হিমাংশু সিংহ: বছর শেষে একটা আর্তনাদ ছেয়ে ফেলছে চারদিক। ‘ওরা আমাদের মেরে ফেলবে’। হাতরাস, উন্নাওয়ের নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে কোথায় যেন মিশে গিয়েছে বাংলাদেশের হিন্দুদের চূড়ান্ত বিপন্নতার আকুতি। ওপারে সংখ্যালঘুরা যেমন সন্ত্রস্ত, তেমনি এপারেও ভয়ংকর একটা আতঙ্ক ঘিরে ধরেছে ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত প্রেক্ষিত ও পটভূমিতে। দীপু দাসের হত্যা যেমন
নৃশংস ঘটনা, সবাই প্রতিবাদ করছে। একইসঙ্গে এই প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক, ছত্তিশগড়ের এক গরিব দলিতকে কেরালায় গণপিটুনি খেয়ে মরতে হবে কেন?
দুজনেই গরিব ঘরের সন্তান, দীপু দাস ও রাম
নারায়ণ। একজনকে মুসলিমরা মেরেছে, অপরজনকে হিন্দুরা। মধ্যিখান থেকে ফায়দা তুলছে কারা?
ধর্মীয় উন্মাদদের প্ররোচনায় সীমান্তের দুপারের মানুষ পা দেবে কেন? ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে আর এপ্রিলে বাংলায় নির্বাচন। দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়ে চলা রিক্ত বাঙালি জানে দুপারেই ভোট পর্যন্ত এই হানাহানি চলবে।
একই আর্তনাদের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে, ডবল ইঞ্জিন ওড়িশাতেও। শুধু বাংলা বলায় অতর্কিতে পিটিয়ে খুন করা হল পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিক জুয়েল রানাকে। কী অপরাধ ছিল তাঁর? বাংলায় কথা বলছিলেন। তা থেকেই সন্দেহ, আক্রোশ! আধার কার্ড দেখতে চাওয়া। তারপর গণপিটুনি। অকুস্থল কলকাতা থেকে খুব দূরে নয়, সম্বলপুর। ওড়িশা চিরদিনই বাঙালির সেকেন্ড হোম। সেখানে কাজে গিয়ে গেরুয়া দুষ্কৃতীদের আক্রমণের শিকার মুর্শিদাবাদের সূতির দুই নির্মাণ শ্রমিক। গত বুধবার সন্ধ্যায় ভাড়া করা ঘরেই বসেছিলেন তারা। ঘর থেকে বের করে এক পরিযায়ী শ্রমিককে বেধড়ক মেরে হত্যা করা হয়। একজন
মৃত, অন্যজন হাসপাতালের শয্যায় জীবন মৃত্যুর মধ্যিখানে। এ খেলার বিরাম নেই। তাই ২৪ ঘণ্টা পরও বেদম মার খেলেন আর একজন। বেকারত্ব, গরিবি, মূল্যবৃদ্ধি, ভাত-কাপড়ের লড়াইয়ের সঙ্গেই গেরুয়া জমানার আর এক দান, মানুষে মানুষে চরম অবিশ্বাস, শত্রুতা, বাঙালি দেখলেই একরাশ ঘৃণা। ধর্মের বিষ ছড়ানোদের হাতে বাংলার দায়িত্ব তুলে দিয়ে শান্তি পাবেন তো নাই, সোনার বাংলার বদলে শ্মশানের শীতল হাতছানি গ্রাস করবে আপনাকে। সম্বলপুরে মারধরের খবর পেয়েই ছুটে যায় পুলিশ। রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে নিয়ে যায় হাসপাতালে। চিকিৎসক একজনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মৃতের নাম, জুয়েল রানা। বাড়ি মুর্শিদাবাদের চক বাহাদুরপুর গ্রামে। নিজের দেশেই কারা মারল গরিব শ্রমিককে বাংলা বলার অপরাধে? হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি-অবাঙালি, বাংলাদেশি-আগমার্কা পশ্চিমবঙ্গীয়, পরিযায়ী-অপরিযায়ী, এমন শত সহস্র অণুপরমাণুতে সমাজকে ভাঙলো কে, কোন উদ্দেশ্যে। প্রত্যেক নয়া বিভাজন থেকে ভোটের কড়ি গোনার নিরন্তর চেষ্টা, লাশের উপর দাঁড়িয়ে ফায়দা লোটার লক্ষ্যে লোভাতুর নেতাদের শ্যেন দৃষ্টি অপেক্ষায়। এ কোন দিন উপস্থিত স্বাধীনতার ৭৮ বছরে পদার্পণের মুহূর্তে। এসবের টানাপোড়েনে স্বজনহারানো পরিবারের সামনে নতুন বছর ২০২৬ কোনও নতুন সূর্যোদয় বয়ে আনবে কি? নাকি দীর্ঘশ্বাস খেলে যাবে এই মৃত্যু উপত্যকা আমার পূর্বপুরুষের দেশ নয়!
আসলে রাষ্ট্রক্ষমতার চতুর কারবারিরা নিজেরই দেশের মানুষকে একে অপরের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ক্ষমতার মধুভাণ্ডর দখল দীর্ঘস্থায়ী করার নেশায় মত্ত। ওতেই নাকি মেরুকরণের বৃত্ত সম্পূর্ণ হয় মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাকে চাপা দিয়ে। এর সঙ্গে মিশিয়ে দাও আড়াই চামচ জাতীয়তাবাদ এবং সেনাবাহিনীর শৌর্য ও বীরত্ব। সার্জিকাল স্ট্রাইক থেকে অপারেশন সিন্দুরে প্রাণ যায় জওয়ানের, ভোটের বাজারে জনপ্রিয়তা বাড়ে নেতার থুড়ি রাষ্ট্রনেতার! বাড়তি পাওনা, জীবন আর জীবিকার বাকি সব ইস্যু চাপা পড়ে যায় আজান, কাঁসর ঘণ্টা আর স্তিমিত ধূপের ধোঁয়ার অদ্ভুত মিশেলে। পহেলগাঁওয়ের স্বজনহারানোরা কি সুবিচার পেয়েছে? আমি হিন্দু, আপনি মুসলমান। আমি যোগ্য, আপনি অযোগ্য। আপনি অবাঙালি, আমি বাঙালি। আপনি বেআইনি বাংলাদেশি, আমি আগমার্কা বঙ্গদেশীয়, আপনি নীল তো আমি গেরুয়া। আমার নাম খসড়া তালিকায় আছে, আপনার নেই! আপনাকে ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে হবে, আমাকে নয়। লাল নীল সবুজের এমনই হরেক কিসিমের সম্ভাবনা ও আশঙ্কার বেলুন উড়িয়ে মেরুকরণ তীব্র করার বিচিত্র আয়োজন।
শীতের সকালে ব্রিগেডে গীতাপাঠের আসর ঘিরে আপাত কোনও ঝঞ্ঝাট ছিল না। সাধুসন্তরাও মারমুখী হলে কোথায় মুখ লুকোবো? ধর্মনিরপেক্ষ এদেশে ধর্মপালনে সবারই যেমন সমান স্বাধীনতা তেমনি জীবিকা নির্বাচনেও বাধা নেই কোনও। তাহলে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীদের হাতে কেন মার খাবেন গরিব চিকেন প্যাটিস বিক্রেতা। কী দোষ তাঁর? এটাও তো এক গরিব মানুষের বিপন্নতারই ছবি। ওর দীর্ঘশ্বাসেও ‘ওরা আমায় মেরে ফেলবে’, এই ভয়াল আকুতি। সরকার চাকরি দিতে ব্যর্থ, গত ১১ বছরে বড়লোক আরও ধনী হয়েছে, গরিব আরও গরিব। সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে হাতেগোনা পাঁচ ছজনের পকেটে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় লুট চলছে সাদা কালো টাকায়। এই যখন পরিস্থিতি তখন একজন গরিব পুঁতির হার বেচবে না প্যাটিস, মাংস না সবজি, কোন এক্তিয়ারে তা ঠিক করে দেবেন ধর্মান্ধরা? মহতী আম্বেদকরের সংবিধান তো এমন গোঁড়া শতছিন্ন সমাজের স্বপ্ন দেখায়নি। হিন্দুত্বের নামে এমন বিষাক্ত সমাজের জাল বোনার কাজেও ব্যস্ত হয়নি কখনও। এমন শক্তি যদি এরাজ্যে ক্ষমতায় আসে তাহলে মাছে ভাতে বাঙালির ভবিষ্যতের কী হবে, ফতোয়া দিয়ে অষ্টপ্রহর নিরামিষ সহ্য হবে তো! ছাব্বিশের আসন্ন ভোট শুধু আপনার ভোটাধিকার রক্ষার লড়াইতেই সীমাবদ্ধ নয়, বাংলার অস্মিতাকে বাঁচানোরও নির্ণায়ক ক্রান্তিকাল।
যাঁরা সুশাসনের উদাহরণ দিতে কথায় কথায় যোগীরাজ্যের তুলনা টানেন, বাংলাকে হেয় করেন, গুজরাতের উন্নয়নের ঝুলি উজাড় করে দেন, তাঁদের সবিনয়ে বলি, বছরের শেষ প্রহরে সেখান থেকে একই আর্তনাদ ও তার প্রতিধ্বনি ভেসে আসছে কেন? উন্নাওয়ের নির্যাতিতা ও তাঁর মা কেন বারবার বলছেন, ‘আর উপায় নেই, এবার ওরা আমাদের মেরে ফেলবে’। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক মাত্র ছ’বছরের মাথায় জামিন পেলেন কোন রহস্যে আর গুপ্ত রসায়নে। প্রতিবাদ জানাতে গেলে মা ও মেয়েকে মেরে তুলে দিয়েছে পুলিশ। ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে চলন্ত গাড়ি থেকে। যোগীরাজ্যে এই কি সুশাসনের আদর্শ উদাহরণ? উন্নাওয়ের নির্যাতিতা আজ বিপন্ন কুলদীপ সেঙ্গার বিতর্কিত রায়ে ছাড়া পেয়েছেন বলে। তিন বছর আগে মোদি রাজ্য গুজরাতে স্বাধীনতা দিবসে এমনিভাবেই বিলকিস বানোর উপর অত্যাচার চালানো ১১ জন সরকারি ট্রাইবিউনালের রায়ে মুক্তি পাওয়ায় নিকষ অন্ধকার নেমে এসেছিল নির্যাতিতার পরিবারে। সেই হাহাকারই আজ ছড়িয়ে পড়েছে উন্নাওতে। এই মামলাও যত দ্রুত সুপ্রিম কোর্টে যায় এবং সেঙ্গার সহ ১১ জন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী ফের জেলে যায় ততই সমাজের মঙ্গল। নাহলে এই ছদ্ম হিন্দুত্বের পোস্টার বয়দের হাতে আবারও লুণ্ঠিত হবে উন্নাওয়ের নিরপরাধ নারীর ইজ্জত। বড়ো ভয়ংকর হবে সেই পরিণতি। কুলদীপ সেঙ্গার কতটা ভয়ংকর? উন্নাও কাণ্ডের পরপরই ২০১৯ সালের ২৮ জুলাই রায়বরেলিতে যাওয়ার পথে মারাত্মক গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়েন নির্যাতিতা। গাড়িতে থাকা তাঁর দুই আত্মীয়ের মৃত্যু হয়। ভাগ্যজোরে বেঁচে যান নির্যাতিতা। লখনউয়ের হাসপাতাল থেকে তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে করে দিল্লির এইমসে নিয়ে আসা হয়। অভিযোগ ওঠে, কুলদীপ ও তাঁর দুষ্কৃতী বাহিনীর মদতে প্রমাণ লোপাটে পরিকল্পিতভাবে খুনের চেষ্টা হয়েছিল। সেঙ্গারের বিরুদ্ধে সেই মামলা এখনও চলছে। তবে ২০১৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর মূল ধর্ষণের মামলায় কুলদীপ দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় কিছুটা স্বস্তিতে ছিলেন নির্যাতিতা। দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশে ফের আতঙ্ক গ্রাস করেছে তাঁদের। এখন নির্যাতিতার বাঁচামরা ঝুলে শীর্ষ আদালতের বিবেচনার উপর।
আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে গত পাঁচ দশকের সর্বাধিক বেকারত্বের হারেও। পেট হিন্দু মুসলমান মানে না। দেশজুড়ে গ্রামবাংলায় মানুষের হাতে কাজ তুলে দেওয়ার প্রকল্প মহাত্মা গান্ধী রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি প্রকল্প শুরু হয়েছিল দু’দশক আগে ডক্টর মনমোহন সিংয়ের জমানায়। যতই ‘দুর্বল’ প্রধানমন্ত্রী হোন কৃতিত্বটা তাঁরই প্রাপ্য। বিজেপি সেদিন কটাক্ষে ভরিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু তাতে কি ইতিহাস মুছে দেওয়া যায়? প্রথম বছরে একশো দিনের বরাদ্দ ছিল মাত্র এগারো হাজার কোটির মতো। তারপর চোদ্দো সালে কংগ্রেস জমানার অবসানে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ হাজার কোটি। আর আজ লজ্জার মাথা খেয়ে সেই প্রকল্পই এই বেকার সঙ্কুল দেশে গেরুয়া দলের ভোটে জেতার চাবিকাঠি। বরাদ্দ বেড়েছে, কিন্তু সবকা বিকাশের সরকার হঠাৎ গোটা প্রকল্পের ক্রেডিট নিতে মহাত্মার নামটাই মুছে দিতে উদ্যত হল কোন আক্কেলে? আপনি স্বঘোষিত বিশ্বগুরু, নেহরু-ইন্দিরাকে কথায় কথায় মুছে দেন। এটাই আপনার ইউএসপি! ওই পর্যন্ত ঠিক আছে তবে মহাত্মা গান্ধীকেও ভ্যানিশ করে দেবেন, এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল নাকি? নয়া আইনে এবার থেকে আর একশো নয়, ১২৫ দিনের কাজ নিশ্চিত হচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ প্রকল্পের নাম বদল কেন? ভগবান রামের সঙ্গে কোনও বিরোধ নেই। কিন্তু মহাত্মার নাম কেটে প্রকল্পের নাম ‘ভিবি জি রাম জি’ করার পিছনে কোন সংকীর্ণ ভাবনা কাজ করছে? তবে কি মোদির স্বপ্নের ভারত সামনে এগনোর পরিবর্তে পিছনের দিকে হাঁটছে? মাত্র কয়েকদিন আগেই ডিজিটাল ভারতে প্রবেশ, জিএসটি চালু করা সরকারের পাখির চোখ ছিল। প্রধানমন্ত্রী আধুনিক ভারতের কথা বলে মুসলিম মহিলাদের জীবন থেকে বর্বর তিন তালাক প্রথা তুলে দেওয়ার পথে হেঁটেছিলেন। সেই পথ ছেড়ে দেশজুড়ে হিন্দুদের এককাট্টা করার এমন নির্লজ্জ ও নির্মম নিদান শুভ ইঙ্গিত দেয় কি? নাকি সংস্কার, উন্নয়ন ও ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্বপ্ন শিকেয় তুলে মোদির ভারত গোহত্যা ও গোমাংস খাওয়া বন্ধ করার নেশায় অপ্রকৃতিস্থ? গ্রাম বাংলার মানুষকে প্রতিমুহূর্তে মনে করিয়ে দেওয়া রামের আশীর্বাদেই তুমি গ্রাসাচ্ছাদন করছ। পেটে ভাত নয়, হাতে কাজ গৌণ। আড়ালে হিন্দু ভোটের কনসলিডেশনই লক্ষ্য। এসআইআরও কি বাংলায় সেই হিন্দু ভোটকে এককাট্টা করারই ব্লুপ্রিন্ট। রোহিঙ্গা বনাম মতুয়া, রাজবংশী বনাম বাংলাদেশি বিভাজনের ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে সোনার বাংলার স্বপ্ন মরীচিকা হয়েই থেকে যাবে। যাঁরা রবীন্দ্রনাথ আর বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যেও বিভেদ করে তাঁদের বিশ্বাস করলে বাঙালি সব হারাবে। নতুন বছরে এই সার কথাটা মনে রাখবেন।