সঞ্জয় গঙ্গোপাধ্যায়, বারাকপুর: দশভুজা নয়, ইছাপুরের নবাবগঞ্জের ঘোষবাড়ির দুর্গা মূর্তি দু’হাতের। তাঁর এক হাতে থাকে ফুল, অন্য হাত থাকে আশীর্বাদের ভঙ্গিতে। এই পুজোর এবার ১২৯তম বর্ষ। এই বাড়ির পুজো শুরু করেন বীরেশ্বর ঘোষ। বৈষ্ণব মতে হরগৌরী রূপেই মাকে পুজো করা হয় এখানে। মাকে ভোগে দেওয়া হয় লুচি, সুজি, হালুয়া, মিষ্টি। রথযাত্রার দিন হয় কাঠামো পুজো। বাড়িতেই তৈরি হয় প্রতিমা।
এই পরিবারের অন্যতম কর্তা প্রবীর ঘোষ বলেন, আমাদের মায়ের রণসংহার মূর্তি নয়। মহিষাসুর, সিংহ কিছুই থাকে না। পুজোয় পুরোটাই নিরামিষ। বনেদি বাড়িতে পুজো পরিচালনা করা বর্তমানে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীকে আমার অনুরোধ, বারোয়ারি পুজোর মতো যদি বনেদি বাড়িগুলিকেও আর্থিক সাহায্য দেওয়া যায়, তাহলে আমাদের পক্ষে পুজো চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
প্রাচীন জনপদ নবাবগঞ্জের আরেকটি বনেদি বাড়ির পুজো হল ভট্টাচার্য বাড়ির পুজো। ২৭৮ বছরে পা দিল এই পুজো। এই পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য, বেলতলায় থাকা শিবলিঙ্গকে প্রথমে মা দুর্গারূপে পুজো করা হয়। এই পরিবারের পূর্বপুরুষ রামচন্দ্র তর্কালংকার বেলগাছের নীচে থাকা শিবলিঙ্গকে মা দুর্গা রূপে স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর থেকেই শিবলিঙ্গকে মা দুর্গা রূপে পুজো করা হয়। তাঁদের বিশ্বাস, শিবলিঙ্গের মধ্যেই মা আছেন। সেই পুজো হয়ে গেলে দুর্গা প্রতিমাকে পুজো করা হয়। মহালয়ার আগের দিনই প্রতিমা এসে গিয়েছে বাড়িতে। প্রতিপদ থেকেই শুরু হয় চণ্ডীপাঠ। পুজো শুরু দ্বিতীয়া থেকে।
জমিদারি দম্ভে নয়, টোল পণ্ডিতের মধ্যবিত্ত আবেগে আজও তেরো পুরুষের পুজো হচ্ছে ভট্টাচার্য পরিবারে। রামচন্দ্র তর্কালংকার ১৭৪৭ সালে মেদিনীপুর থেকে টোল খুলতে নবাবগঞ্জে এসেছিলেন। নতুন জায়গা, ধীরে ধীরে জমে ওঠে টোল। একদিকে টোলের জনপ্রিয়তা বাড়ে, অন্যদিকে শিক্ষক হিসেবে প্রভাব বাড়ে তর্কালংকারের। হয়তো এই সময়েই ভট্টাচার্যদের জমিতে দুর্গাপুজার সূচনা। অস্থায়ী হোগলা ঘরে হয় প্রথম পুজো। সেই থেকে উমা আজও মেয়েরূপে পুজিতা হন ভট্টাচার্য দালানে। সোনার গয়নায় সেজে ওঠেন মা। দেওয়া হয় অন্নভোগ। সপ্তমী থেকে নবমী, পাঁঠা বলি হয়। দশমীতে বলি দেওয়া হয় ফল। এখনও ভট্টাচার্য বাড়ির প্রতিমা বিসর্জনের পর এলাকার অন্যান্য প্রতিমা নিরঞ্জন হয়।
এই পরিবারের কর্তা পিন্টু ভট্টাচার্য বলেন, ২৯ জন শরিক মিলে আমরা পুজো করি। বেলতলায় শিবলিঙ্গকে পুজো দেওয়ার সময় পুরোহিত ছাড়া বাকিদের প্রবেশ নিষেধ। তারপর ঠাকুরদালানে মা দুর্গার পূজো হয়। মাকে দু’বার করে অন্ন ভোগ দেওয়া হয়। খিচুড়ি, সাদা ভাত, পাঁচ রকম ভাজা, তরকারি, চাটনি মিষ্টান্ন। তন্ত্রমতে পুজো হয় আমাদের বাড়িতে।