Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

বন্যার জলের তোড়ে ভেসে যায় দু’মাসের মেয়ে, সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ আলিশা

বিয়ের চার বছর পর ঘর আলো করে এসেছিল ফুটফুটে কন্যাসন্তান। গোটা পরিবারে খুশির জোয়ার এনেছিল সে।

বন্যার জলের তোড়ে ভেসে যায় দু’মাসের মেয়ে, সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ আলিশা
  • ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, জলপাইগুড়ি ও সংবাদদাতা, নাগরাকাটা: বিয়ের চার বছর পর ঘর আলো করে এসেছিল ফুটফুটে কন্যাসন্তান। গোটা পরিবারে খুশির জোয়ার এনেছিল সে। মেয়েকে ভালোভাবে বড় করতে গ্রাম ছেড়ে বেঙ্গালুরুতে কাজে গিয়েছেন নাগরাকাটার বামনডাঙা মডেল ভিলেজের বাসিন্দা প্রকাশ কেওয়ার। যাওয়ার সময় স্ত্রী আলিশাকে বলে যান, কালীপুজোর পরই একবার বাড়ি আসবেন। 

Advertisement

আসার সময় মেয়ের জন্য খেলনা আনবেন। কিন্তু তার আগেই ছারখার হয়ে গেল সব। ভয়াবহ বন্যায় ভেসে গেল আলিশার দু’মাসের মেয়ে আনিশা। অনেক চেষ্টা করেও একরত্তি মেয়েকে বাঁচাতে পারেননি বছর পঁচিশের আলিশা।
৫ অক্টোবর ভোরে বাঁধ ভেঙে গ্রামে হু হু করে জল ঢুকতে শুরু করায় আরও অনেকের সঙ্গে মেয়েকে নিয়ে কোনওমতে ঘর ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু এতটাই প্রবল স্রোত ছিল যে, জলে পড়ে যান আলিশা। অমনি তাঁর হাত থেকে ছিটকে যায় মেয়ে। চোখের নিমেষে ভেসে যায় সে। কোনওমতে একটা গাছ আঁকড়ে প্রাণে বাঁচেন আলিশা। একদিন পর বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে দু’মাসের মেয়ের দেহ মেলে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে কার্যত বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন আলিশা। দু’চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য আলিশার পাশে দাঁড়িয়েছেন। আগেই তাঁর হাতে তুলে দিয়েছেন পাঁচ লক্ষ টাকার চেক। সোমবার স্বামী প্রকাশের হোমগার্ডের চাকরির নিয়োগপত্রও আলিশার হাতে তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশে থাকার বার্তা দেন। তারপরও মেয়েকে হারানোর কান্না থামছে না তাঁর।
আলিশার কথায়, অভাবের সংসারেও মেয়েটা অনেক খুশি নিয়ে এসেছিল। ভেবেছিলাম, ওকে ভালোভাবে মানুষ করব। সেজন্যই স্বামী ভিনরাজ্যে কাজে গেল। কিন্তু আমার কপালে যে সন্তানসুখ নেই, তা বুঝতে পারিনি।
ঠিক কী হয়েছিল সেদিন? আলিশা বলেন, বাড়িতে শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাশুর-জা সবাই ছিল। মেয়েকে নিয়ে আমি শুয়েছিলাম। আগের রাতে প্রবল বৃষ্টি হয়েছে। আচমকা চিৎকার চেঁচামেচি শুনে বারান্দায় এসে দেখি, গ্রামে হু হু করে জল ঢুকছে। মেয়েকে নিয়ে কোনওমতে ঘর ছাড়তে ছাড়তেই আমাদের উঠোনে জল চলে আসে। চোখের নিমেষে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
বন্যায় ভেসে গিয়েছেন বামনডাঙা মডেল ভিলেজের বাসিন্দা সানিচারওয়া সাহু। চা বাগানের কর্মী ছিলেন তিনি। কোনওমতে প্রাণরক্ষা হয়েছে স্ত্রী কলাবতী সাহু’র। ভাইপো ফুলেশ্বর সাহু বলেন, দু’বছর আগে রাতের অন্ধকারে কাকার ঘরে হাতি হামলা চালায়। সেবার প্রাণে বেঁচে গেলেও ‘রাক্ষুসে’ জলঢাকা ভাসিয়ে নিয়ে গেল কাকাকে। চাকরি অর্থসাহায্য নিয়ে এই পরিবারটিরও পাশে দাঁড়িয়েছে রাজ্য সরকার। ত্রাণ নিয়ে কোনও অভিযোগ নেই বামনডাঙার দুর্গতদের। বিপদে প্রশাসন যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে, তার প্রশংসা করেছেন তাঁরা। 
দুর্গতদের একটাই আবেদন, রাতবিরেতে বন্যজন্তুর হামলার আশঙ্কা। ত্রাণশিবিরে থাকতে ভয় লাগছে তাঁদের। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, মাথাগোঁজার ঠাঁই তৈরি করে দিলে আপাতত দুশ্চিন্তামুক্ত হতে পারেন তাঁরা।  আলিশা কেওয়ার। - নিজস্ব চিত্র।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ