মাত্র একুশ বছরের জীবনে কবি সুকান্ত যে কবিতার জগৎ নির্মাণ করেছিলেন, তা বিস্ময়কর। তাঁর চোখে ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবী, দুর্ভিক্ষে কাতর মানুষ, শ্রমিকের ঘাম, পথশিশুর ক্ষুধা এবং এক অন্যরকম ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সদ্য পেরিয়ে এলাম তাঁর জন্মদিন। জন্মশতবর্ষে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যকে শ্রদ্ধার্ঘ্য। লিখেছেন মৃণালকান্তি দাস
সেই শিশু যখন জন্ম নেয়, চারদিকে তখন অস্থিরতা। যুদ্ধের ক্ষত শুকায়নি। ক্ষুধার দীর্ঘশ্বাস থামেনি। শোষণের অন্ধকার আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মিশে আছে বাতাসে। শিশুটি কিছুই জানে না তখনও। ইতিহাস কী, রাজনীতি কী, মানুষ কতটা নির্মম হতে পারে, কিছুই তার জানা নেই। ভাষাও শেখেনি। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য সেই নবজাতকের কান্নার ভিতরই যেন শুনতে পেয়েছিলেন ভবিষ্যতের ডাক। তাই লিখেছিলেন, ‘যে শিশু ভূমিষ্ঠ হ’লো আজ রাত্রে/ তার মুখে খবর পেলুম/ সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক/ নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার/ জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, মানুষের অনাহার, কৃষক ও শ্রমিকের বঞ্চনা, রাজনৈতিক সংঘাত— এসবই ছিল তাঁর কৈশোরের নির্মম বাস্তবতা। সেই বাস্তবতা তাঁকে নিছক সৌন্দর্যের কবি হয়ে থাকতে দেয়নি। কবিতা তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল মানুষের ক্ষুধা, শ্রম, অপমান, প্রতিবাদ আর ভবিষ্যতের স্বপ্নের ভাষা। তাই ‘প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা’ বলে যখন তিনি ঘোষণা করেন ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’, তখন সেটা নেহাত কাব্যিক উচ্চারণ ছিল না। ছিল একটা সময়ের নির্মম সত্যের বিরুদ্ধে সোজা দাঁড়িয়ে যাওয়া।
বাংলা কবিতায় এমন মুহূর্ত সচরাচর মেলে না, যেখানে একটি নবজাতক একই সঙ্গে ভবিষ্যতের প্রতীক, ইতিহাসের উত্তরাধিকারী, আবার মানুষের অসমাপ্ত স্বপ্নেরও প্রতিনিধি হয়ে ওঠে।
১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট জন্ম নেওয়া সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন থেমে গিয়েছিল মাত্র একুশ বছর বয়সে। ১৯৪৭ সালের ১৩ মে। স্বাধীনতা প্রাপ্তির তিন মাস আগে। জীবনের পরিধি ছোটো ছিল বটে, কিন্তু স্বপ্নের পরিধি ছিল অসীম। তিনি এমন এক সময়ে জন্মেছেন, যখন উপমহাদেশের আকাশে একদিকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক বিভাজন, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ আর ঔপনিবেশিক শোষণের অন্ধকার ঘন হয়ে উঠছিল। সুকান্তের জন্মশতবর্ষে পিছনে ফিরে তাই কেবল একজন অকালপ্রয়াত কবিকে স্মরণ করলেই চলে না, নিজেদের সময়টাকেও নতুন চোখে দেখতে হয়। কারণ যে পৃথিবীকে তিনি একটি শিশুর জন্য বাসযোগ্য করে তোলার অঙ্গীকার করেছিলেন, সে পৃথিবী আজও পুরোপুরি বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি।
মাত্র বারো বছর বয়সে সুকান্ত হারিয়েছিলেন মা সুনীতিদেবীকে। তিনি রেখে গিয়েছিলেন ছয় ছেলেকে। সুশীল বড়ো, সুকান্ত মেজো, বাকি চারজন খুবই ছোটো। সুকান্তই হয়ে উঠেছিলেন সেই ভাইদের অভিভাবক। ছাত্রকাল থেকেই সুকান্ত রাজনীতিতে নাম লেখান। কাকভোরে বেরিয়ে, নাওয়াখাওয়া ভুলে, দলের হয়ে অসম্ভব পরিশ্রম করে ফিরতেন অনেক রাতে। মন্বন্তরের বছরে মানুষের অবক্ষয় দেখে ‘কিশোর বাহিনী’ গড়েছিলেন। ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় কিশোর সভা পরিচালনা করার সময় মাসে তিরিশ টাকা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পেয়েও পেয়েছিলেন পাঁচ টাকা। আর পাঁচ টাকার ট্রামের কুপন, যা ভাঙিয়ে খাওয়া যায় না। দিনের পর দিন অভুক্ত থেকে রোগভোগে শীর্ণ হতে থাকেন। বাবার ছিল বইয়ের দোকান এবং প্রকাশনী। তাঁদের প্রকাশনী থেকে খুব বিক্রি হত মহাভারত ও শ্রীমদ্ভাগবত। পারিবারিক যজমানি থেকে আসত চাল, নানা সামগ্রী, খাট-বাসনপত্রও। অনেক সময় বিক্রি করতে হত সে-সব। কলকাতার পথে পথে তখন মৃত্যুর মিছিল। এরই মাঝে সুকান্ত সারা দিন কাটাতেন সেবা ও সাহায্যের কাজে। কাছ থেকে দেখেছেন বিয়াল্লিশের অগস্ট আন্দোলনে ছাত্রদের উপর পুলিশি বর্বরতা, আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দি মুক্তি আন্দোলন, নৌবিদ্রোহের ধর্মঘট। মানুষের দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণার সঙ্গে কবিতায় একাত্ম হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
সুকান্তের কবিতায় ক্ষুধার্ত মানুষের মুখ, শ্রমজীবীর জীবন, বঞ্চিতের দীর্ঘশ্বাস, শোষিতের ক্ষোভ বারবার ফিরে এসেছে। তাঁর কবিতার অভিজ্ঞতা কেবল কৈশোরের আবেগে আটকে ছিল না। তাঁর কবিতায় আছে ইতিহাসের বোধ, শোষণ ও বৈষম্যের উপলব্ধি, যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষের বাস্তবতা, ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রত্যয়, আর একটা ন্যায়ভিত্তিক পৃথিবীর স্বপ্ন। তাঁর কাছে কবিতা জীবনের বাইরে আলাদা কোনো সৌন্দর্যের জগৎ নয়, কবিতা ছিল জীবনেরই অংশ, মানুষের লড়াইয়ের অংশ। এই কারণেই তার কাব্যে চাঁদও কখনো নিছক রোমান্টিক সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে থাকেনি, ক্ষুধার্ত মানুষের চোখে সেই চাঁদ হয়ে উঠেছে ‘ঝলসানো রুটি’।
সুকান্তের দ্রোহ অন্ধ প্রতিহিংসার দ্রোহ ছিল না। তাঁর কবিতায় ক্ষোভ আছে, প্রতিশোধের ভাষাও আছে, কিন্তু তার আড়ালে ছিল মানুষের প্রতি গভীর মমতা।
ব্যক্তিগত বেদনা থেকে শুরু হয়ে বৃহত্তর সামাজিক অন্যায়ের দিকে গিয়ে পৌঁছায় তাঁর কবিতা। তিনি স্বপ্ন দেখতেন এমন এক সমাজের, যেখানে মানুষের ঘর ভাঙবে না, ক্ষুধায় কেউ মরবে না, শ্রমের মূল্য অস্বীকার করা হবে না, ক্ষমতার কাছে মানুষের মর্যাদা হেরে যাবে না। তাঁর কবিতার ক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল মানুষের প্রতি মানুষের অন্যায়। পুরানো অন্যায় ভেঙে নতুন ন্যায়ভিত্তিক পৃথিবী গড়ে তোলাই ছিল তাঁর স্বপ্ন।
তিনি বুঝেছিলেন, কবিতা তখনই সত্যিকার অর্থে প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে, যখন সে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে। সৌন্দর্য মানে তাঁর কাছে শুধু ফুল, চাঁদ কিংবা প্রেমের রোমান্টিকতা নয়, ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে এক টুকরো রুটিও সৌন্দর্যের এক মৌলিক প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। এই জায়গাতেই সুকান্তের সঙ্গে আজকের পৃথিবীর এক আশ্চর্য সম্পর্ক তৈরি হয়। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলেছে, মানুষের জীবনযাপনও বদলেছে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের সামনে প্রশ্নগুলি কি সত্যিই বদলে গিয়েছে? আজ একটা শিশু জন্ম নেওয়ার মুহূর্তেই এমন এক পৃথিবীতে ঢুকছে, যেখানে তার সামনে ভবিষ্যতের অসংখ্য দরজা খোলা। কিন্তু একই সঙ্গে অপেক্ষা করছে জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মানসিক বিচ্ছিন্নতার মতো কঠিন সব বাস্তবতা। সুকান্তের ভাষায় বলতে গেলে, পৃথিবীকে এখনও ‘জঞ্জাল’ মুক্ত করার কাজ শেষ হয়নি। এই কারণেই ‘ছাড়পত্র’ আজ শুধু একটা কবিতা নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি একটা নৈতিক দায়বদ্ধতার দলিলও বটে। তিনি বলে গিয়েছেন, ‘চ’লে যাবে, তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল,/ এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ এই কয়েকটি পঙ্ক্তির ভেতর যেন তার সমগ্র মানবতাবাদ জমাট বেঁধে আছে। ভবিষ্যতের শিশুর জন্য একটা ভালো পৃথিবী রেখে যাওয়ার দায় থেকে তিনি সরে দাঁড়াননি।
সুকান্তের সবচেয়ে বড়ো শক্তি ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারা। নিজের সময়ের অন্ধকার শুধু দেখেননি, অন্ধকারের ওপারের আলোটাও দেখেছিলেন। নতুন শিশু মানে তার কাছে নতুন ইতিহাসের সম্ভাবনা। তাই ‘ছাড়পত্র’র শেষে নিজের মৃত্যুকেও ভয় পান না তিনি। বলেন, ‘অবশেষে সব কাজ সেরে/ আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে/ করে যাবো আশীর্বাদ,/ তারপর হব ইতিহাস।’ কী আশ্চর্য আত্মবোধ! মাত্র একুশ বছরের এক তরুণ কবি নিজের ভবিষ্যৎকে ইতিহাসের হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত, যদি তাঁর জীবন আর রক্ত ভবিষ্যতের মানুষের কাজে লাগে।
একবার দিনাজপুরে এক সভায় গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন কালাজ্বর। ১৯৪৭ সালের এপ্রিলের প্রথমেই ভরতি হলেন যাদবপুর টিবি হাসপাতালে। ৪২-৪৩ দিন সুকান্ত ছিলেন এই হাসপাতালে। ক্ষয়রোগ হয়েছিল তাঁর বুকে। বুকের চিকিৎসা শুরু হলেও পেটের চিকিৎসা তখনও আবিষ্কার হয়নি। দ্রুত সব শেষ হল ১২ মে রাতে। কবি সুকান্তর চরম দুর্ভাগ্য এই যে, নিজেদের প্রকাশনী থাকা সত্ত্বেও জীবিত অবস্থায় তিনি তাঁর কোনো প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ দেখে যেতে পারেননি।
সুকান্ত আজ বেঁচে থাকলে হয়তো তাঁর কবিতায় আমাদের সময়ের ভাষাটাই বদলে যেত। স্মার্টফোনের আলোয় জেগে থাকা তরুণের চোখে হয়তো তিনি নতুন পৃথিবীর কুয়াশা দেখতেন। রাজপথে দাঁড়ানো তরুণের মুষ্টিবদ্ধ হাতে হয়তো খুঁজে পেতেন সেই নবজাতকের হাতেরই প্রতিচ্ছবি। হয়তো দেখতেন, প্রযুক্তির যুগেও মানুষ একই রকম ন্যায়, মর্যাদা, স্বাধীনতা আর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা খুঁজছে। কিন্তু তার মূল জিজ্ঞাসাটা বদলাত না, মানুষ কি তার পৃথিবীকে আরও মানবিক করে তুলতে পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই দিতে হবে। কারণ সুকান্ত শেষ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত উত্তর রেখে যাননি, রেখে গিয়েছেন শুধু অঙ্গীকার। নিজের প্রজন্মকে চিরস্থায়ী ভাবেননি তিনি, জানতেন একদিন নতুন শিশুরা আসবে, পুরানো মানুষ চলে যাবে। সেই চলে যাওয়ার আগে পৃথিবীটাকে একটু বাসযোগ্য করে যাওয়াটাই মানুষের সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব। তাঁর ‘ছাড়পত্র’ আমাদের সামনে রেখে গিয়েছে বড়ো একটা প্রশ্ন। আমরা যারা আজ বেঁচে আছি, শিশুর জন্য উপযোগী সেই পৃথিবী তৈরি করার দায়িত্ব কি আমরা পালন করছি? নাকি শুধু নিজেদের সময়টুকু ভোগ করে তার হাতে তুলে দিচ্ছি একটা ক্লান্ত, ক্ষতবিক্ষত পৃথিবী?