নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: রপ্তানিকারক সংস্থাগুলিকে কোটি কোটি টাকা মূল্যের ভেনামি চিংড়ি বিক্রি করে পেমেন্ট পাচ্ছেন না পূর্ব মেদিনীপুরের বহু চিংড়ি চাষি ও ব্যবসায়ী। ক্ষতিগ্রস্তদের বেশিরভাগই ঋণখেলাপি হয়ে এই পেশা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এর ফলে পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় ভেনামি চিংড়ি চাষ দ্রুত কমছে। যেকারণে কর্মহীন হয়ে পড়ছেন বহু মানুষ। ক্ষতিগ্রস্তরা অ্যাকোয়া ফামার্স অ্যান্ড ফিশারমেন ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের ব্যানারে এনিয়ে লড়াই করছেন। গতবছর ২৮অক্টোবর এনিয়ে মৎস্যদপ্তরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিবের অফিসে বৈঠকও হয়। সেখানে এক্সপোর্ট সংস্থা থেকে বকেয়া পেমেন্ট ইস্যুতে স্থানীয় প্রশাসন ও থানায় অভিযোগ জানাতে বলা হয়। সেইমতো ক্ষতিগ্রস্ত চাষি ও ব্যবসায়ীরা নথি নিয়ে বিভিন্ন থানা, মৎস্য দপ্তর এবং সরকারি অফিসে অভিযোগ জানিয়েছেন। কিন্তু, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। প্রায় ৫০০কোটি টাকার চিংড়ি সরবরাহ করেও পেমেন্ট মিলছে না। অনেক এক্সপোর্ট এজেন্সি এজেন্ট নিয়োগ করে ব্যবসায়ী ও চাষিদের কাছ থেকে চিংড়ি কিনত। সেইসব এজেন্টদের অনেকেই বিপুল পরিমাণ টাকা ঝেড়ে গাঢাকা দিয়েছে।
রাজ্যের মৎস্যমন্ত্রী বিপ্লব রায়চৌধুরী বলেন, ভেনামি চিংড়ি চাষিদের পেমেন্ট নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যা আছে। আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত। এনিয়ে আলোচনা চলছেই।
মারিশদার শঙ্করকুমার মাইতি প্রায় ২০বছর ধরে ভেনামি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ১৬হাজার বর্গফুটের ফিশারি রয়েছে তাঁর। প্রায় তিন কোটি টাকা না পেয়ে ওই ব্যবসায়ীর এখন পথে বসার মতো অবস্থা। বাড়ি মর্টগেজ রাখা আছে। দখল নিতে ব্যাঙ্ক নোটিস পাঠিয়েছে। দুই ছেলের পড়াশোনাও বন্ধ।
কাঁথির ভেনামি ব্যবসায়ী মলয় দাস এক্সপোর্ট এজেন্সিকে প্রায় দেড় কোটি টাকার মাছ দিয়েও পেমেন্ট পাননি। ৯৫লক্ষ টাকার একটি চেক দিলেও সেটি বাউন্স করেছে। মলয়বাবুর একটি বাড়ি দখল নিয়েছে ব্যাঙ্ক। নাচিন্দার অরুণ দাস ২কোটি ১৯লক্ষ টাকা বকেয়া না পেয়ে আদালতে মামলা করেছিলেন। সেই মামলায় একজন গ্রেফতারও হয়। তারপরও বকেয়া পাননি। ভগবানপুর-২ ব্লকের ঘোলবাগদার কিঙ্কর প্রধান চিংড়ি সরবরাহ করেও ৪কোটি ৬১লক্ষ টাকা পাননি। এক্সপোর্ট এজেন্সি এবং এজেন্টদের কাছ থেকে টাকা না পেয়ে তিনি সাধারণ চাষিদের চিংড়ির দাম মেটাতে পারেননি। এই অবস্থায় সুইসাইড নোট লিখে নিজেকে শেষ করে দেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। পরিবারের লোকজন ওই অবস্থা থেকে তাঁকে রক্ষা করেন। ব্যবসায়ীদের অনেকেই স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে লোন নেন। সেই ঋণের ফাঁসেও অনেকেই জর্জরিত।
মারিশদা থানার বলাগেড়িয়ার মানিক জানা, কাঁথির আলদারপুটে প্রফুল্ল সাউয়ের মতো কিছু ব্যবসায়ী পাওনা টাকা না পেয়ে এরআগে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। অ্যাকোয়া ফামার্স অ্যান্ড ফিশারমেন ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের সদস্য শঙ্করকুমার মাইতি বলেন, সব এক্সপোর্ট সংস্থা খারাপ নয়। কিন্তু, বেশকিছু বিনিয়োগ সংস্থা পূর্ব মেদিনীপুরের চিংড়ি চাষিদের কোটি কোটি টাকা পেমেন্ট করেনি। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০কোটি টাকা হবে। সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক মদনমোহন মণ্ডল বলেন, মৎস্যমন্ত্রী থেকে পূর্ব মেদিনীপুরের সভাধিপতি সহ প্রশাসন ও সরকারকে এনিয়ে দাবিদাওয়া জানানো হয়েছে। কিন্তু, বকেয়া পেমেন্ট হয়নি। যেকারণে এবার প্রায় ৭০শতাংশ ভেনামি চিংড়ি চাষ কমে গিয়েছে। এই পেশার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই কর্মচ্যুত হয়েছেন। সরকার ও প্রশাসনের এনিয়ে হস্তক্ষেপ জরুরি।