছিল আমার অনেক গরম চাদর আছে। শীতকাল এলে দিয়ে দেব। সেই ছাতা-বুড়ি বগলে ছাতাটি আর হাতে কালো প্যাকেট নিয়ে এল। বৃষ্টির মধ্যে নিজে ভিজে গেছে। বেশ অবাক। কিছুটা হতভম্ব। যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম। সেখান থেকে ওর দোকানের দূরত্ব কম নয়। খটকা লাগে। ও জানলই বা কী করে, আমি এখানে জলে আটকে পড়েছি। আমার প্রশ্ন শুনে বলেছিল, তোমায় দেইকেছি গো বাবু! ওই ঢ্যাঙা, সোন্দর চেয়ারা ধূর থিকেও চিনা যায় গো। এখন চল দিকি ঘরের গোড়া দে আসি।
—দরকার নেই! আমি চলে যাব এটুকু পথ।
—বাবু! এই বয়সে ভিজা ঠিক হবেনে। জ্বর আসবে।
—তা তুমিও তো বুড়ো বয়সে ভিজছ। আসার কী দরকার ছিল?
—গরিবের শরীল সব সয়ে লেয় বাবু!
—এলে কেন?
—এইটা দুব বলে, ভোরবেলা লাতিকে দিয়ে মোচা পাইড়েছি। তারপর তা ছাইড়েছি। তোমার পরিবারও মোচা খেতে ভালোবাসে যে?
সেই বুড়ি আমাকে আর ভিজতে দিতে চায় না। ছেলেবেলায় ‘মা’ যেমন বাধা দিত ঠিক তেমনই বাধা দিয়ে বলল, ‘যদিও তুমি পেরায় ভিজে গেছ। তবু মাতাটাতো বাঁচবে।’
সে আমাকে ছাতাটা দিয়ে পাশে হাঁটতে লাগল। ফুটপাত জুড়ে। কয়েকটা ছাতা যেন হেঁটে চলেছে। ছাতার লম্বা ডাঁটিটা যেন বেড়ে গিয়ে পা হয়ে গেছে! অদ্ভুত ছাতা মানুষ সব। লাল, নীল, সবুজ, রামধনু বা কালো রঙের ছাতা-মানুষ! কোথাও উজ্জ্বল রং। কোথায় ম্যাড়মেড়ে শিক ভাঙা। যেন বড়োলোক, গরিবলোক ছাতা-মানুষ! বেশ মজা লাগছে। কিন্তু আমরা দু’জনে আরমসে যাচ্ছি। যেন ওরা পথ ছেড়ে দিচ্ছে।
—তুমি যে চলে এলে তোমার দোকান কে দেখবে?
—কেউ না! তবে তাড়াতাড়ি ফিইরে যাব।
—তুমি তো একেবারে ভিজে যাচ্ছ?
—চিন্তা নাই গো! মোদের জ্বরজালা কিছু হয়নি। ঘর ফুটা, দজ্জা ভাঙা ঘরে রোদ ঠান্ডা জল সব চলে আসে। মাটির মেঝে জলে পিচ্ছিল হয়। বাবুগো মোদের একটাই জ্বালা। তা হল গে পেটের জ্বালা।
—তোমার ছেলেপুলে নেই?
—হ্যাঁ তো! ছেলেটা বাপের রেকশা চালায়। ওর বাপও রেকশা চালাত। বেদম মদও খেত। মদের সঙ্গে চাট বানিয়ে দিতে হত। তবে অন্য রেকশাওয়ালাদের মতো মদ খেয়ে পিটাতোনি। হ্যাঁ, একবারই গায়ে হাত তুইলেছেল। মারার পর গুম হয়ে গেছল। জানো বাবু, তার পরেই আমাকে পুরীধামে নে গেছল। বাবা জগন্নাথের পূজা দেচলাম। আর কী বড়ো সমুদ্দর দেখছিলাম। ঢেউ আর ঢেউ। চ্যান করছিলাম। সে সব কত দিন হয়ে গেল। ছেলাও মদ খায়। কিন্তু বউ পিটায়। লাতিটা ভয়ে মোর কাছে লুকি থাকে।
—তা তোমার বাড়ি কোথায়?
—হে হে বাবু। মড়া পোঁতায়।
—মড়াপোঁতা! এ তো বড়ো অদ্ভুত নাম। ওখানে কি আগে মড়া পোঁতা হত!
— তা জানিনি বাবু! তবে একন একটা শ্মশান আছে। ছোটো গেরাম, লোকও কম, মরেও কম, সেখানেই পুড়ায়!
ছাতা বুড়ি জোর করে হাতে ছাতা ধরিয়ে, একটা কালো প্যাকেট দিল। কিছু বলার আগে ছাতা-মানুষটা ফিরে চলল। কিন্তু এত দ্রুত যে দেখতে পেলাম না।
আবাসনের ভেতরে ঢুকে সেই ছাতাটি গুটিয়ে বাজারের ব্যাগে ঢুকিয়ে ভিজতে ভিজতে ফ্ল্যাটে ফিরলাম। সুতরাং সেই মোচার প্যাকেটটি যে সে দিয়েছিল আমি নিশ্চিত। গিন্নিকে পুরো ঘটনা বললাম।
তোমার কাণ্ড তো! যার ব্যাগ থেকে জ্যান্ত শোল মাছ লাফিয়ে পালায়। সে যে প্যাকেটটা বৃষ্টিতে গেটের কাছে ফেলনি, তার কোনো নিশ্চয়তা আছে।
দুই
পরের দিন সকালেই বাজারে বেরলাম। হাতে ছাতাটি নিলাম। একটু বেলা হয়েছিল। রোদ তখন জল শুষে নিচ্ছে। বেশ গরম, রোদে ঘামছি। আহা রে! ছাতা বুড়ির ছাতা তো আমার কাছে। হয়তো সবজিগুলো ঝিমিয়ে পড়ছে। পাশের কলগেট বুড়ি আর দু’চারজন জটলা করছে, চাপা স্বরে আপশোস করছে। কথাগুলো শুনতে পাচ্ছি। গতকালই ভোর রাতে! ঘরের সামনেই নাতিকে নিয়ে কলার কাঁদি পাড়াতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে। অনেকে ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে যায়। আর জ্ঞান ফেরেনি। নাতি কান্না জুড়ে দেয়।
ভাবি, কোথায় কী! ওই তো ছাতা বুড়ি বসে, আমার থেকে ছাতা ফেরত নিল। বলল, বাবু, আজ কচি পালং আছে দুব? আমি বললাম লাগবে না। বরং আমাকে একদিন মোচা ছাড়িয়ে দিও। তোমারটা কাল বৃষ্টিতে কোথাও হারিয়ে ফেলেছি। বুড়ি ঘাড় নাড়ে বলে ‘দুব’!
আমি বেশ জোরে ওদের বলি, ‘‘কী সব বকছ? ছাতাবুড়ি মরতে যাবে কেন? ছাতাটা ফেরত দিলাম। পালং শাক দিতে চাইল। আমি নিলাম না। তোমাদের সামনেই তো সব ঘটল। ওই তো ও ‘ছাতা’ মাথায় দিয়ে বসে। তোমরা শুনছ...।’’ কিন্তু ওরা এমনভাবে কথা বলছিল যেন ‘আমি’ বলে কেউ নেই। পাত্তা দিল না। ভাবছি, যদি ছাতা বুড়ি মরেই যাবে, তবে ছাতাটা আমাকে কে দিয়ে গেল? না কি! কায়দা করে ছাতা ফেরত দিয়ে গেল। তাহলে তো শাড়িটাও ফেরত দিত! টুকটাক বাজার ছিল। সেগুলো ভরে ফ্ল্যাটে ফিরে এলাম। মালতির মা কাজ করতে এল, বাবা কী গোমড়া মুখ। অন্যদিন সোফার কাছে এসে পা সরাতে বলে, যাতে করে সোফার তলা মুছতে পারে। বকবক করে। আজকে কিছু বলল না। বেমালুম কাজ সেরে চলে গেল। বলেও গেল না আমি যাচ্ছি! ওর আবার কী হল?
তিন
গিন্নি উদভ্রান্তের মতো ঘরে ঢুকল। সঙ্গে মালতির মা, আশপাশে দু’-চারজন মহিলা। ও হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সোফায় বসল। ও গা ঘেঁষে বসে কেঁদে যাচ্ছে। এক কথা বলে যাচ্ছে— ‘আমি তোমাকে ফিরিয়ে আনতে পারলাম না।’ কাছে টেনে নিই। আদর করি।
‘কাঁদছ কেন? আমি তো তোমার পাশেই বর্ণা!’ ও শুনছে না। তবুও কাঁদছে পেছনে পেছনে ছেলে, বউমা, ছোটো নাতি। ছেলে গলায় কাছা নিয়েছে। কোমরে কম্বলের আসন। সাদা ধুতির কোণ দিয়ে চোখ মুছছে।
ঘাবড়ে যাই। খোকা রে এই তো আমি। ও-ও
শুনছে না।