Bartaman Logo
১১ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

‘পাণ্ডবাণী’র কিংবদন্তি তিজান বাই

তিজান বাই পাণ্ডবাণী শিল্পের প্রথম মহিলা শিল্পী, যিনি সমাজের বাধা অতিক্রম করে মহাভারতের কাহিনি পরিবেশন করেছেন। বিস্তারিত পড়ুন।

‘পাণ্ডবাণী’র কিংবদন্তি তিজান বাই
  • ১১ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

দাদুর মুখে ছত্তিশগড়ি ভাষায় মহাভারতের গল্প শুনতে শুনতেই তৈরি হয়েছিল পাণ্ডবাণীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা। মেয়েটির যখন এগারো বছর, জীবনে হঠাৎ এক নতুন পর্বের সূচনা হয়। সুখবর্তী দেবীর কাকা ব্রিজলাল পারধি ছিলেন পাণ্ডবাণী শিল্পী। তাঁদের ঘরের কাছেই তিনি থাকতেন। একদিন মেয়েটি তাঁর ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় শুনলেন অসাধারণ এক সাঙ্গীতিক কথকতা ‘দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ পর্ব’। এরপর প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত রোজ লুকিয়ে লুকিয়ে শুনলেন সম্পূর্ণ পর্বটি। কিন্তু অচিরেই ধরা পড়ে যান দাদুর কাছে। সেই প্রথম দাদুর কাছে এক সপ্তাহ ধরে শোনা পালা মাত্র দশ মিনিটে শুনিয়েছিলেন। দাদু অভিভূত, চোখ ভেসে যায় জলে। ‘ঘরের শঙ্খ’ তাঁর নাতনির জন্য বেজে ওঠেনি ঠিকই, কিন্তু বুঝতে অসুবিধে হয়নি এই মেয়ের জন্মলগ্নে ঈশ্বরের অসীম কৃপা বর্ষিত হয়েছে। 

Advertisement

শুরু হয় লুকিয়ে লুকিয়ে রাতে পাণ্ডবাণী শেখা। দাদু এক-একটা পর্ব প্রায় দেড়-দুই ঘণ্টা করে শোনাতেন। শিক্ষার প্রথম দিনেই শুনিয়েছিলেন আদিপর্ব থেকে স্বর্গারোহণ পর্ব। ছোট্ট তিজান এতসব বুঝে উঠতে পারেননি। সহজ-সরল ভাবে দাদু বুঝিয়েছিলেন, আদি অর্থাৎ জীবন এবং স্বর্গ অর্থাৎ মৃত্যু। এভাবেই সম্পূর্ণ নিরক্ষর তিজানের কণ্ঠস্থ ও আত্মস্থ হয়ে ওঠে সমগ্র মহাভারত। আর সেই থেকেই শুরু। মাত্র ১৩ বছর বয়সে প্রথম মঞ্চে উঠেছিলেন তিজান বাই। মঞ্চে মহাভারতের চরিত্র ও কাহিনিকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। পিতা চুনুকলাল ও মাতা সুখবর্তী পারধি ছিলেন এক নিষ্ঠুর সমাজের শিকার। ফলে তাঁরা কোনোদিন তিজানকে সমর্থন করেননি। উপরন্তু প্রবল মারতেন, বিশেষত মা। তাঁর বারবার মনে হত যে ভগবানের কথকতাতে দোষ কোথায়! তবুও থেমে থাকেননি। এক আদিবাসী গ্রামের রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে যখন তিজানের সুরেলা কণ্ঠ মুখরিত হয়, তখন ভেঙে পড়ে গোঁড়া সমাজের অন্ধ অহং।
প্রখ্যাত শিল্পী উমেদ সিং দেশমুখের কাছে এই শিল্পে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে পাণ্ডবাণী শিল্পে নিজের জমি শক্ত করেন। হাতে তানপুরা নিয়ে ‘কাপালিক’ শৈলীতে মহাভারতের কাহিনি পরিবেশন করে তিনি পাণ্ডবাণী শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেন। সেই সময় এই ধারায় মহিলাদের অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত সীমিত। সামাজিক বাধা ও সমালোচনার মুখেও তিনি নিজের শিল্পচর্চা থামাননি। তিজান বাই ছিলেন পাণ্ডবাণী গানের প্রথম মহিলা শিল্পী। সেই সময়ে মহিলারা কেবল বেদামতি গাইতে পারতেন, যা বসে গাওয়া হয়। অর্থাৎ এই শৈলীতে শিল্পী সাধারণত বসে মহাভারতের গল্প গান ও আবৃত্তির মাধ্যমে পরিবেশন করেন। এখানে অভিনয় বা শরীরী ভঙ্গির ব্যবহার প্রায় থাকে না বললেই চলে। কিন্তু তিজান সমস্ত প্রচলিত নিয়মকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বেছে নিয়েছিলেন ‘কাপালিকা রীতি’। প্রথা ভেঙে দাঁড়িয়ে গান শুরু করেন। এই শৈলীতে আবৃত্তির পাশাপাশি অভিনয়, গান, সংলাপ এবং হাতে তানপুরা নিয়ে ভঙ্গিমা মাধ্যমে মহাভারতের কাহিনিগুলিকে পরিবেশন করতে শুরু করেন তিজান। আর তাঁর এই সাহসী পদক্ষেপই পাণ্ডবাণী শিল্পকে নতুন পরিচয় দেয়। তাঁর স্বতন্ত্র, গভীর কণ্ঠস্বর এবং প্রবল আবেগ মানুষের হৃদয়ে তাঁর জন্য একটি বিশেষ স্থান করে নিয়েছিল। তিনি গানের এমন একটি জগতে প্রবেশ করেছিলেন, যা পুরুষশাসিত ক্ষেত্র বলে বিবেচিত হত।
তবে এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। ছত্তিশগড়ি ভাষায় যার অর্থ ‘পাণ্ডবদের কথা বা বাণী’। এই লোকশৈলী সমগ্র ছত্তিশগড় জুড়েই পুরুষকণ্ঠে ধ্বনিত হত। নারীদের অংশগ্রহণ ছিল কেবলমাত্র শ্রোতা-দর্শক রূপে, প্রত্যক্ষ শিল্পী রূপে নয়। কিন্তু তিজান বাই সৃষ্টি করলেন এক ইতিহাস। নারী হয়ে প্রকাশ্যে মঞ্চে অভিনয় করে গান গাওয়ায় তাঁর নিজের সম্প্রদায়েই তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েন। বাল্যবিবাহের পর তাঁকে সমাজচ্যুতও করা হয়। অনেক সময় প্রতিবেশীদের থেকে খাবার ও বাসনপত্র ধার নিয়েও কাটাতে হয়েছে দিন। কিন্তু সমস্ত বাধা অতিক্রম করেও তিনি তাঁর শিল্পচর্চা ছাড়েননি। তাঁর জীবনের বড়ো সুযোগটি আসে যখন হাবিব তানভীর তাঁর প্রতিভা চিনতে পেরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সামনে গান গাওয়ার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানান। এরপর তাঁকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তাঁর প্রতিভা ও কণ্ঠস্বর শুধু ভারতেই নয়, সারা বিশ্বের মানুষের মন জয় করেছিল। দেশ ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভারতীয় লোকসংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করেন। চলচ্চিত্র পরিচালক শ্যাম বেনেগালের জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘ভারত এক খোঁজ’-এও তিনি অংশ নেন, যার ফলে পাণ্ডবাণী আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তিজান বলতেন, ‘খুদ ডুব জায়ো, খুদ রং জায়ো। খুদ নহী রঙ্গোগে তো দুসরোঁ কো কৈসে রঙ্গোগে?’
মাটির দেওয়াল, গাছের ডালপালা, পাতা, খড় ইত্যাদি দিয়ে তৈরি একটি ঝুপড়ি। আলো-বাতাসেরও যেন প্রবেশ নিষেধ। এমনই এক ঘরে ১৯৫৬ সালে ছত্তিশগড়ের এক আদিবাসী পরিবারে জন্ম তাঁর। চরম দরিদ্র ঘরে সেদিন জন্ম নিয়েছিলেন এই বিস্ময়কর প্রতিভা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ কখনো পাননি। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে বড়ো ছিলেন তিজান। তাঁদের ‘পারধি’ সমাজে লেখাপড়ার চল বিশেষ ছিল না, মেয়েদের জন্য তো একদমই নয়। ফলে অক্ষর পরিচয় ঘটে না উঠলেও মা সরস্বতীর বরপুত্রী ছিলেন তিনি। ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পরেই তিনি গান গাইতে শুরু করেন। নারী হওয়া সত্ত্বেও পাণ্ডবাণী গাওয়ার জন্য তাঁকে তাঁর পারধি সম্প্রদায় থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তাঁকে স্বামীর বাড়ি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। তিনি মানুষের বাড়িতে ভিক্ষা করে কাজ করতেন। ব্যক্তিগত জীবনে অনেক ঝড়ঝাপটা দেখেছেন। প্রথম বিয়ে ব্যর্থই। স্বামী তাঁকে গ্রহণ করেননি। দ্বিতীয় বিয়েও সুখের ছিল না। তৃতীয় বার বিয়ে করেন নিজের দলের এক যন্ত্রশিল্পীকে। কিন্তু ‘পাণ্ডবাণী’ বন্ধ করার জন্য রীতিমতো মারধর করতেন সেই স্বামী। সেই সময়ে তিজানজি বলেছিলেন, ‘এই সুর আমাকে কৃষ্ণ দিয়েছেন। যে দিন কৃষ্ণ সুর কেড়ে নেবেন, সে দিন এই শিল্প ছেড়ে দেব’।
ভারতীয় সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য তিজান বাই একাধিক সম্মানেও ভূষিত হন। ১৯৮৮ সালে পদ্মশ্রী, ১৯৯৫ সালে সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার, ২০০৩ সালে পদ্মভূষণ, ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক ফুকুওকা পুরস্কার এবং ২০১৯ সালে পদ্মবিভূষণে সম্মানিত হন তিনি। তিজান বাই শুধু একজন লোকশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতীয় লোকঐতিহ্যের এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। তাঁর মৃত্যুতে একটি যুগের অবসান হলেও, পাণ্ডবাণীর মাধ্যমে তিনি চিরকাল ভারতীয় সংস্কৃতির ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন। তিনি শুধু একটি লোকশিল্পকে সংরক্ষণ করেননি, তাকে নতুন জীবন দিয়েছেন, বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং ভারতীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অমর করে রেখেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন যে, ‘যদি পাণ্ডবাণী না থাকত, তাহলে তিজানও থাকত না, মরে যেত!’
নিজস্ব প্রতিনিধি

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ