দুপুরবেলা স্কুল ছুটির ঘণ্টা শোনা যাচ্ছে ঢং-ঢং করে। লাল রঙের দোতলা বাড়িটা থেকে হুড়োহুড়ি করে ছেলেগুলো বেরচ্ছে। স্কুলের গেটের বাইরে ফুচকা, কাঠি আইসক্রিম, কুলের আচার, আলুকাবলি, আমসি...আরও কতকিছু। সব শেষে পিঠের ব্যাগ ঠিক করতে করতে আসছে যে ছেলেটা, তার এই একফোঁটা চেহারা। ছেলেটার জন্য, একটু আগেই বেরিয়েছে এরকম গোটা দশেক ছেলে দাঁড়িয়ে। কী একটা বলছে ছেলেটাকে, কী বলছে বলা মুশকিল যদিও। ছেলেপুলেগুলো হো হো করে হাসছে, প্রাণখোলা হাসি। দ্বিধা নেই, সংকোচ নেই, আর কেনই বা থাকবে? হয়তো খুবই মজার কথা যাতে এক্ষুনি, এই এক্ষুনি হো হো হি হি... না করলেই নয়। কয়েকটা ছেলের হিরো সাইকেল, একজনের বাঁকা হ্যান্ডেল, তারের ব্রেকের সাইকেল। পাশাপাশি হাঁটছে একদল ছেলেপুলে। দুপুরের পড়ন্ত রোদেও ছেলেগুলোর চোখের তারা জ্বলজ্বল করে ওঠে, ঝলমল করে ওঠে নিষ্পাপ শৈশব।
শিশুদিবসে শিশুদের নিয়ে কিছু লিখব বলে শুরু করেছিলাম। কিন্তু যতবার লিখতে যাচ্ছি অবাধ্য মন নিজের ছোটবেলার দিকে দৌড় দিচ্ছে, তাকে কিছুতেই আর এখনকার সময়ে ধরে বেঁধে রাখতে পারছি না। মানুষের ছোটবেলা, স্কুল, বয়ঃসন্ধি, একটু একটু করে বড় হয়ে ওঠা, এই সবকিছু নিয়ে একটা স্মৃতির রংচঙে মোজাইক। ইউরোপে গিয়ে অনেক চার্চে দেখেছিলাম বিরাট বিরাট কাচের জানলা, আর সেই জানলায় লাল হলদে সবুজ কত কত রঙ! ইংরিজিতে বলে ‘স্টেনড গ্লাস উইন্ডো’, আক্ষরিক বাংলায় ‘দাগ লাগা কাচের জানলা’। দাগ শব্দটায় একটু মন খুঁতখুঁত করছে বটে, কিন্তু সে করুক। দাগ আচ্ছে হ্যায়! প্যারিসে গ্যারে ডু নর্ড স্টেশন থেকে হাঁটতে হাঁটতে এবং ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে সেন্ট চ্যাপেল গির্জায় পৌঁছে হতবাক হয়ে গেছিলাম। তাক লাগানো গোটা পনেরো স্টেনড গ্লাস উইন্ডো। মনে হয়েছিল আমাদের শৈশবের স্মৃতি অনেকটা এরকম, দাগ লাগা ঝলমলে কাচের জানলা।
লন্ডনের ক্যানারি হোয়ার্ফ-এর মেল রুমে ক্যাথি বলে একজন বছর পঞ্চাশের আইরিশ মহিলা বসতেন। ভয়ানক রাশভারী, চোখে মোটা কাচের চশমা। কখনও মেল এলে, ক্যাথি ডেস্কে এসে দিয়ে যেতেন। একদিন লাঞ্চের পর দেখেছিলাম, ক্যাথি মেল রুমে আসা সব পার্সেলের বাবল-র্যাপ জমিয়ে রাখেন আর লুকিয়ে লুকিয়ে বাবল-র্যাপ ফাটান কাজের ফাঁকে ফাঁকে। ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে একজন ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন, আদতে ভারতীয় কিন্তু অনেক বছর ফরাসি নাগরিক। ক্লাসের ব্রেকে দেখতাম অধ্যাপক বারান্দায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ক্রিকেটের বোলিং করার রান আপ করে ফেলতেন। অবচেতন মনেই করতেন, আমি নিশ্চিত। আমি দেখে ফেলায় মিতভাষী অধ্যাপক ভারী লজ্জায় পড়েছিলেন।
বহু বছর আগে কলকাতায় চাকরি করার সময়, ম্যানেজারের ম্যানেজার, মানে যারে কয় সুপার-বস আরকি, সকালবেলার মিটিংয়ে বলেছিলেন শরীরটা একদমই জুতের নেই বলে আজ তিনি ছুটি নেবেন। সেদিন চন্দননগরের বাগবাজারের মোড়ে আমি সেই সুপার-বসকে আবিষ্কার করেছিলাম, জগদ্ধাত্রী পুজোর নবমীর সন্ধেতে। বছর পঞ্চাশের সুপার-বস সাবান জলে ভরা কাচের একটা লম্বা লাঠি হাতে নিয়ে চারদিকে বুদবুদ ছড়াচ্ছেন! মানুষ বড় হয়ে গেলে ভিতরের শিশুটাকে একটা বাক্সে বন্দি করে রাখে। আলেকালে বাক্স খুলে যায়, শিশুটা একছুটে বাইরে এসে দাঁড়ায়। বুদবুদের মতো ছড়িয়ে যায় আমাদের আশপাশ জুড়ে।
এই লেখাটা যখন লিখছি, তখন চাকরিসূত্রে আমি বাংলা থেকে, আমার শেওড়াফুলির মফস্সলের উঠোনটার থেকে অনেকটা দূরে। প্রবাস মানে পরের দেশ, পরবাস। নিজের মাটি ছেড়ে সাতসমুদ্র তেরো নদীর পারে গিয়েও শিকড়কে নিয়ে লিখছি নিরন্তর। শিকড় মানুষের অস্তিত্ব, শিকড় মানুষটার শৈশব। আমার সামনের জানলা দিয়ে নবি মুম্বইয়ের আরব সাগরের খাঁড়ির এলোমেলো হাওয়া। নভেম্বরেও অল্প গরমভাব। সকালবেলা খাঁড়ির পাশের ম্যানগ্রোভের দিকে হাঁটতে গিয়ে ভাবছিলাম লেখাটা নিয়ে, কী লিখি! বুনিয়াদ লেখা সোজা না, সেই আয়নায় রোদ ঝলসায়। বাঁকা হ্যান্ডেল, তারের ব্রেকের সাইকেল চালানো ছেলেটা কয়েক দশক পর তাই ইতস্তত করে।
মানুষ কেন পিছনে তাকায়, শৈশবে ফিরে যেতে চায়? যখন পিছন ফিরে তাকাই, মনে হয় চুপ করে ট্রেনের জানলায় বসে আছি, স্মৃতির হাওয়ায় চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ট্রেনের জানলা থেকে দেখছি মাঠ, পুকুর, নদী, ছাড়িয়ে আছে একটা এত্ত বড় তেপান্তর। অনেক দূরে তেপান্তরের মাঠে জেগে আছে আবছা জলরঙে ঘেঁটে যাওয়া দেশের বাড়ি, পুকুরপাড়ে দৌড়চ্ছে শিশুর দল। একটার পর একটা স্টেশনে ট্রেন দাঁড়াচ্ছে। চাইলেই নেমে যেতে পারি অনায়াসে যে কোনও স্টেশনে, শুধু চাইলেই। হাঁটতে পারি শুনশান স্টেশন চত্বরে। ট্রেন চলে যাবে ঘটাং ঘটাং শব্দ করতে করতে তেপান্তরের মাঠ চিরে।
আমি, আপনি, আমরা সবাই শৈশব, কৈশোর পার করে প্রৌঢ়ত্বের দরজায় দাঁড়িয়েও একটা স্টেশনে নেমে দাঁড়াই। হয়তো অবচেতনে, কখনও বাবল-র্যাপ ফাটানোয়, কখনও মেলার মাঠের পাশে একটা জলের গামলায় ফটফট শব্দ করে ঘুরতে থাকা টিনের নৌকোর দিকে তাকিয়ে। দেখি স্কুলের মাঠে দৌড়চ্ছে শিশুর দল। চেলাকাঠকে ব্যাট বানিয়ে ক্রিকেট, টিফিন পিরিয়ডে কুমির তোর জলকে নেমেছি, ছুটির পর ফ্যাক্টরি মাঠে দু’হাত ছেড়ে সাইকেল চালানোর কায়দা। কিছু স্মৃতি আবছা, জলরঙে ঘেঁটে যাওয়া ছবির মতো। তাও আপ্রাণ তাকিয়ে থাকি সুড়ঙ্গের এপার থেকে। শিশুর দল তাকায় আমার দিকে, হাত নাড়ে, হাসে। দেখি সেই ছেলেপুলের মধ্যে থেকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে আমার শৈশবের আমি।
আসছে শিশু দিবস। শুভেচ্ছা জানাই সকল শিশুকে। আপনার, আমার মধ্যে যে শিশু আজও চিরজাগরুক, তাকেও।
• অঙ্কন: সুমন মুখোপাধ্যায়