নিজস্ব প্রতিনিধি, খণ্ডঘোষ: নেদারল্যান্ডের নামী কলেজের অধ্যাপক ছিলেন হ্যারিপ্রেম। মোটা টাকা বেতন, গাড়ি, বাড়ি সবকিছুই ছিল তাঁর। কিন্তু একসময় এসে তাঁর মনে হয়, টাকা আদতে ‘ভাইরাস’। এই ভাইরাস একবার ঘিরে ধরলে আর রক্ষা নেই। তাঁর মনে হয়, এটা প্রকৃত জীবন নয়। তাই তিনি আধ্যাত্মিক জীবনের খোঁজ করতে থাকেন। সেক্ষেত্রে ভারতের মতো পুণ্যভূমি আর কী-ই বা হতে পারে। ১৯৭৬ সালে তিনি নেদারল্যান্ড ছেড়ে চলে আসেন এদেশে। প্রথমে অসম, দিল্লি তারপর সোজা পূর্ব বর্ধমানের খণ্ডঘোষে।
দামোদরের পাড়ে বাউল নিয়ে সাধনা করছেন তিনি। কখনও কখনও যান বীরভূমের আখড়ায়। শুধু তিনিই নন, জাপান থেকে মাকি কাজুমির মতো আরও অনেকে এসে বাউল সাধনা করছেন। এসআইআর পর্ব শুরু হতেই তাঁরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। পুণ্যভূমি ছেড়ে আবার ফিরে যেতে হবে না তো? এখন সেই প্রশ্নই তাঁদের মনে দানা বেঁধেছে। তাঁদের অনেকেই ৩০-৩৫ বছর ধরে এরাজ্যে রয়েছেন।
নেদারল্যান্ডের বাসিন্দা হ্যারিপ্রেম বলেন, সাধনা ছাড়া আর কিছুই বুঝি না। এদেশে এসে বুঝেছি, আধ্যাত্মিক চেতনা কাকে বলে। আমাদের দেশের মানুষ টাকার লোভে ছুটছে। দামি গাড়ি, বাড়ি করতেই ব্যস্ত। একসময় আমিও এই নেশায় পড়েছিলাম। পরে মনে হয়েছিল, টাকা ভাইরাস ছাড়া আর কিছুই নয়। অধ্যাপনার কাজ করতে গিয়েই মনে আধ্যাত্মিক চেতনা জাগ্রত হয়।
এই দেশের প্রতি আমার অন্যরকম ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। জীবনের ৭৫টি বছর পার করে এসেছি। বাকি দিনগুলি এই পুণ্যভূমিতেই কাটিয়ে দিতে চাই। কিন্তু এদেশের সরকার না চাইলে কিছু করার নেই। আর এক আশ্রমিক বলেন, খণ্ডঘোষ এবং জয়দেবের আশ্রমে অস্ট্রেলিয়া, জাপান থেকে অনেকেই এসে থেকে গিয়েছেন। তাঁদের অনেকে বাংলায় বাউলও গান। এদেশের সংস্কৃতিকে তাঁরা আপন করে নিয়েছেন। আমারও এখানে ২৫ বছরের বেশি হয়ে গেল। তবে, ভোটার তালিকায় নাম নেই। এসআইআর করে আমাদের দেশে ফিরিয়ে দিলে কিছু করার নেই। তবে, এই ভূমি ছাড়তে খুব কষ্ট হবে। বাউল সাধনা করে অন্য জগতে প্রবেশ করেছি। আর নিজের দেশে ফেরার ইচ্ছে নেই।
স্থানীয়রা বলেন, বহু বছর আগে খণ্ডঘোষের দামোদর পাড়ে বাউলদের আশ্রম তৈরি হয়েছে। বিদেশ থেকে অনেকেই ভিসা নিয়ে এখানে আসেন। বারবার আসতে আসতে তাঁদের কেউ কেউ এখানেই থেকে যান। বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁরা মিশে যান।
দামোদরের পাড়ে তখন সূর্য অস্ত যেতে বসেছে। আশ্রমের বাইরে হলুদ সর্ষেখেতে সূর্যের আভা ঝরে পড়ছে। একতারা হাতে এক বিদেশি আপন খেয়ালে গেয়ে চলছেন, ‘আমার হাত বান্ধিবি, পা বান্ধিবি, মন বান্ধিবি কেমনে’।