নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: কসবা ল’ কলেজের গণধর্ষণ-কাণ্ড উস্কে দিল নতুন বিতর্ক। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রে রামনগর কলেজের ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনা। কসবা-কাণ্ডে মূল অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্রকে নিয়ে তোলপাড় চলছে গোটা রাজ্যে। কলেজের অস্থায়ী চাকরিও খোয়াতে হয়েছে তাকে। অথচ, রামনগরের কলেজের ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত দুই তৃণমূল ছাত্রনেতা জেল খাটার পরও বহাল তবিয়তে। দু’জনে দিব্যি কাজ করে চলেছেন কলেজের অস্থায়ী কর্মী হিসেবে। বিতর্ক ঠিক এখানেই। বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠছে, মনোজিতের যদি চাকরি যেতে পারে তা হলে কেন ওই দুই ছাত্রনেতার চাকরি যাবে না? শুধু তাই নয়, এক ছাত্রনেতা আবার ব্লক সংগঠনের দায়িত্বেও! যদিও গোটা বিষয়টিকে কসবা কাণ্ডের সঙ্গে মেলাতে নারাজ রামনগর কলেজের পরিচালন বোর্ডের সভাপতি তথা তৃণমূল নেতা সুপ্রকাশ গিরি।
গত বছর রামনগর কলেজের এক ছাত্রীকে মেসে মদ খাইয়ে গণধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। কাঁথি মহিলা থানার পুলিস ওই ঘটনায় মোট ছ’জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করেছে। তাতে চন্দন পুলাই, রাজকুমার জানা, রাহুল সাঁতরা, প্রীতিশ বেরা, গোবিন্দ ওরফে অপু জানা এবং শেখ আব্বাসের নাম রয়েছে। চন্দন সেই অভিযুক্ত ছাত্র নেতা যিনি এখন রামনগর-২ ব্লক তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সভাপতিও। ঘটনার পরও তাকে ওই পদ থেকে সরানো হয়নি। পাশাপাশি, অভিযুক্ত চন্দন ও রাজকুমার দু’জনেই রামনগর কলেজের অস্থায়ী কর্মী। রাজকুমারও যুব তৃণমূল নেতা। রাজকুমার, রাহুল, প্রীতিশ ও গোবিন্দ গণধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছিল। কয়েক মাস জেলে থাকার পর প্রত্যেকে জামিনে ছাড়া পায়। জেল থেকে বেরিয়ে এসে ফের কলেজে অস্থায়ী কর্মী হিসেবে কাজ করছে রাজকুমার। চন্দন এখনও কলেজে অস্থায়ী কর্মী।
এদিকে, গণধর্ষণের শিকার ছাত্রীটি আতঙ্কে আর কলেজে যাচ্ছেন না। উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে আতান্তরে পড়েছেন তিনি। অভিযুক্তদের মাথার উপর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের আশীর্বাদ রয়েছে বলে এলাকায় গুঞ্জন। সেই কারণেই চন্দন কিংবা রাজকুমার কলেজের অস্থায়ী কর্মীর পদ থেকে সাসপেন্ড হয়নি।
নির্যাতিতা ওই ছাত্রী ভালোবেসে গত বছর ৩১ জানুয়ারি কলেজেরই এক ছাত্রকে বিয়ে করেছিলেন। সেই বিয়েতে পরিবারের মত ছিল না। ফলে, কলেজের ইউনিয়নের দাদাদের সহযোগিতা নিয়েছিলেন ওই যুগল। দু’জনে কলেজ সংলগ্ন একটি মেসবাড়ি ভাড়া করে থাকতেন। বিয়েতে নিজেদের ভূমিকা টেনে ইউনিয়নের দাদারা ওই যুগলের কাছে ভোজ দেওয়ার আব্দার করেছিল। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই ভোজের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়। অভিযুক্তরা মদ ও মাদক এনে মেসবাড়িতে আসর বসায়। অভিযোগ, সেখানে ওই ছাত্রী ও তাঁর স্বামীকে আকণ্ঠ মদ খাইয়ে বেহুঁশ করে গণধর্ষণ করা হয়।
গত ৩০ জানুয়ারি ওই গণধর্ষণ মামলায় কাঁথি এসিজেএম আদালতে চার্জশিট পেশ করেছে পুলিস। সেখানে ছ’জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তারপরও অভিযুক্তরা বহাল তবিয়তেই। আগের মতোই তারা কলেজে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই নির্যাতিতা ছাত্রীটি ভয়ে আর কলেজ যেতে পারছেন না। এটাই ‘আশ্চর্যজনক’ বলে সরব হয়েছেন স্থানীয়রা।
মঙ্গলবার ওই নির্যাতিতা ছাত্রী আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘অভিযুক্তদের মাথার উপর প্রভাবশালীদের হাত রয়েছে। সেজন্য জেল থেকে বেরিয়ে সোজা কলেজে এসে ফের আগের মতোই বুক ফুলিয়ে ঘুরছে। মেডিক্যাল, ফরেন্সিক রিপোর্ট সহ চার্জশিট পেশ করেছে পুলিস। তারপরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়াটা আশ্চর্যজনক।’ যদিও কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি সুপ্রকাশ গিরি বলেন, ‘কসবার ঘটনার সঙ্গে রামনগর কলেজের ঘটনার মিল নেই। কসবায় গণধর্ষণের পরদিন অভিযোগ দায়ের হয়েছে। রামনগরে ঘটনার ৪৫ দিন বাদে অভিযোগ দায়ের হয়। তাছাড়া ঘটনাটি কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে ঘটেছে। আদালতে অভিযুক্তরা দোষী প্রমাণিত হলে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ অভিযুক্ত চন্দন পুলাই স্বীকার করে নিয়েছে, ‘আমি এবং রাজকুমার দু’জনে কলেজে অস্থায়ী কর্মী হিসেবে এখনও ডিউটি করছি। আমি রামনগর-২ ব্লক তৃণমূল ছাত্র পরিষদ পদেও রয়েছি।’