নিজস্ব প্রতিনিধি, পুরুলিয়া: একমাত্র রোজগেরে ছেলেকে হারিয়ে শোকে কাতর মা। কাঁদতে কাঁদতে শুকিয়ে গিয়েছে চোখের জল। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন যুবকের বাবা। আগামী দিনে কী করবেন, কী খাবেন, কীভাবেই বা নাবালিকা মেয়ের পড়াশোনার খরচ যোগবেন? এই চিন্তাতেই উৎকণ্ঠায় পুরুলিয়ার চাকলতোড়ের নিহত যুবক তাপস মহাপাত্রের পরিবার। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, পরিবারের এমন অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্যেই অভিযুক্তদের বাঁচাতে মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ উঠল এলাকার প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে। কারণ, অভিযুক্তদের তালিকায় দাপুটে সিভিক ভলান্টিয়ার সহ রয়েছে শাসক দলের স্থানীয় এক নেতাও। পরিবারটিকে মোটা অঙ্কের টাকার প্রলোভনও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
গত ৭ জুলাই পুরুলিয়ার টামনা থানার চাকলতোড়ে মোবাইল চুরির অপবাদ দিয়ে তাপসকে পিটিয়ে মারার ঘটনা ঘটে। ঘটনায় ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে সিভিক ভলান্টিয়ার মলয় পুইতুণ্ডি, চাকলতোড় অঞ্চল তৃণমূলের যুব সভাপতি বাপন মহাপাত্র সহ ছ’জনকে। এরমধ্যে তিনজনের বাড়ি বলরামপুরের উড়মা গ্রামে। এই ঘটনার পর থেকেই মলয়ের এলাকায় দাপট নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। পরিবারের বিস্ফোরক অভিযোগ, প্রকাশ্য রাস্তায় ওই সিভিকের নির্দেশেই যুবককে পিটিয়ে খুন করা হয়েছিল। সিভিকের ভয়ে প্রতিবেশীরাও কেউ ঘেঁষতে পারেননি। পাশাপাশি, সামনে এসেছে বাপনেরও প্রভাবশালী যোগও। সূত্রের খবর, বাপন জেলা পরিষদের এক পদাধিকারীর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রচারের কাজে যুক্ত ছিল। ওই সদস্যের সুপরিশে ‘রাত্রির সাথী’ প্রকল্পে চুক্তিভিত্তিক চাকরিও পেয়েছিল সে। চাকলতোড়ের একাধিক নেতা-মাফিয়ার আশীর্বাদের হাত মাথায় ছিল বাপনের। এদিকে যুবকের পরিবারের অভিযোগ, যুবকের মৃত্যুর পরেই পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের কাছে ফোন আসতে থাকে। যুবকের সম্পর্কের এক দাদা বলেন, বাপনই তো আসল ভিলেন। ভাইয়ের মৃত্যুর পরেই বাপনের এক আত্মীয় আমাকে ফোন করে। বিষয়টি মিটমাট করে নেওয়ার কথা বলে। বিনিময়ে কত টাকা প্রয়োজন, তাও জিজ্ঞাসা করে। যুবকের জেঠু বলেন, বড় উড়মা অঞ্চলের এক পঞ্চায়েত সদস্যও আমাকে ফোন করে। বিষয়টি মিটমাট করে নেওয়ার কথা বলে। একই অভিযোগ করেছেন যুবকের মা ভাদু মহাপাত্র নিজেও। তবে, তিনি সাফ জানিয়েছেন, ছেলের মৃত্যুর ঘটনার ষড়যন্ত্রে অনেকেই লিপ্ত। প্রত্যেকের কঠোর শাস্তি চাই। এনিয়ে বিজেপির জেলা সহ সভাপতি গৌতম রায় বলেন, ‘টাকা দিয়ে যারা এরকম নৃশংস মৃত্যুর ঘটনাকে চাপা দিতে চাইছে, তাদেরও কঠোর শাস্তি হওয়ার উচিত।’
তবে, নাড়ুগোপাল ও ভাদু মহাপাত্রের একমাত্র ছেলে ছিলেন তাপস। তাঁর রোজগারের গোটা সংসার চলত। হতদরিদ্র পরিবার। তাপসের মৃত্যুর পর স্বাভাবিক জীবনযাপন যেন আরও অনিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। কান্নাভেজা গলায় যুবকের ভাদুদেবী বলছিলেন, ‘স্বামী খুব অসুস্থ। কিছুই করতে পারে না। আমরা ওই ছেলেটার রোজগারেই খাচ্ছিলাম। ছেলেটা কাজ করে মাস গেলে দু’তিন হাজার টাকা দিত। কিন্তু আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেল। এবার আমরা খাব কী? কার ভরসায় বাঁচব?’ হাতজোড় করে মায়ের আবেদন, আমার ছেলেটাকে ফিরিয়ে দাও। যুবকের নাবালিকা বোন বলে, ‘পরিবারে এমনিতেই প্রবল অর্থকষ্ট। ওরা দাদাকেও অকালে কেড়ে নিল। বাবা-মাকে দেখবে কে? আমারই পড়াশোনা কীভাবে চলবে, বুঝতে পারছি না।’ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নিহত যুবকের পরিবারের এই সদস্যা। নিজস্ব চিত্র