


মৃণালকান্তি দাস: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর সদস্য তথা আমেরিকার যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথ। যাঁর শরীরজুড়ে রয়েছে নানা দক্ষিণপন্থী ট্যাটু। তাঁর হাত জুড়ে আঁকা মধ্যযুগীয় ক্রুসেডার স্লোগান ‘ডিউস ভল্ট’। যার অর্থ, ‘ঈশ্বরের ইচ্ছা।’ যা মধ্যযুগের ক্রুসেডরদের রণহুংকার। আরও একটি ট্যাটুতে আরবিতে লেখা ‘কাফের’ অর্থাৎ ‘অবিশ্বাসী’। অনেকেই এর তীব্র সমালোচনা করে বলেন, আরবি শব্দ কাফের বলতে এমন কাউকে বোঝায়, যে জেনেশুনে মৌলিক ঐশ্বরিক সত্যকে অস্বীকার করে। এই ট্যাটু কেবল ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, মার্কিন যুদ্ধসচিবের ইসলামোফোবিয়ার স্পষ্ট প্রতীক। হেগসেথের বুকে জেরুজালেম ক্রুশের একটি ট্যাটুও রয়েছে। যা ক্রুসেডারদের ক্রুশ নামেও পরিচিত। হেগসেথ ট্রাম্পকে বলেন, ‘ক্রুসেডার ইন চিফ’। যা চরম দক্ষিণপন্থার ভয়ংকর বয়ান! মৌলবাদের বিজ্ঞাপন!
গত ৫ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমরা আমেরিকাকে আবারও ঈশ্বরের অধীনে এক জাতি হিসেবে উৎসর্গ করব।’ আমেরিকানদের জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার সরকার দেয় না, এই অধিকার এসেছে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছ থেকে। ট্রাম্প দাবি করেন, ২০২৫ সালে গত ১০০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাইবেল বিক্রি হয়েছে। অনেক গির্জায় উপস্থিতি বেড়েছে। তিনি গত বছর বিচার বিভাগে রিলিজিয়াস লিবার্টি কমিশন গঠন করেন। বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন অভিযোগ তোলে, এই কমিশন খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদকে উৎসাহ দিচ্ছে।
নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক আরব রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের অধ্যাপক জোসেফ মাসাদ লিখছেন, ‘আমেরিকার যুদ্ধসচিব হেগসেথ তাঁর বক্তব্য শুরু করেন বাইবেল থেকে মার্কের সুসমাচার পাঠ করে। বলেন, নাগরিকদের অধিকার এসেছে এক দয়ালু ও মমতাময় ঈশ্বরের কাছ থেকে, সরকারের কাছ থেকে নয়। আমেরিকা একটি খ্রিস্টান জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এখনও রক্তে আমরা সেই পরিচয় বহন করি। সরকারি অফিসারদের দায়িত্ব ঈশ্বরকে মহিমান্বিত করা।’ আমেরিকার মতো উদারপন্থী দেশের নেতাদের মুখে এসব ‘কট্টর মৌলবাদী বয়ান’ ভাবা যায়? মার্কিন উদারপন্থী সংগঠনগুলি ট্রাম্পের ‘কিচেন ক্যাবিনেট’-এর সদস্যদের বিরুদ্ধে ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ তুলেছে।
আমেরিকার মতো ‘মহান’ দেশকে ধর্ম কীভাবে আঁকড়ে ধরছে, তা টের পাওয়া যায় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকালীন সময়েও। মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (এমআরএফএফ) একটি মার্কিন পর্যবেক্ষক সংস্থা। যারা মার্কিন সেনাসদস্যদের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করে। সেই সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের কাছে ইমেলে অন্তত ২০০টি অভিযোগ এসেছে। অভিযোগ একটাই— তাদের কাছে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে ধর্মীয় ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মার্কিন সেনাদের বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ‘আর্মাগেডন’ বা বাইবেলের ‘শেষ সময়’ ডেকে আনবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নন-কমিশন অফিসার এমআরএফএফ-কে পাঠানো ইমেলে দাবি করেন, সেনা অফিসারদের কাছে নির্দেশ আসছে, সেনাদের জানাতে হবে— এই যুদ্ধ ‘ঈশ্বরের মহাপরিকল্পনার অংশ’। ওই অফিসার আরও দাবি করেন, এক কমান্ডার তার ইউনিটকে নাকি বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যিশু অভিষিক্ত করেছেন ইরানে সংকেতের আগুন (সিগন্যাল ফায়ার) জ্বালাতে, যাতে আর্মাগেডন শুরু হয় এবং তাঁর পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন চিহ্নিত হয়।’ তিনি ‘বুক অব রিভেলেশন’ থেকে আর্মাগেডন ও যিশুখ্রিস্টের প্রত্যাবর্তন সংক্রান্ত উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন।
ইজরায়েলি ও মার্কিন নেতারাও প্রকাশ্যে ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করছেন। মার্কিন বিদেশ সচিব মার্ক রুবিও বলেছেন, ‘ইরান ধর্মীয় উগ্র উন্মাদদের দ্বারা পরিচালিত। তাদের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।’ ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তোরাহ ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে ইরানকে প্রাচীন বাইবেলীয় শত্রু ‘আমালেক’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। ইহুদি ঐতিহ্যে ‘আমালেক’-কে ‘সম্পূর্ণ অশুভের’ প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘এই সপ্তাহের তোরাহ থেকে আমরা পড়েছি—‘আমালেক তোমাদের সঙ্গে যা করেছিল তা স্মরণ কর।’ আমরা স্মরণ করি এবং আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করি।’ এর অর্থ, নেতানিয়াহু আবারও আমালেকের বাইবেলীয় কাহিনি ব্যবহার করছেন— যেখানে ঈশ্বর ইজরায়েলিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন এক পৌত্তলিক জাতির পুরুষ, নারী, শিশু ও পশু হত্যা করতে। ইরানে গণহত্যাকে মান্যতা দিতে এটা বলা হচ্ছে, যেভাবে গাজার ক্ষেত্রেও বলা হয়েছিল।
ব্রিটেনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোলিয়ন মিচেল আল জাজিরাকে বলেন, এই সংঘাতকে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন মার্কিন-ইজরায়েল নেতারা। ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাসকে ব্যবহার করছেন, তাঁদের যুদ্ধকে ন্যায্যতা দিতে, যুদ্ধের পক্ষে জনমত সংগঠিত এবং সমর্থন আদায় করতে। কিন্তু, এভাবে শত্রুকে অমানবিক ও দানবীয় করে তোলা পরবর্তী সময়ে শান্তি প্রতিষ্ঠাকে আরও কঠিন করে তোলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিয়োতে মার্কিন খ্রিস্টান জায়নিস্ট যাজক জন হাগি বলেছেন, রাশিয়া, তুরস্ক, ইরান এবার ইজরায়েলের দিকে অগ্রসর হবে, আর ঈশ্বর ‘ইজরায়েলের শত্রুদের ধ্বংস করবেন’। আমেরিকায় এই ধরনের ধর্মীয় ভাষা ইভানজেলিক্যাল ও খ্রিস্টান জায়নিস্টদের মনোজগতে গভীর সাড়া ফেলে, কারণ তারা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে ‘শেষ সময়’-এর কাহিনির অংশ হিসেবে দেখেন। এতে সভ্যতাভিত্তিক ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে ‘আমরা বনাম ওরা’ বিভাজন তৈরি করা হয়— যেখানে সংঘাতকে সীমান্ত বা নীতিগত বিরোধ নয়, বরং জীবনযাপন বা বিশ্বাসের সংঘর্ষ হিসেবে দেখানো হয়। যুদ্ধকে কেবল কৌশলগত ভাষায় ন্যায্যতা দেওয়া কঠিন। কিন্তু ‘সভ্যতা বনাম উগ্রবাদ’ বা বাইবেলে বর্ণিত ‘সৎ বনাম অসৎ’ হিসেবে তুলে ধরলে জটিল আঞ্চলিক সংঘাত সাধারণ মানুষের কাছে সহজ নৈতিক বিভ্রমে পরিণত হয়। ইরান যুদ্ধ মূলত ভূরাজনৈতিক। কিন্তু ধর্মীয় ভাষা সমর্থকদের উজ্জীবিত করে এবং যুদ্ধকে নৈতিক রূপ দেয়। সেই কৌশলই নিয়েছেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু।
নেতানিয়াহু ও অন্য ইজরায়েলি কর্তারা গাজায় যুদ্ধের সময় প্যালেস্তিনীদের প্রসঙ্গে ‘আমালেক’ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। অতীতে মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও সামরিক অভিযানে বাইবেলীয় ভাষা ব্যবহার করেছেন। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসবাদী হামলার পর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘ক্রুসেড’ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। যদিও পরে হোয়াইট হাউস ব্যাখ্যা দেয়, মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বোঝাতে তিনি সেটি ব্যবহার করেননি। বিশ্লেষকরা বলছেন, যেকোনো যুদ্ধ নিজস্বতায় ধর্মতাত্ত্বিক নয়, বরং ভূরাজনৈতিক ঘটনা। কিন্তু এর চারপাশের ভাষা ক্রমেই পবিত্র প্রতীক ও সভ্যতাভিত্তিক বয়ান ব্যবহার করে। এতে সমর্থন জোগাড় সহজ হয়। কিন্তু ঝুঁকিও আছে—যখন যুদ্ধ পবিত্র ভাষায় রূপ পায়, তখন রাজনৈতিক আপস কঠিন হয়ে পড়ে, প্রত্যাশা বেড়ে যায় এবং কূটনীতিক সমাধান জটিল হয়ে ওঠে।
লক্ষ্য করুন, যুদ্ধের শুরুতেই ধর্ম ব্যবহৃত হয়েছে যুৎসই আকারে। আক্রমণটি হয়েছে ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব পুরিম উদযাপন শুরুর আগের মুহূর্তে। এটি উদযাপন করা হয় বাইবেলে উল্লিখিত একটি গল্প স্মরণ করে। যেখানে অতীতের পারস্য রাজ্যে (বর্তমান ইরান) ইহুদিদের ধ্বংস করার হাত থেকে রক্ষা করার একটি কাহিনি বর্ণিত। নেতানিয়াহু এই সময়টি বেছে নিয়েছেন অতীত গহ্বর থেকে বিদ্বেষের ফসিল তুলে এনে যুদ্ধের আগুন জ্বালাতে। ইজরায়েল সম্প্রসারণের জায়নবাদী প্রকল্প সফল করতে ইরানকে ধ্বংস করা তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। আর এই স্বপ্নপূরণে তিনি বিশ্বস্ত সহকারী হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন আমেরিকাকে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান সমর্থক গোষ্ঠী ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানরা। যাদের বড়ো অংশই খ্রিস্টান জায়নবাদী। এরাই ইহুদি জায়নবাদের জন্মদাতা ও অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। ইজরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এই জায়নবাদী ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের একজন বিশ্বস্ত উগ্র প্রতিনিধি। ২০০৮ সালে তিনি বলেছিলেন, আসলে প্যালেস্তিনীয় বলে কোনো কিছু নেই। গত বছর জুনে তিনি ট্রাম্পকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, স্বর্গের ডাকে কান পেতে ইরানে পারমাণবিক বোমা ফেলতে। জায়নবাদীদের বিশ্বাস, চার হাজার বছর আগে ঈশ্বর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইজরায়েলের শাসন স্থাপিত হবে। সেই পরিকল্পনারই অংশ ছিল প্যালেস্তিনীয়দের উচ্ছেদ করে ব্রিটেন ও আমেরিকার মদতে ১৯৪৮ সালে ইজরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। আজ ইরানকে ধ্বংস করে ইজরায়েল সম্প্রসারণের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য নিশ্চিত করাই ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান ও ইহুদি জায়নবাদীদের যৌথ স্বপ্ন। অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের স্বপ্ন বাস্তবায়নে নেতানিয়াহুর মধ্যযুগীয় মানসিকতা এই ইরান হামলাকে অনিবার্য করে তুলেছে। তার সহকারী হিসেবে কাজ করছেন ট্রাম্প।
ভয়ংকর মৌলবাদী শক্তি যেভাবে ক্ষমতা দেখায়, গর্বের সঙ্গে খুন-জখমের কথা বলে, আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো অত্যাচার চালায়, সেই রকমই আচরণ করছেন বিশ্বের প্রধান শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও তাঁর দলবল। তাঁর প্রধান গৌরব তাঁদের কাছে মানুষ খুন আর দেশ ধ্বংসের সর্বাধুনিক অস্ত্র রয়েছে। তাঁর প্রধান আকাঙ্ক্ষা সব দেশে তাঁদের কর্পোরেট সাম্রাজ্য নিশ্চিত হবে, কোনো প্রতিযোগী থাকবে না, ইচ্ছেমতো শুল্ক আরোপ থেকে সামরিক অভিযান চলবে। সবাই ভয়ে ‘নম নম’ করবে। এটা বিশ্বব্যবস্থার সর্বশেষ চিত্র, যেখানে সাম্রাজ্যবাদ নগ্ন মাস্তানতন্ত্রের রূপ নিয়েছে। যেখানে শান্তি মানে যুদ্ধ, উন্নয়ন মানে মানব বিপর্যয়, প্রতিশ্রুতি মানে প্রতারণা। একদিকে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনার কথা বলছেন, অথচ ইরানে বোমা হামলায় দেড়শো শিশুহত্যা তাঁর অনুভূতি স্পর্শ করে না। এসব মৃত্যু যেন আমেরিকার খ্রিস্টান ঈশ্বরের বেদিতে উৎসর্গ করা হয়েছে!
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিভাগের প্রধান বেন স্টিল সঠিক কথাই বলেছিলেন: উদার বিশ্ব তার শেষ ভোরটা দেখে ফেলেছে!