নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া: ‘তুমি যে এ ঘরে তা কে জানত...’। জিনাত ও তার সঙ্গীর স্মৃতি উস্কে ফের বাঘের আতঙ্ক পুরুলিয়ার সীমান্তবর্তী গ্রামে। পুরুলিয়ার ঝালদার তুলিনের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে সুবর্ণরেখা নদী। নদীর ঠিক উল্টোদিকেই রয়েছে ঝাড়খণ্ডের রাঁচি ডিভিশনের মাহিলং রেঞ্জের অন্তর্গত সিলি বিটের মাড়দু গ্রাম। সেই গ্রামেরই বাসিন্দা পুরন্দর মাহাতর বাড়িতেই বুধবার ঢুকে পড়ে পূর্ণবয়স্ক একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। যা নিয়ে হুলুস্থুল কাণ্ড বেঁধে যায় গোটা গ্রামে।
বনদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, পুরন্দরবাবুদের বাড়ির মধ্যে অনেকগুলি ছোট ছোট ঘর রয়েছে। তারমধ্যে একটা ঘরে(গোয়াল) গবাদি পশু থাকে। অন্য একটি ঘরে তিনি, তাঁর মেয়ে ও মেয়ের বয়সিই এক আত্মীয়ের মেয়ে শুয়ে ছিল। গৃহকর্তা বলেন, এদিন ভোর সাড়ে ৪টে নাগাদ ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। উঠে কিছুক্ষণ ভজন শুনে গবাদি পশুগুলিকে বাইরে বের করি। তখনই দেখি এক হলদে ডোরাকাটা বাড়ির দরজার বাইরে লেজ নাড়ছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাঘটি এক লাফ দিয়ে গোয়ালে ঢুকে যায়।
তখন বুকের রক্ত কার্যত শুকিয়ে যাওয়ার জোগাড় হয় পুরন্দরবাবুর। কারণ অন্য ঘরে দুই শিশু শুয়ে রয়েছে। তাই ভয় উপেক্ষা করেই চুপিসাড়ে গিয়ে তিনি দুই শিশুকে ঘুম থেকে তোলেন। তন্দ্রাছন্ন অবস্থাতেই তাদের যা হোক করে ঘর থেকে বের করে আনেন। তারপর বাড়ির দরজায় বাইরে থেকে খিল দিয়ে দেন। এরপরেই তিনি চিত্কার করতে থাকেন। প্রতিবেশীরা জড়ো হন। খবর যায় পুলিস, বনদপ্তরেও। ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছন বনদপ্তরের কর্মীরা। মাহিলং রেঞ্জের আধিকারিক গায়েত্রীদেবী বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরেই এসব এলাকায় গবাদি পশু নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছিল। বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াবে বলে আমরা বিষয়টি গোপন রেখেছিলাম।’
দুপুরের পর পালামৌ ব্যাঘ্র প্রকল্প থেকে বিশেষ খাঁচা এসে পৌঁছয়। সেই খাঁচাটিকে একেবারে দরজার বাইরে রাখা হয়। বাঘটিকে ট্রাঙ্কুলাইজ করার চেষ্টাও করা হয়। তবে বিকেলে বাঘটি খাঁচাবন্দি হয়। ঝাড়খণ্ডের প্রধান মুখ্য বনপাল(বন্যপ্রাণ) পরিতোষ উপাধ্যায় বলেন, বাঘটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল। আমরা তা করতে পেরেছি। বাঘটিকে পালামৌ ব্যাঘ্র প্রকল্পে নিয়ে গিয়ে শারীরিক পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য কিছুদিন নজরদারিতে রেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, গত বছরের ডিসেম্বরে আচমকা ওড়িশার সিমলিপাল থেকে এরাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের জঙ্গলমহলে ঢুকে পড়েছিল বাঘিনি জিনাত। টানা ন’দিন বনকর্মীদের নাকানিচোবানি খাইয়ে অবশেষে ঘুম পাড়ানি গুলিতে সে কাবু হয়েছিল। তবে, জিনাত যাওয়ার কিছুদিন পরেই তার খোঁজে এসে হাজির হয়েছিল আর এক রয়্যাল বেঙ্গল। তারপর থেকে কখনও বান্দোয়ান, কখনও ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ী, কখনও দলমা এলাকায় সে দাপিয়ে বেরিয়েছিল। তবে গত মার্চের পর থেকে জিনাত-সঙ্গী ছিল বেপাত্তা! তাকে বাগে আনতে গিয়ে কম নাস্তানাবুদ হননি বনদপ্তরের কর্তারা। এই বাঘই জিনাত-সঙ্গী কী না সেব্যাপারে প্রশ্ন করা হয় রাঁচির ডিএফও শ্রীকান্ত ভার্মাকে। তিনি অবশ্য বলেন, সেব্যাপারে আমরা নিশ্চিত না। পায়ের ছাপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষা করে সেব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে। প্রতীকী চিত্র