Bartaman Logo
২৬ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

নিরিবিলি পাহাড়ি শহর ল্যান্সডাউন

রোদ ঝলমলে পাহাড়ি শহর, কান পাতলেই শুনতে পাবেন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। মনোরম আবহাওয়ায় কোলাহল থেকে দূরে কগেকটা দিন কাটিয়ে আসতে পারেন অনায়াসে।

নিরিবিলি পাহাড়ি শহর ল্যান্সডাউন
  • ৭ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রোদ ঝলমলে পাহাড়ি শহর, কান পাতলেই শুনতে পাবেন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। মনোরম আবহাওয়ায় কোলাহল থেকে দূরে কগেকটা দিন কাটিয়ে আসতে পারেন অনায়াসে।

Advertisement

সময়টা অক্টোবরের শেষের দিক। আমি তখন দিল্লির কাছে নয়ডাতে ছিলাম বেশ কিছুদিন। সেখানে কাজ শেষ হলে ভাবলাম উত্তরাখণ্ডের ল্যান্সডাউন শহরে দু’-তিন দিনের জন্য ঘুরে আসার কথা। নয়ডা থেকে খুব ভোরে গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম ল্যান্সডাউনের উদ্দেশে। মাঝপথে একটা ধাবাতে ব্রেকফাস্ট সেরে আবারও পথচলা শুরু করলাম। গাড়ি ক্রমশ পাহাড়ি রাস্তা ধরল। আর চারদিকের প্রাকৃতিক দৃশ্য পরিবর্তন শুরু হল। গাড়ি যত পাহাড়ি রাস্তা ধরে উপরে উঠতে লাগল, লক্ষ করলাম চারদিকের প্রাকৃতিক শোভা সবই বদলে গিয়েছে। বড় বড় ওক গাছের ছাওয়ায় ছাওয়ায় পথ গড়িয়ে যাচ্ছে। গাড়ি চলছে সেই পথ ধরে। পাহাড়ি পথের মনোরম শোভা উপভোগ করতে মাঝপথেই গাড়ি থামালাম। পাকা রাস্তা ছেড়ে কাঁচা মেঠো পথ ধরে নেমে গেলাম খানিক দূর। চারদিকে শুধুই ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। বাকিটা নিস্তব্ধ প্রকৃতি। গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে সূর্যের আলো খেলে যাচ্ছে। সেই পথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছনোর জন্যও উতলা হয়েছে মন। তাই আবারও যাত্রা শুরু করলাম।
ল্যান্সডাউনে হোটেল আগে থেকেই বুক করা ছিল। যখন পৌঁছলাম ঘড়িতে পৌনে তিনটে বেজে গিয়েছে। বাতাসে শীতের আমেজ। আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। হোটেলের ঘরগুলো একটু অদ্ভুত ধরনের। রিসেপশন থেকে লিফটে করে নীচের দিকে নেমে ঘরে পৌঁছতে হয়। ঘরে ঢুকেই স্নান সেরে লাঞ্চ অর্ডার করলাম। রুম সার্ভিসের লোকটা বারবার বলে গেল ভুলেও যেন দরজা খুলে না রাখি। তাহলেই নাকি বাঁদর ঢুকে পড়বে ঘরে! ঘরের সামনে ওক, পাইন গাছের জঙ্গল। আর নিশ্ছিদ্র নীরবতা। 
লাঞ্চ সেরে রওনা দিলাম শহরটা ঘুরে দেখতে। প্রথমেই গেলাম ব্রিটিশ আমলে তৈরি ‘হন্টেড প্লেস’ দেখতে। এটা আসলে একটি চার্চ। রাস্তা থেকে একটু উপরে হেঁটে উঠতে হয়। বেশ পুরনো এই গির্জা। দেখলাম এক বিচিত্র নিয়ম এখানে। জুতো খুলে ঢুকতে হয়। এর আগে যত চার্চে গিয়েছি কোথাও এমন নিয়ম দেখিনি। তাই একটু অবাক লাগলেও জুতো খুললাম। ভিতরে ঢুকে চোখে পড়ল বড় বড় ওক কাঠের বিম দিয়ে ছাদ তৈরি করা হয়েছে। চার্চের ভিতরে রয়েছেন প্রভু যিশুর ক্রুশবিদ্ধ চিরাচরিত মূর্তি। চারদিকে ভীষণ শান্ত পরিবেশ। এখানে প্রতি সপ্তাহে প্রার্থনা হয়। তার সময়ও লেখা রয়েছে। বেশ ভালো লাগল চার্চের পরিবেশ। লোকজন থাকলেও, সবাই কেমন শান্ত! চারপাশ চুপচাপ। চার্চের শান্ত পরিবেশ ভালোরকম উপভোগ করে বেরিয়ে এলাম। ফের চমক। যাওয়ার সময় জিনিসটা চোখে পড়েনি। দেখলাম কাচের ঘেরাটোপে বেশ বড় মাদার মেরি ছোট্ট যিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। চার্চের পরিবেশ মনোরম। পাহাড়ে ঘেরা চারপাশ। কিন্তু হন্টেড কেন তা টের পেলাম না। আঞ্চলিক কাউকে প্রশ্ন করেও সঠিক উত্তর মিলল না। 
হোটেলের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শুনি কান ঝালাপালা করা ঝিঁ ঝিঁ পোকার চিৎকার। এই ডাক আর নৈঃশব্দ্য উপভোগ করার জন্য ঘরে না ঢুকে বাইরের করিডোরে গিয়ে দাঁড়ালাম। ল্যান্সডাউন শহরটা খুবই ছোটো। কোনো কোলাহল নেই। ট্রাফিকের সমস্যা, অকারণ মানুষের চিৎকারও নেই। আছে শুধুই প্রকৃতির টান ও তা উপভোগ করার দারুণ সুযোগ। মন ভালো হয়ে গিয়েছিল এখানে এসে। তবে যত রাত বাড়তে থাকল, ঠান্ডার প্রকোপও তত বাড়তে লাগল। দ্রুত ডিনার সেরে শুয়ে পড়লাম। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে ঘুম আসতেও দেরি হল না।
পরের দিন সকালেই রওনা দিলাম ল্যান্সডাউনের ভুল্লাতাল লেক দেখতে। সেনাবাহিনী এই তাল রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্বে। টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকলাম। লেকে বোটিং করার সুযোগ রয়েছে। তার টিকিট অবশ্য আলাদাভাবে কাটতে হয়। বোটিংয়ের টিকিট কাটার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সেনাবাহিনীর এক জওয়ান এসে লাইফ জ্যাকেট পড়িয়ে দিলেন। দেখলাম কয়েকটা বোট ঘুরছে লেকে জুড়ে। সব বোটের জন্য সময় নির্দিষ্ট করা রয়েছে। একটা বোট ফিরে আসতেই চেপে বসলাম। এগুলো সবই প্যাডেল বোট। নিজেকেই চালাতে হয়। পায়ে প্যাডেল আর হাতে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে দিক নির্দেশ করতে করতে ভেসে পড়লাম জলে। বেশ বড় এই ভুল্লাতাল লেক। পুরো লেকটা ঘুরতে প্রায় আধঘণ্টার মতো সময় লাগল। বোট থেকে দেখেছিলাম, একটা ঝুলন্ত ব্রিজ লেকের উপর দিয়ে গিয়েছে। বোট থেকে নেমে গেলাম সেই ব্রিজে। ব্রিজটা দুলছিল। যদিও লোহার জাল দিয়ে তৈরি। দোদুল্যমান ব্রিজ পায়ে হেঁটে পেরিয়ে ওপাড়ে গিয়ে দেখলাম, সেনাবাহিনীর ক্যান্টিন রয়েছে। কিন্তু সেখানে সেদিনের জন্য বিক্রি করতে আনা সব খাবারই প্রায় শেষ। এঁরা আবার ফ্রেশ খাবার ছাড়া রাখে না। আমার ভাগ্যে জুটল একটা ক্রিম রোল। মুখে দিতে মনে হল অমৃত খাচ্ছি। আবার ব্রিজ পেরিয়ে ফিরে এসে বাইরে বেরিয়ে এলাম। 
পরের গন্তব্য দারোয়ান সিং মিউজিয়াম। গাড়োয়াল রাইফেলসের ইতিহাস আর বিভিন্ন সামরিক যন্ত্রপাতি দর্শকদের দেখানোর জন্য রাখা রয়েছে এই মিউজিয়ামে। মোবাইলে ছবি তোলা নিষেধ। টিকিট কেটে ঢোকার আগেই শারীরিক পরীক্ষা হয়। তারপর ভিতরে যাওয়ার ছাড়পত্র মেলে।  নানা ধরনের বন্দুক, কামান ইত্যাদি রয়েছে এখানে। মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে দেখি সেনাবাহিনীর মহড়া চলছে। আগ্রহভরে সেই মহড়া দেখব বলে যেই না পা বাড়িয়েছি, অমনি এক সেনা জওয়ান আমায় বাধা দিলেন। জানালেন, সিভিলিয়ানদের ওই জায়গায় যাওয়া নিষিদ্ধ। 
অগত্যা উলটো দিকে খানিকটা হেঁটে এসে ঢুকলাম সেনাবাহিনীরই তৈরি একটি পার্কে। এই পার্কের মুল আকর্ষণ একটা সামরিক যুদ্ধবিমান। তাছাড়াও সেনাবাহিনীর অধীনে বেশ যত্নে লালিত এই পার্ক। ঘুরে দেখতে মন্দ লাগে না। এরপর স্থানীয় বাজারে গিয়ে একটু খাওয়াদাওয়া করলাম। এরপর যাব ল্যান্সডাউন থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে এক ভিউ পয়েন্ট দেখতে। এখান থেকে পুরো ল্যান্সডাউন শহরটা পাখির চোখে দেখা যায়। দেখে মন ভরে গেল। শহরের গায়ে তখন পড়ন্ত বিকেলের রোদ পড়েছে। আরও মায়াময় হয়ে উঠেছে তার রূপ। এই দৃশ্য উপভোগ করতে করতেই হঠাৎ একরাশ কুয়াশায় ঢেকে গেল শহরের একাংশ। ক্রমশ সন্ধে নামল পাহাড় জুড়ে। শহর আলোয় ঝলমল করে উঠল। পাহাড়ের গায়ে বিন্দু বিন্দু আলোর ঝলক এক অন্যরকম ছবি এঁকে দিয়ে গেল মনে। এরপর পাহাড়ি নৈঃশব্দ্য ছেড়ে কেজো যাপন শুরু করতে হবে। 

কীভাবে যাবেন: 
কলকাতা থেকে ট্রেন বা প্লেনে দিল্লি  পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে ল্যান্সডাউন যাওয়া যায়। এছাড়া বিমান বা রেল পথে দেরাদুনর পৌঁছে সেখান থেকেও সড়কপথে যেতে পারেন ল্যান্সডাউন। তবে ল্যান্সডাউনের সবচেয়ে কাছের রেল ষ্টেশন কোটদ্বার। সেখান থেকে সড়কপথে ল্যান্সডাউন যাওয়া যায়। শহরে বিভিন্ন মানের হোটেল রয়েছে। আপনার পছন্দ অনুযায়ী বেছে নিতে পারেন।

প্রীতম সরকার

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ