Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এবারের শিকার গান্ধীজি

আবার নাম বদল! সরকার তৈরির আগে নরেন্দ্র মোদি স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন দেশকে বদলে দেবেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, মহান ভারতবর্ষের সাড়ে সর্বনাশ করেছে কংগ্রেস।

এবারের শিকার গান্ধীজি
  • ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

আবার নাম বদল! সরকার তৈরির আগে নরেন্দ্র মোদি স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন দেশকে বদলে দেবেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, মহান ভারতবর্ষের সাড়ে সর্বনাশ করেছে কংগ্রেস। জওহরলাল নেহরু থেকে মনমোহন সিং পর্যন্ত সমস্ত কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রীকেই এজন্য তিনি দায়ী করেন। মোদি কথা দিয়েছিলেন, তাঁর নেতৃত্বে ভারতের সমস্ত দুর্দশার অবসান হবে। ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’-এর নীতি রূপায়ণের মাধ্যমে ‘অমৃতকাল’ আসবে দেশে। ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসনে প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির একযুগ শাসনকাল শেষে তাঁর পরম ভক্তরাও নিশ্চয় হতাশ এই ভেবে যে, মোদি এবং তাঁর দোহারগণ মিলে এযাবৎ যত গাইলেন আর বাজালেন তার কিছুই পাওয়া গেল না। বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়ার এর চেয়ে চমৎকার দৃষ্টান্ত আর কেউ উপহার দিতে পারেননি। শীত তো এক মাঘে যাওয়ার নয়, ফিরে ফিরে আসে! মানে পাঁচবছর অন্তর ভোট আসে, সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ান হাতে নিয়ে পার্টিগুলিকে মানুষের সামনে দাঁড়াতেই হয়। এই কারণে সরকার বাহাদুর চিন্তায় বইকি। তাই জোড়াতাপ্পি দিয়ে ব্যাপারটা ম্যানেজ করারই কৌশল নিয়েছে মোদি সরকার। এর একটা উত্তম পন্থা হল কিছু জনপ্রিয় পুরোনো জিনিসের নাম পালটে দেওয়া। যেমন সরকার গড়েই কংগ্রেস জমানার একাধিক সরকারি প্রকল্প ও কর্মসূচির নাম বদলে দিয়েছিলেন মোদি। বিশেষ করে যেসব জনমুখী প্রকল্পের গায়ে নেহরু, ইন্দিরা, রাজীব প্রমুখের নামগন্ধ ছিল, সেগুলিকে টার্গেট করা হয়েছিল সবার আগে। তারপর বদলে দেওয়া হয়েছে কিছু প্রাচীন শহর, ঐতিহাসিক স্থাপত্য, রেলস্টেশন, বন্দর, বিমানবন্দর, সংগ্রহশালা প্রভৃতিরও নাম। এজন্য বিশেষভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে যেখানে ইসলামি কিংবা বিদেশি পরিচয় আছে। 

Advertisement

তবু মোদি সরকার এতদিন মহাত্মা গান্ধীর গায়ে হাত দেয়নি। গেরুয়া বাহিনীর কাছে গান্ধীজির হত্যাকারী ‘পূজনীয়’ হলেও এটুকু লোকলজ্জা সরকার ধরে রেখেছিল। কিন্তু মোদি সরকার এই পর্দাটিও সরিয়ে ফেলতে মরিয়া এবার। ভারতের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হল বেকারত্ব। এদেশের সর্ববৃহৎ বাহিনীর নাম বেকার বাহিনী। বেকার বাহিনীর সদস্য সংখ্যা গ্রামভারতেই সর্বাধিক। গান্ধীজি মনে করতেন, গ্রাম জাগলেই দেশ জাগবে। এজন্য কংগ্রেস সরকার দেশজুড়ে চালু করেছিল ১০০ দিনের কাজের গ্যারান্টি প্রকল্প। সংগত কারণেই প্রকল্পটি ছিল মহাত্মা গান্ধীর নামাঙ্কিত (মনরেগা)। গত দুই দশকে ভারতে দারিদ্র্য যে কিছুটা কমেছে তার পিছনে বিরাট অবদান রয়েছে মনরেগার। সব জেনেও মোদি সরকার গোড়া থেকেই এই প্রকল্পটির বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত ছিল। বাংলার জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অন্যান্য বিরোধী নেতৃত্বের চাপে পড়ে প্রকল্পটি মোদিবাবুরা তুলে দিতে পারেননি। তবে প্রকল্পটির গুরুত্ব নানাভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার শুরু হয়েছে প্রকল্পটির নাম ‘সংস্কার’ উদ্যোগ। কী সেই মহৎকর্মটি? প্রকল্পটির নাম থেকে মহাত্মা গান্ধীর সংস্রব মুছে ফেলা হবে! মহাত্মা গান্ধী নয়, পূজ্য বাপুও নয়, ১০০ দিনের কাজের নাম এবার ‘জি-রাম-জি’! সঙ্গে আবার ‘বিকশিত ভারত’ পরিচয়। দেশ-বিদেশে মহাত্মার মূর্তি পুজো করলেও সরকারি কর্মনিশ্চয়তা প্রকল্প এবং সংশ্লিষ্ট আইন থেকে গান্ধীজির নামই মুছে দিচ্ছে মোদি সরকার। 
এটাই দেশে মহাত্মা গান্ধীর নামযুক্ত একমাত্র কেন্দ্রীয় প্রকল্প। তা সত্ত্বেও বাতিল করা হচ্ছে ‌ইউপিএ সরকারের তৈরি মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি আইন (মনরেগা)। পরিবর্ত হিসেবে বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ) বিল পাস করাতে বদ্ধপরিকর কেন্দ্র। সংক্ষেপে ‘ভিবি-জি রাম জি’। মহাত্মা গান্ধীর নাম মুছে এভাবে কৌশলে ‘রাম’ নাম জুড়ে দেওয়া হবে। বিরোধীরা রাম নামে আপত্তি জানালে তার রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চিন্তাই গেরুয়া মস্তিষ্কে গিজ গিজ করছে। স্বভাবতই নিন্দার ঝড় বইছে দেশজুড়ে। বিজেপির কাছে নতুন মানে শুধু নাম বদল। পুরোনো জিনিসের নতুন নামকরণ। পুরোনো বস্তুকে গেরুয়া সংস্কৃতি অনুসারে চেনানো। এই নামমাহাত্ম্যের মর্মবস্তু হল অন্যের জিনিসকে নিজের সৃষ্টি বলে চালিয়ে দেওয়া। একে টুকলি বা নকল করার নয়া তরিকা বললে অত্যুক্তি হয় না। এই উদ্যোগের আর একটি কালো দিক হল, প্রকল্পটির আর্থিক দায়িত্বও অংশত ঝেড়ে ফেলবে কেন্দ্র। সেই বিপুল বোঝা বহন করতে হবে রাজ্যকে। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাতেও বড়ো আঘাত হানতে চায় এই গেরুয়া মতলব। গরিবের স্বার্থে দেশজুড়ে এখনই জোরদার প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ