Bartaman Logo
২ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

‘আজ জেলের মধ্যে তিনি এসেছেন’, অষ্টমীতে মাকে লেখা চিঠিতে আবেগঘন নেতাজি

জেলের ভিতর বন্দিরা যদি বড়দিন পালন করতে পারেন, তাহলে কেন দুর্গাপুজো হবে না?

‘আজ জেলের মধ্যে তিনি এসেছেন’, অষ্টমীতে মাকে লেখা চিঠিতে আবেগঘন নেতাজি
  • ২ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: জেলের ভিতর বন্দিরা যদি বড়দিন পালন করতে পারেন, তাহলে কেন দুর্গাপুজো হবে না? মায়ানমারের (তৎকালীন ব্রহ্মদেশ) মান্দালয় জেলে বসে ব্রিটিশ সরকারের কাছে জবাব চেয়েছিলেন দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র বসু। 
তারপরের ঘটনা তো ইতিহাস। জেলের ভিতর উমা-আরাধনার দাবিতে টানা অনশন-আন্দোলন। চাপে পড়ে অনুমোদন ব্রিটিশ সরকারের। সুভাষচন্দ্রের তত্ত্বাবধানে জেলবন্দিরা মেতে উঠলে দুর্গোৎসবে। সেদিন ছিল অষ্টমী। ‘আনন্দধারা বহিছে ভূবনে’র মাঝেও সুভাষচন্দ্রের অনিশ্চিত জীবন। কিন্তু, কিছুতেই ভুলতে পারছিলেন না পৈত্রিক ভিটের অষ্টমীর অঞ্জলিকে। ভুলতে পারছিলেন না বাংলার শারোৎসবের আমেজকেও। একরাশ মনখারাপ নিয়ে সেদিন জেলে বসে মা’কে চিঠি লিখেছিলেন সুভাষচন্দ্র—‘আজ মহাঅষ্টমী। আজ বাংলার ঘরে ঘরে মা’কে এনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সৌভাগ্যক্রমে আজ জেলের মধ্যেও তিনি এসেছেন।’ দেশনায়কের সেই দুস্প্রাপ্য চিঠিও আজও সযত্নে গচ্ছিত ডাক বিভাগের ফাস্ট কভারে। সম্প্রতি, বর্ধমান শহরে আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে সেই চিঠি এল সর্বসমক্ষে। দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন আট থেকে আশি। ইতিহাসের সাক্ষী থেকে আবেগে ভাসলেন সকলেই। 
তখনকার দিনে ডাক পরিষেবা আজকের মতো উন্নত ছিল না। অষ্টমীতে লেখা এই চিঠি মায়ের কাছে পৌঁছতে দশমী পেরিয়ে যাবে। সেটা বিলক্ষণ বুঝেছিলেন নেতাজি। তাই তিনি চিঠিতে মা’কে বিজয়া-দশমীর প্রণামও জানিয়ে রেখেছিলেন। দক্ষিণ কলকাতার শহরতলি সুভাষগ্রাম স্টেশন থেকে অটোতে কিছুটা পথ গেলে কোদালিয়া। সেখানে পৈত্রিক ভিটে সুভষচন্দ্রের। মহান বিপ্লবীর ঠাকুরদা হরনাথ বসু এই বাড়িতেই প্রায় তিনশো বছর আগে দুর্গাপুজোর প্রচলন করেন। বাংলার প্রাচীন দুর্গাপুজোর মধ্যে এটি অন্যতম। হরনাথবাবুর সময় অষ্টমীর দিন প্রচুর ভিড় হতো এই বাড়িতে। পুজো এলেই শৈশবের সেই স্মৃতিও জেলবন্দি সুভাষচন্দ্রকে উতলা করে দিত বলে মত অনেক ঐতিহাসিকের। তার প্রভাব পড়েছে মা’কে লেখা ওই চিঠিতেও। 
প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা রবি সেবক বলছিলেন, ‘এরকমই নানা দলিল আমাদের কাছে সংরক্ষিত। স্ট্যাম্প, পোস্টকার্ড, পুরানো খাম, চিঠির মাধ্যমে ইতিহাসকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছি।’ প্রদর্শনীতে এসেছিলেন শিক্ষক বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘নেতাজি বাঙালির আবেগ। এরকম চিঠি ইতিহাসের ধারক ও বাহক। ব্রিটিশদের চোখে চোখ রেখে জেলের ভিতর দুর্গাপুজোর অনুমোদন ছিনিয়ে এনেছিলেন তিনি। মাতৃবন্দনায় শামিল করেছিলেন বিপ্লবীদের।’ 
সময়টা ১৯২৪ সালের ২৫ অক্টোবর। নেতাজিকে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ পুলিশ কলকাতা থেকে তাঁকে পাঠানো হয় মায়ানমারের মান্দালয় জেলে। তখন দুর্গাপুজোর কাউন্টডাউন শুরু। বাংলায় উৎসবের আমেজ। সুভাষচন্দ্রও চেয়েছিলেন বিপ্লবীরাও জেলের মধ্যে মাতৃবন্দনায় মেতে উঠুন। কিন্তু, বির্টিশটা অনুমোদন দিতে রাজি নয়। শুরু করেন অনশন-আন্দোলন। বেগতিক বুঝে জেলে পুজোর অনুমোদন দেয় ব্রিটিশরা। সেই খুশির খবর জানাতেই মা’কে চিঠি লিখেছিলেন দেশনায়ক।

Advertisement

অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, জেলে উমার আরাধনা শুরু হয় নেতাজির হাত ধরেই। সেই ধারবাহিকতা এখনও চলছে. এখন প্রায় সব সংশোধনাগারে পুজোর আয়োজন করা হয়। চারদিনই বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়। বন্দিরাই অংশগ্রহণ করে। নাটক মঞ্চস্থ করে। সঙ্গীত পরিবেশন করে। মাতৃ আরাধনার মাধ্যমে এখন অপরাধীরা সন্ধান করে নতুন জীবনের। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ