Bartaman Logo
২৭ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গণতন্ত্র এর পরেও টিকে থাকবে!

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ভোটাধিকার ও সাংবিধানিক ভূমিকা নিয়ে বিশ্লেষণ। বিচার বিভাগের ক্ষমতা ও নাগরিকদের অধিকার জানুন। বিস্তারিত পড়ুন।

গণতন্ত্র এর পরেও টিকে থাকবে!
  • ৮ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: একজন আইনজীবী হিসাবে  আমি বুঝি যে, আদালতের হয়ে যখন দুজন মাননীয় বিচারপতি কথা বলেন, তখন আসলে ভারতের সুপ্রিম কোর্টই কথা বলে। সুপ্রিম কোর্ট একটি সাংবিধানিক আদালত এবং এটিই আপিল নিষ্পত্তির সর্বোচ্চ আদালত। কিছু বিষয়ে এর ‘মূল এক্তিয়ার’ (অরিজিনাল জুরিসডিকশন) রয়েছে; সমস্ত আদালতের উপর এর তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা আছে; এটি নিজের রায় পুনর্বিবেচনা ও বাতিল করতে পারে; স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (সুয়ো মটু) কোনো মামলা বা বিষয় এক্তিয়ারে নিতে পারে; বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি বা সিট) বা কমিশন গঠন করতে পারে; কোনো বিষয় তদন্তের জন্য পুলিশ সংস্থাকে নির্দেশ দিতে পারে; দেওয়ানি বা বাণিজ্যিক বিরোধ মধ্যস্থতা বা সালিশের জন্য পাঠাতে পারে; এক হাইকোর্টের এক্তিয়ারভুক্ত মামলা অন্য হাইকোর্টে স্থানান্তর করতে পারে; কোনো নারী ও পুরুষের বিবাহবিচ্ছেদ ঘোষণা করতে পারে; আদালত অবমাননার দায়ে কাউকে শাস্তি দিতে পারে; ভারতের সংবিধানের বিষয়ে এই ন্যায়্যালয়ের ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়; এবং ‘পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার’ নিশ্চিত করতে যেকোনো আদেশ জারি করার ক্ষমতা এই আদালতের রয়েছে। বলা হয়ে থাকে যে, সুপ্রিম কোর্ট বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আদালত। 

Advertisement

সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার 
এর বিশাল ক্ষমতার পরিসরে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘স্টেট অফ মাদ্রাজ বনাম ভি জি রাও’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নিজেকে ‘সেন্টিনেল কুই ভাইভ’—অর্থাৎ সংবিধানের এক সতর্ক প্রহরী—হিসাবে  অভিহিত করেছিল। নির্বাচন সম্পর্কে সংবিধানে কী বলা হয়েছে? 
#  ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) উপর সংসদ এবং প্রতিটি রাজ্যের আইনসভার নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণ এবং নির্বাচন পরিচালনার তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছে। 
#  ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বিধান রাখা হয়েছে যে, ‘হাউস অফ দ্য পিপল’ (লোকসভা) এবং রাজ্যগুলির বিধানসভার নির্বাচন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হবে। (‘ভোটদানের অধিকার একটি সাংবিধানিক অধিকার।’ — সুপ্রিম কোর্ট) 
এই দুটি অনুচ্ছেদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। ভারতের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে অন্তর্ভুক্ত করে ভোটার তালিকা প্রস্তুত করতে নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে বাধ্য। স্বাভাবিকভাবেই, সংবিধান, নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫ এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫০-এর অধীনে নাগরিকত্ব ও বসবাসের মতো আরো কিছু যোগ্যতার শর্তাবলি নির্ধারিত রয়েছে। এই প্রতিটি আইনে এমন একটি কর্তৃপক্ষ ও পদ্ধতি নির্দিষ্ট করা হয়েছে যার মাধ্যমে যাচাই করা হয় যে, কোনো ব্যক্তি আইনের শর্তাবলি পূরণ করেছেন কি না। 
সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের মূল ভিত্তি হল সকলকে অন্তর্ভুক্ত করা। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়াটা একটি ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ; তাই এর জন্য সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা এবং লিখিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা আবশ্যক, যা বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতাভুক্ত।  
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ 
‘অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস বনাম নির্বাচন কমিশন’ মামলায় (বিহারের এসআইআর কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে) ২৭ মে, ২০০৬ তারিখে প্রদত্ত রায়ে সুপ্রিম কোর্ট নিম্নোক্ত পর্যবেক্ষণগুলি তুলে ধরেছিল: 
•  কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, ২০০৩ সালের ভোটার তালিকা—যেখানে ১-১-২০০৩ তারিখটিকে যোগ্যতার ভিত্তি-তারিখ (কোয়ালিফাইং ডেট) হিসাবে  ধরা হয়েছিল—তাকেই যোগ্যতার প্রমাণ হিসাবে  গণ্য করা হবে (যদি না তা খণ্ডন করা হয়)। ২০০৩ সালের তালিকায় নাম নেই এমন কোনো ব্যক্তিকে ভোটার হিসাবে  নিজের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য এক বা একাধিক নির্ধারিত নথিপত্র দাখিল করতে হবে। [ইন্দ্রজিৎ বড়ুয়া (১৯৮৫) এবং লাল বাবু হোসেন (১৯৯৫) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নিশ্চিত করেছিল যে, ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নামগুলির ক্ষেত্রে নাগরিকত্বের বিষয়টি ধরে নেওয়া বা অনুমান করার (প্রিজাম্পসন অফ সিটিজেনশিপ) অধিকার রয়েছে।] 
•  যাচাই-বাছাইয়ের সময় কোনো ব্যক্তির যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে, ইআরও বা এআরও-কে কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করতে  হত; এতে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রস্তাবের কারণগুলি উল্লেখ করা এবং যুক্তিসংগত ও বিস্তারিত আদেশ (রিজনড অ্যান্ড স্পিকিং অর্ডার) প্রদান করা বাধ্যতামূলক ছিল। ইআরও-র কোনো সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ব্যক্তি জনপ্রতিনিধিত্ব আইন (আরপি অ্যাক্ট), ১৯৬৯-এর ২৪(ক) ধারার অধীনে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আপিল করার অধিকারী হবেন। এছাড়া, ২৪(খ) ধারার অধীনে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিকের (সিইও) কাছে দ্বিতীয় আপিল দায়ের করা যেতে পারে। 
•  ভোটার তালিকা প্রস্তুত বা সংশোধনের সময় নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয়গুলি খতিয়ে দেখার (সুপ্রিম কোর্টের ভাষায় যা ‘একটি সীমিত অনুসন্ধান’ (লিমিটেড এনকোয়ারি) ক্ষমতা নিঃসন্দেহে কমিশনের রয়েছে... গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—এই পুরো প্রক্রিয়াটিই বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতাভুক্ত। 
রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিহারে এসআইআর কার্যক্রমের ফলে চূড়ান্তভাবে প্রায়... ২০০৩ সালের ভোটার তালিকা থেকে ৪৭ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। বিহারে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে প্রতি ১০০ জন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের মধ্যে ছ-জনের নাম বাদ পড়েছিল।  
বাস্তব প্রমাণ 
বিহারের এসআইআর মামলার রায় ঘোষণার আগেই পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর কার্যক্রম শুরু ও সম্পন্ন করা হয়। এতে তালিকা থেকে বাদ চলে যায় কয়েক লক্ষ নাম। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে অ্যাড-হক বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এর একটি বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনাও করা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) তরফে প্রকাশিত তথ্য এবং পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর কার্যক্রমের সরকারি পরিসংখ্যান-ভিত্তিক রিপোর্ট অনুসারে চিত্রটি ছিল নিম্নরূপ: 
পশ্চিমবঙ্গই একমাত্র রাজ্য যেখানে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়; বিহারে সেটা করা হয়নি। আদালতের রায় এবং সেই বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার 
ফলাফল পাশাপাশি রেখে বিচার করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গের নমুনা-পর্যালোচনায় প্রাপ্ত সাফল্যের হার (৬১.৪৩ শতাংশ) বিহারে তালিকাবহির্ভূত নামগুলির (৪৭ লক্ষ) ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলে, এমন সিদ্ধান্তে আসা অযৌক্তিক নয় যে—২৮ লক্ষ ৮৭ হাজার ২১০ জন 
নরনারী সেখানে ভোটার লিস্টে ফের অন্তর্ভুক্ত হতে পারতেন। এই সিদ্ধান্তটি নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) দাবির অসারতাই প্রমাণ করে। একইসঙ্গে উন্মোচিত করে এসআইআর প্রক্রিয়ার ত্রুটি, নির্ভরযোগ্যতার অভাব ও বিশ্বাসযোগ্যতাহীন চরিত্রকে। নির্বাচন কমিশনের এমন ‘আশীর্বাদের’ পরেও গণতন্ত্র টিকে থাকবে তো! 
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ