সংসার খরচের বোঝা আরো ভারী হল। শনিবার মধ্যরাতে রান্নার গ্যাসকে আরো দামি করে দিল মোদি সরকার। তিনমাসের মধ্যে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার! ফের বাড়ল গৃহস্থের রান্নার গ্যাসের দাম। এর আগে, বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বেড়েছে একাধিকবার। তবে এই নিয়ে তিনমাসে দ্বিতীয়বার বাড়ল ডোমেস্টিক বা গৃহস্থের হেঁশেলে ব্যবহার্য গ্যাসের দাম। এক ধাক্কায় সিলিন্ডার পিছু দাম বড়ল ২৯ টাকা! বর্ধিত দাম কার্যকর ধরা হবে রবিবার (৭ জুন) থেকে। গতকাল থেকে কলকাতায় গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য গ্যাসের দাম সিলিন্ডার (১৪.২ কেজি) পিছু বৃদ্ধি পেয়ে হল ৯৬৮ টাকা। এই দামটাই আগে ছিল ৯৩৯ টাকা। অর্থাৎ রান্নার গ্যাসের দাম হাজার টাকার ফলক থেকে আর সামান্যই দূরে। সরকারের পেট্রপণ্যের দামনীতি যা, তাতে একটি সিলিন্ডারের দাম হাজার টাকা ছুঁয়ে ফেলা, এমনকি অতিক্রম করা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা! রেহাই পাচ্ছেন না ছোটো সিলিন্ডার ব্যবহারকারীরাও। রবিবারের আগে বুকিং থাকলেও গ্রাহক নতুন বর্ধিত দাম মেটাতে বাধ্য হবেন।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধপরিস্থিতিতে সবার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পেট্রল আর ডিজেলের দামবৃদ্ধি। কারণ এই দুটি জ্বালানির দামবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ে অর্থনীতির সমস্ত ক্ষেত্রে। প্রথমেই বৃদ্ধি পায় পরিবহণ খরচ। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের লাইফলাইন যেহেতু পরিবহণ ব্যবস্থা, তাই আনুপাতিক হারে বেড়ে যায় সমস্ত পণ্য ও পরিষেবার দাম। সাম্প্রতিক অতীতে বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম একাধিক দফায় বৃদ্ধির ধাক্কা প্রথমেই পড়েছে খাদ্য ব্যবসায়। হোটেল, রেস্তরাঁ, ক্যান্টিন সর্বত্র খাবার প্রস্তুত করার খরচ বেড়ে গিয়েছে। কলকাতা, মুম্বই, দিল্লিসহ সমস্ত ছোট-বড়ো শহরে স্ট্রিট ফুড অত্যন্ত জনপ্রিয়। এসব খাদ্যও গ্যাসের আভেনে প্রস্তুত করা হয়। সামান্য চায়ের দোকানও চলে গ্যাসের ভরসায়। সব ক্ষেত্রেই খাবারের দাম বাড়াতে হয়েছে। তার ফলে ক্রেতা হারিয়েছেন বহু বিক্রেতা। এমনকি দোকান-ব্যবসায় ঝাঁপ ফেলে দিতেও বাধ্য হয়েছেন কেউ কেউ। বর্ধিত দাম দিলেই যখন তখন গ্যাস পাওয়া যাবে, সেই নিশ্চয়তাও আজ অতীত। তাই চালু হোটেল, রেস্তরাঁ, ক্যান্টিনের মেনুতেও কাটছাঁট হয়েছে বিস্তর। কোপ পড়েছে কর্মসংস্থানে। একযোগে কাজ হারাচ্ছেন রন্ধনশিল্পের শ্রমিকরা এবং গিগ ওয়ার্কাররা। স্বভাবতই বাণিজ্যিক গ্যাসের দামবৃদ্ধি নানা শ্রেণির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে আগেই। ১ জুন থেকে কলকাতায় সিলিন্ডার পিছু বাণিজ্যিক গ্যাসের দামবৃদ্ধি হয়েছে ৫৩ টাকা ৫০ পয়সা। তাতে সিলিন্ডারের দাম পড়ছে ৩২৫৫ টাকা ৫০ পয়সা।
এরই ঠিক পাঁচদিনের মাথায় ফের বাড়ল ১৪.২ কেজির ডোমেস্টিক সিলিন্ডারের দাম। এতদিন পর্যন্ত দফায় দফায় বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বেড়েছে। তার মাঝেও মোটামুটি মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে রাখা হয়েছিল ডোমেস্টিক রান্নার গ্যাসের দাম। এবার সেই সংযমটুকুও ভাঙল মোদি সরকার। তিনমাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার বাড়িয়ে দেওয়া হল। দেশের রাজধানী নয়াদিল্লিতে একদিন আগেই সিলিন্ডার পিছু ২৯ টাকা দাম বাড়ানো হয়। সেখানে দাম দাঁড়াল ৯৪২ টাকা। আগের দাম ৯১৩ টাকা ছিল নয়াদিল্লিতে। ভারতের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নতুন ঘোষণায় বর্ধিত দাম দাঁড়াবে মুম্বইয়ে ৯৪১.৫০ টাকা এবং চেন্নাইয়ে ৯৫৭.৫০ টাকা। গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য রান্নার গ্যাসের পাশাপাশি, কলকাতায় বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ ও ১০ কেজি সিলিন্ডারেরও দাম। ৫ কেজি সিলিন্ডারে ১০.৫০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৩৫৮.৫০ টাকা। আর ১০ কেজির নতুন দাম হয়েছে ৬৯১.৫০ টাকা। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, পশ্চিম এশিয়ায় অশান্তির প্রেক্ষিতে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে সমস্যা দূর হয়নি। এলপিজি আমদানিতে বাধা পাচ্ছে ভারত। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল এবং গ্যাস—দুটিরই দাম চড়া। ওইসঙ্গে তলানিতে পৌঁছে গিয়েছে ভারতীয় রুপির দাম। সব মিলিয়ে তেল সংস্থাগুলির দাবি, ভরতুকিযুক্ত রান্নার গ্যাস কম দামে বিক্রি করার ফলে তাদের বিপুল লোকসান হচ্ছে—লোকসানের পরিমাণ সিলিন্ডার পিছু ৬৫০ টাকা! সেই লোকসান কিছুটা কমাতেই গৃহস্থালিতে ব্যবহার্য এলপিজির দাম বাড়াতে হয়েছে। ব্যবসায় লাভ-লোকসান দুটিই স্বাভাবিক এবং অনিবার্য। অতীতে তেল ও গ্যাস থেকে সরকার বছরের পর বছর একবগ্গা লাভ ঘরে তুলেছে। সেই পরিমাণও বিপুল। তার অংশ নাগরিকদের দেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগ। তাহলে অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যখন লোকসান হচ্ছে, তার দায় পুরোটা জনগণের ঘাড়ে চাপানো হবে কোন নীতিতে? গরিব ও মধ্যবিত্ত এমনিতে গোদের জ্বালায় জ্বলছে, তার উপর বিষফোঁড়ার যন্ত্রণা না দিলেই কি নয়?