নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর: মুর্শিদাবাদের লালবাগের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রের মধ্যে অন্যতম হল কাঠগোলা বাগান বাড়ি। এখানকার গোপন সুড়ঙ্গ দেখতেই মানুষ সারাবছর ভিড় জমান। এই সুড়ঙ্গের রহস্য আজও অজানা। মুর্শিদাবাদে ব্রিটিশদের ক্ষমতালাভের ষড়যন্ত্রেও এই কাঠগোলা বাগানবাড়ি জড়িয়ে ছিল। শোনা যায়, বাগানের সুড়ঙ্গটি ভাগীরথীর সঙ্গে যুক্ত। ওই গোপন পথে একসময় জগৎ শেঠদের বাড়ি যাওয়া যেত। বছরের অধিকাংশ সময়ে সুড়ঙ্গটি নদীর জলে ভর্তি থাকে। সুড়ঙ্গ পথের সামনে একটি গেট থেকে পর্যটকরা নামার সিঁড়ি দেখতে পান। এই রহস্যময় সুড়ঙ্গের টানে ভিড় জমান দেশ বিদেশের পর্যটকরা। ঢাকা থেকে সুবাহ বাংলার রাজধানী এখানে সরিয়ে এনেছিলেন মুর্শিদকুলি খাঁ। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার ক্ষমতা দখলের পর মুর্শিদাবাদের প্রশাসনিক গুরুত্ব কমতে শুরু করে। তবে মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও আকর্ষণ এখনও অটুট। আজও লালবাগের পথে প্রান্তরে ইতিহাস কথা বলে। পর্যটক আর গবেষকরা নবাবদের শহরে ছুটে আসেন বারবার। মুর্শিদাবাদের সব থেকে জনপ্রিয় দ্রষ্টব্য হাজারদুয়ারি প্রাসাদ থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তরে কাঠগোলা বাগানবাড়ি। বাগানে ঘেরা বিশাল হলুদ বর্ণের স্থাপত্য আর তার গায়ের জমকালো ভাস্কর্য মুগ্ধ করে মানুষকে। বেশ কিছু নামী সিনেমার শ্যুটিংয়ের সুবাদে এই বাগানবাড়ির পরিচিতি আরও বেড়েছে।
তবে, জায়গাটার নাম কেন ‘কাঠগোলা’ হল, তা নিয়ে দু’টি মত প্রচলিত আছে। বাগানে ঢোকার মুখে দেখা যায় একটা বড় নহবত গেট, তার সামনে পূর্ব-পশ্চিমে রাস্তা চলে গিয়েছে। লোকে বলেন, এই রাস্তার দু’পাশে ছিল কাঠের গোলা। সেখান থেকে এই নামটা এসেছে বলে মনে করেন অনেকে। পাশাপশি, এই বাগানবাড়ি ফুলের জন্যও বিখ্যাত ছিল। বাগানের নানা ফুলের মধ্যে গোলাপের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল দিকে দিকে। অনেকের মতে, কাঠগোলাপের থেকেই বাগানবাড়ির নাম হয়েছে কাঠগোলা। এই জায়গাটি কিনে বাগানবাড়ি তৈরি করিয়েছিলেন জিয়াগঞ্জের রাজা লক্ষ্মীপৎ সিং দুগর। লক্ষ্মীপৎ, জগপৎ, মহীপৎ এবং ধনপৎ— এই চার ভাই এখানে থাকতেন। এখনও বাগানে ঢুকলে দেখা যায় এই চার ভাইয়ের ঘোড়ায় চড়া মূর্তি। তাঁদের আমলেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল আদিনাথের মন্দির। এই জৈন মন্দির কাঠগোলা বাগানবাড়ির অন্যতম দ্রষ্টব্য। স্থানীয় মানুষরা বলে থাকেন, বাগানের পুব দিকে পুরোনো মসজিদ আর কবরস্থানের পাশে একটি ইঁদারা থেকে প্রচুর গুপ্তধন পেয়েছিলেন তাঁরা। তার সাহায্যেই বাগান এবং মন্দির গড়ে তোলা হয়। অনেকে বলেন, এই চার ভাই ছিলেন দস্যু লুটেরা। আবার কেউ বলেন, তাঁরা আসলে ছিলেন ব্যবসায়ী। এই চার ভাই জগৎশেঠের সহযোগিতায় তৎকালীন নবাবের কাছ থেকে ১২০০ টাকায় ৩২ বিঘার এই বাগানটি কিনে নেন একটি মন্দির নির্মাণের জন্য। এক সময়ে এই বাগানবাড়িতে নিয়মিত জলসা হতো। নবাব এবং অভিজাতদের যাওয়া আসা ছিল এখানে। ইংরেজরাও আসতেন। বর্তমানে এখানকার প্রাসাদ, সংগ্রহশালা, বাগান, আদিনাথ মন্দির, চিড়িয়াখানা, বাঁধানো পুকুর, গোপন সুড়ঙ্গ দেখতে ভিড় করেন প্রচুর মানুষ। একটি ছোট চিড়িয়াখানাও বানানো হয়েছে বাড়ির প্রাঙ্গণে। সেখানে বেশকিছু পাখি পুষে রাখা হয়েছে। রয়েছে বিভিন্ন মাছ ও অন্যান্য জীবজন্তু। পর্যটকরা মুর্শিদাবাদ ভ্রমণে এসে এসবের টানেই এই কাঠগোলার বাগানবাড়িতেও আসেন।