নিজস্ব প্রতিনিধি, রানাঘাট: মমতার প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন দুই সিপিএম নেতা! আমাদের পাড়া আমাদের সমাধানের ফলক উন্মোচনের অনুষ্ঠানে এহেন বেনজির ঘটনার সাক্ষী হল রানাঘাট শহর। ঘটনার ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক জল্পনা। যদিও উভয় দলের তরফ থেকে এই বিষয়টিকে রাজনীতির বাইরে বলে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
জানা গিয়েছে, রানাঘাট পুরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে একটি নিকাশি নালা সংস্কারের প্রকল্প উদ্বোধন ঘিরে তীব্র আলোড়ন ছড়িয়েছে রাজনৈতিক মহলে। সরকারি এই প্রকল্পের ফলক উন্মোচনে অংশ নেন বামফ্রন্টের দুই বর্ষীয়ান নেতা, যাঁদের হাতেই ছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবিযুক্ত ফলকের আবরণ উন্মোচনের দায়িত্ব! পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই ওই ওয়ার্ডের নিকাশি নালার দুরাবস্থা নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সেই দাবিই তোলা হয়েছিল ‘আমাদের পাড়ার, আমাদের সমাধান’ শিবিরে। ঘটনাচক্রের সেই শিবিরে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সিপিএম নেতা অলক রায় ও শচীন্দ্রনাথ দাস। নাগরিক স্বার্থে ওই বিষয়টি তুলে ধরেন তাঁরা। তার পরই সংশ্লিষ্ট এলাকায় দু’টি পৃথক নিকাশি নালা সংস্কারের প্রকল্প অনুমোদন হয়।
সম্প্রতি সেই নিকাশি নালা সংস্কারের শুরুতে একটি আনুষ্ঠানিক ফলক উন্মোচনের আয়োজন ছিল। একটি ভাইরাল ভিডিওতে (‘বর্তমান’ ভিডিওর সত্যতা যাচাই করেনি) দেখা গিয়েছে, সেখানেই উপস্থিত ছিলেন এলাকার বাসিন্দারা। এছাড়াও ছিলেন রানাঘাটের তৃণমূল পরিচালিত পুরসভার কাউন্সিলর শেখর মুহুরী এবং ওই দুই বামনেতা।
বাম নেতাদের উপস্থিতি নিয়ে রাজনীতির তরজা তো হয়েছেই, সেই আগুনে ঘি ঢেলেছে ফলকে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি থাকা। এমন এক দৃশ্যের ভিডিও ভাইরাল হতেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে সিপিএমের অন্দরে। সরকারি প্রকল্পে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি ব্যবহারের বিরোধিতা করার দলীয় অবস্থানের সঙ্গে কি এই ঘটনার সামঞ্জস্য রয়েছে?
যদিও এ বিষয়ে শচীন্দ্রনাথ দাসের বক্তব্য, আমরা মানুষের স্বার্থেই ‹আমাদের পাড়া আমাদের সমাধান› শিবিরে গিয়েছিলাম। সেখানে এলাকার সমস্যা তুলে ধরা হয়েছিল। পরে সেই দাবির ভিত্তিতেই কাজ শুরু হয়। তাই যেহেতু আমাদের দাবি মতো কাজ হচ্ছে, তাই আমন্ত্রণ পেয়ে অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। ফলক উন্মোচনের দায়িত্ব আমাদের উপর দেওয়া হবে, এটা জানা ছিল না।
যদিও ঘটনাটি নিয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন সিপিএমের রানাঘাট এরিয়া কমিটির সম্পাদক কমল ঘোষ। তিনি বলেন, প্রকল্পটি সরকারি। কোনও রাজনৈতিক প্রকল্প নয়। মানুষের স্বার্থেই আমাদের দলের দুই সদস্য গিয়েছিলেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ছবি থাকা দুর্ভাগ্যজনক। বিষয়টি নিয়ে দলের অভ্যন্তরে আলোচনা হবে। অন্যদিকে, রানাঘাট পুরসভার চেয়ারম্যান তথা তৃণমূল নেতা কোশলদেব বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, সরকারি প্রকল্পে উন্নয়নের প্রশ্নে দলমতের বিভাজন আমরা মানি না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবার মুখ্যমন্ত্রী, তাই যাঁরা মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান, তাঁরা আমাদের কাছে স্বাগত। ওই এলাকায় কাজ মানুষের স্বার্থে হয়েছে। তৃণমূলের জন্য আবার সিপিএমের জন্য আলাদা করে হয়নি।
এদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি শুধু প্রতীকমাত্র নয়, এটি রানাঘাটের রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে জনস্বার্থ ও দলীয় অবস্থানের সীমারেখা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের নামে এই সহাবস্থান কি নতুন কোনও বার্তা দিচ্ছে, নাকি দলে দলে মতানৈক্যের ইঙ্গিত, তা এখন রাজনীতির অন্দরে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু।